জঞ্জালের জন্য ভালোবাসা

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ১৫:৪০, আগস্ট ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৫, আগস্ট ২৪, ২০১৮

ইকরাম কবীরযদি বলি জন-জীবনে কোনও সমস্যা না থাকলে আমাদের আর কোনও কাজ থাকবে না, তাই সমস্যাগুলো আমরা জিইয়ে রাখি, খুব কি ভুল বলা হবে? দূরাকাশে যখনই কোনও সমস্যা দেখা দেবে, আমরা বুঝেও বুঝবো না, দেখেও দেখবো না, সমস্যা বুঝতে বিদেশে কর্মশালায় অংশ নিতে যাবো, তবু সমস্যার শুরুতেই তার সমাধানের কোনও চিন্তা আমাদের মাথায় খেলবে না।
আগে বুঝলে আমাদের নদীগুলো কালো নর্দমায় রূপ নিতো না, আমাদের ফসল-তলা থেকে মাছগুলো উধাও হতো না, রাসায়নিকের সাহায্যে আমাদের ফলমূল বেঁচে থাকতো না,আমাদের বন-বাদাড়গুলো বনই থাকতো, আমাদের সড়ক-মহাসড়কে মানুষ-খেকোরা রাজত্ব করতো না, মাটির নিচের পানি ফুরিয়ে যেতো না, আমাদের যুবকেরা রামদা নিয়ে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াতো না, এ প্রান্তরে কোনও বোমাবাজের জন্ম হতো না, আমাদের মৃতরা গোরস্থানের অভাবে আর মরণাবস্থায় উঠে দাঁড়াতে চাইতেন না, আমাদের ধর্ষণকারীরা উন্মত্ততা থেকে ছুটি চাইতো, আমাদের কন্যারা নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতো, আমাদের মাতালেরা আর রাতকে দিন মনে করতো না।
এ কথাগুলো ভাবতে-ভাবতে পথের দু’ধারে রাস্তার চেয়ে উঁচু করে তৈরি করা পায়ে-চলা পথের কথা মনে হয়। মাথার ওপর দিয়ে গেছে রাস্তার বৈদ্যুতিক বাতির খাম্বা। এক খাম্বা থেকে বিদ্যুতের তার গেছে আরেক খাম্বায়। এ পথে চলতে গিয়ে ওপরে তাকালে বিদ্যুতের তার চোখেই পড়বে না। হরেক রকম ‘অন্যান্য’ তার চুলের জটার মতো ঝুলছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে অথবা ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুললে এক বিমূর্ত চিত্রকর্ম মনে হতে পারে। হাঁটতে-হাঁটতে মাথায় যখন কেবল টেলিভিশনের একটি বাক্স টক্কর লাগবে, বিমূর্ততা তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে চোখের সামনে উপস্থিত হবে। কিন্তু এখন এই চিত্রকর্ম থেকে আমরা মুক্তি চাই।  ফিরে যেতে চাই আমাদের সেই চিরচেনা কয়েকটি তারের খাম্বায়। তারের জঞ্জালে সারা দেশ ছেয়ে গেছে।  কী করে এই জঞ্জাল দূর করা যায় তা নিয়ে আমরা এখন কর্মশালার পরিকল্পনা করতে পারি।  শহর-পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী, রাজনীতিক–সবাই। শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে মস্তিষ্কে ঝড় বইয়ে দিয়ে উপায় বের করতে চেষ্টা করছি। উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। এ জঞ্জাল দূর করবো কী করে! জানি না। জঞ্জালের শুরুতে আমাদের আরও মনে হয়নি।

মনে হয় এই বদ্ধঘরে বসে মাথা আর খেলছে না। চিন্তা করতে হলে বাইরের হাওয়ায় একটু নিঃশ্বাস নিয়ে আসতে হবে।  অফিস থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে নেমে আসি। আসলে শব্দটি ইংরেজিতে ‘ফুটপাথ’। বাংলায় আমরা ‘পাথ’ না বলে ‘পাত’ যোগ করে ফুটপাত বলেই চালিয়ে দিচ্ছি। এখনও যুতসই বাংলা আবিষ্কার করতে পারিনি। যাই হোক, বেরুতেই আবার চোখে পড়ে পাখির বাসার মতো তারের জঞ্জাল।  মেজাজটা বিগড়ে যায়। কেন যে সময় মতো ব্যবস্থা নিলাম না। তখন বুঝলে এখন এত মাথা ঘামাতে হতো না।

বড় রাস্তার ধারে অনেকগুলো টং দোকান আছে। চা খেলে মনে প্রশান্তি আসতে পারে। টংয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি দোকানটি সেখানে নেই।  তার সামনের স্থানে ফুটপাতসহ রাস্তা খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখি এলাকার রাস্তার ঠিক করার সময় মূল রাস্তা থেকে যে গলিটা ভেতরে ঢুকেছে তার মুখে পানি চলাচলের নর্দমা তৈরি করা হয়নি। নর্দমা যে তৈরি হয়নি, তা বোঝা গেছে এক মাস পর। তাই আবার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। ভাবি, শহরে এমন কতগুলো স্থানে নর্দমা বানাতে ভুলে গেছে আমাদের ঠিকেদাররা! নিশ্চয়ই অনেক। তাহলে এগুলো আবার খুঁড়তে হবে? এই যাহ! কেন যে শুরুতেই তদারক করলাম না! কেন যে শুরুতেই পরিকল্পনা করলাম না! কয়েক দিন পরেই তো পানির পাইপ বসানোর জন্য খুঁড়তে হবে। তার কয়েক মাস পরেই আবার বিদ্যুতের লোকেরা আসবে তাদের লাইন বসাতে। তারাও খুঁড়বেন।

সারা বছর ধরে চলবে খোঁড়াখুঁড়ি। খোঁড়াখুঁড়ির সরঞ্জামগুলো সারা রাস্তা জুড়ে এলোপাতাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে। মানুষগুলো যে সহজে রাস্তায় চলাফেরা করবে, তা কখনোই সম্ভব হচ্ছে না। সারা বছরই আমরা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজিয়ে রাখছি। আজ এই সংস্থা, কাল ওই সংস্থা, পরশু সেই সংস্থা। সবক’টি সংস্থা একসাথে বসে আগামী পঞ্চাশ বছরে সব কাজ একবারে করে ফেলবে, তা আমরা চাই না। কেন চাই না, তাও সবাই বুঝি, কিন্তু বেচারা আমরা কিছু বলতে পারছি না। পারবোইবা কী করে! আমরা তো কোনও সিদ্ধান্ত দিই না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক তারা। জঞ্জাল ছড়িয়ে না থাকলে অর্থনীতির চাকা চলবে কী করে। উন্নয়নের চাকা চলবে কী করে।

জঞ্জাল আমরা ভালোবাসি। এই জঞ্জালগুলো না থাকলে, আমাদের চুলোয় ভাত চড়ে না। আমাদের এই নদীগুলোর কথাই ধরুন না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নদী-তীরেই লোকালয় স্থাপিত হয়েছে, অর্থনীতির চাকা চলেছে, সেখান থেকে মানুষ পিপাসা মিটিয়েছে, নিজেকে পরিষ্কার করেছে।  খালপথে, নদীপথে, সমুদ্রপথে আমরা নতুন মাটি আবিষ্কার করেছি, বসতি গেড়েছি, উন্নতি করেছি, মাটির ভিটে বদলে টিনের ঘর ও দালান বানিয়েছি। তার আরও পরে যখন জলের কাছে আমাদের ঋণশোধের সময় এসেছে, তখন আমরা কাপড়ের কারখানা, ট্যানারি কারখানা, সিমেন্ট কারখানা তৈরি করেছি। একসময় এই নদীগুলো আমাদের সঙ্গে কথা বলতো, গান শোনাতো। আমাদের জেলেরা বেঁচে থাকতেন জলে-তলার মাছ মেরে। আজ এই জলের রং কালো। আমরা রসায়নে যত উন্নতি করেছি, ততই নদীর জল কালো হয়েছে, নিগূঢ় হয়েছে। জল পরিষ্কারের রসায়ন-তত্ত্ব আমরা কেন যেন আবিষ্কার করতে পারিনি। আমাদের পদ্মা, আমাদের মেঘনা, আমাদের যমুনা, আমাদের বুড়িগঙ্গা, আমাদের চিত্রা, আমাদের গড়াই, আমাদের আত্রাই, আমাদের বলেশ্বর,আমাদের তিস্তা, আমাদের সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই– সবক’টিই প্লাস্টিক এবং রাসায়নিকের আক্রমণে আজ জঞ্জালে পরিণত হয়েছে, হচ্ছে।

দখলদাররা নদীর তীরগুলো দখল করে নিচ্ছে। নদী দখলদার। দখলদাররা দেশ উন্নত করছেন। ‘জঞ্জালিত’ করছেন; আমরা কিছু বলতে পারছি না; দখলদার’রা অর্থের অধিপতি। অর্থের বিনিময়েই নদী-তীর দখল করছেন। নদী-তীরে যখন আর কিছু থাকবে না দখলের জন্যে, তখন নদীগুলো বুজে যাবে, ফুরিয়ে যাবে, জল শুকিয়ে যাবে।

আমরা জঞ্জাল ভালোবাসি।  না হলে দখলদাররা কী করে আমাদের শান্তি দখল করতে পারেন?

আমরা নিশ্চয়ই জঞ্জাল ভালোবাসি।  না হলে কেন আমাদের সড়কে আমরা নিজেরাই দাপিয়ে বেড়াই? গাড়ি দিয়ে মানুষ চাপা দিয়ে আমাদের লক্ষ্যে চলে যাবো। কোথায় যেন? ভেড়ামারা, না সাঁথিয়া? পঞ্চগড়, না নারায়ণগঞ্জ? পাটুরিয়া, না দৌলদিয়া? রাঙ্গামাটি না জিইসির মোড়? কোথায় নয়? লক্ষ্যে পৌঁছানো কি এতই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবনের চেয়েও? লক্ষ্যে কী আছে? জঞ্জাল নেই তো? নাকি জঞ্জালই আমরা ভালোবাসি। জঞ্জালই চাই!

 

লেখক: গল্পকার ও কলাম লেখক

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ