এই রাজনীতি কেউ চায় না

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৭:৩৯, আগস্ট ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫১, আগস্ট ২৬, ২০১৮

চিররঞ্জন সরকারআমাদের দেশের রাজনীতির কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। যেগুলো অন্য দেশ বা অন্য কোনও সমাজের সঙ্গে খুব একটা মিলবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞায়ও এসব পড়ে না। কিন্তু টিকে আছে বেশ দাপটের সঙ্গেই। এর মূল বিষয়গুলো মোটামুটি এই রকম। প্রথমত, দলের চেয়ে নেতা বড়। ফলে দলের নেতাকর্মীরা দলীয় প্রধানের সঙ্গে সাধারণত ভিন্নমত পোষণ করেন না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ষোলোআনা গণতন্ত্রের চর্চা করা হয় না। নেতৃত্ব নির্বাচনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, সংগ্রামের চেয়ে উত্তরাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় বসার পর একদিকে বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ থাকে, অন্যদিকে ভিন্নমতাবলম্বী মাত্রকেই ষড়যন্ত্রকারী মনে করা হয়। অর্থাৎ সরকারের সমালোচনা সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বিরোধী দলের সমালোচনা যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার নিজেদের সংশোধনের আগ্রহ দেখায় না। আবার বিরোধী দলে থাকলে সব দল জনমুখী রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয় না। কোনও কোনও দল জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি পালন করলেও কোনও কোনও দলের জনস্বার্থের চেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলন-কর্মসূচির প্রতিই ঝোঁক বেশি। বিরোধী দল কখনোই সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের প্রশংসা করে না। উপরন্তু সরকারের তিল পরিমাণ ভুলকে তাল বানিয়ে প্রচার প্রোপাগান্ডায় মেতে ওঠে। একবার চারদিকে চোখ মেলে তাকালে দেখা যাবে এই ‘নবরাষ্ট্রবিজ্ঞানই’ হয়ে উঠেছে আমাদের রাজনীতির মূলস্তম্ভ। আমাদের দেশের সব দলই মোটামুটি এই আদর্শের অনুসারী।

জাতীয় স্তরে আওয়ামী লীগের দিকে তাকালে দেখা যাবে, দলটির সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে সভাপতি। দলের নেতাকর্মীরা সবাই দলীয় প্রধানের ওপর নির্ভরশীল। সরকার ও দলের ভেতরে সৃষ্ট কোনও সংকট, বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার মতো কর্মকাণ্ডে দলীয় সভাপতিকে উদ্যোগ নিতে হয়।
বিএনপিতে আরও ভয়াবহ। এটি সম্পূর্ণ একটি পারিবারিক দল। জাতীয় পার্টিরও একই চিত্র। এই দলগুলো নেতা বা নেত্রীসর্বস্ব হয়ে পড়েছে। কোনও দলেই গণতন্ত্রের চর্চা নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতৃত্বও অনেক ক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারসর্বস্ব। নেতার মৃত্যুর পর স্ত্রী কিংবা সন্তানই ওই দলের হাল ধরেন। এর কোনও বিকল্পই গড়ে উঠছে না।
রাজনীতিতে উন্নয়ন ও ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার একটা প্রবণতাও এখানে গড়ে উঠেছে। কিছুদিন পরপরই ধর্মীয় রাজনীতিকে উসকে দেওয়া, নিজ স্বার্থে ব্যবহার করা—সবই চলছে অব্যাহতভাবে। প্রবলভাবে জাগিয়ে তোলা হয়েছে ধর্মানুভূতি। এই অনুভূতিতে কখনও আঘাত করে নাস্তিক নামধারী কেউ, কখনও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কেউ। তারপর চলে তাণ্ডব। এই তাণ্ডব থেকে রাজনৈতিক দলগুলো কিছু ফায়দা আর সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিছু নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি ভাঙে, সর্বস্বান্ত হয়। মার খায়। প্রতিমা ভাঙা হয়। তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যায়। আক্রান্ত পরিবার ও মানুষটা শুধু মনে মনে মরে যায়।
আমাদের দেশের রাজনীতিতে অনেক কথা হয়, বিদ্বেষ, ঘৃণা, পারস্পরিক খেয়োখেয়ি অনেক হয়, কিন্তু পারস্পরিক কথোপকথন একেবারেই হয় না। অথচ কথোপকথনের রাজনীতির জানালাটা খোলা রাখাটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একথা ঠিক যে আমাদের দেশটি ছোট আকারে হলেও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলেছে। সমাজের নিচু স্তর থেকে তথাকথিত অল্পশিক্ষিতরা রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসছে। রাজনীতিতে মেয়েদের উৎসাহ ও অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তথাকথিত বাঙালি ভদ্রলোকেরা এতে আশাহত। বর্তমানের এই রোমান্স এবং অনিশ্চয়তাকে নতুন করে স্বাগত জানানোর সময় এসেছে। প্রয়োজন, সমাজের গতিশীলতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের গতিশীল করা।
সংগঠন করা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার, সত্যি কথা। কিন্তু আমি জানি, অনেকে শুধু সংগঠনই করেছেন বা এখনও করছেন, কোনও কাজ না করে। রাজনীতি করে প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে ঘায়েল করা যায় অফিস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত কাজের চেয়ে তা অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। মাইনে নিয়ে শুধু মিছিল করেন, এমন লোকও প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে। তাকে ঘাঁটায় কার সাধ্য?
সবাই নিশ্চয়ই এমন নয়। অনেকেই আছেন, যারা কখনও কোনও দিন কোথাও রাজনীতির সাহায্যে ক্ষমতাবান হতে চাননি। তারাও এক অর্থে রাজনীতির বাইরে নন। কারণ, আমাদের ব্যবহারিক জীবনে রাজনীতিকে এড়ানো শক্ত, কিন্তু তারা তো আর প্রধানমন্ত্রী হতে চান না। তবে এখানে বলে রাখি, সম্প্রতি স্থানীয় একটি ক্লাব সংক্রান্ত নির্বাচনের সাক্ষী হয়েছিলাম। সেখানে তাদের হাবভাব দেখে মনে হয়েছিল, এবার বোধহয় যুদ্ধ বাধবে। কে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হবেন, তা নিয়ে যে পরিমাণ নেপথ্য স্ট্র্যাটেজি করা হচ্ছিল, মনে হলো ক্লাব নয়, কোনও দেশের সাধারণ নির্বাচন দেখছি! আসলে, চরম পেশাদারি সাফল্যও তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দেয়নি, যে ক্ষমতাবলে তারা তাদের পাড়ার মাথা হবেন। তারা কি কেউ কোনও দিন ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে নেমে দেশের ভার নেবেন? মনে হয় না।
রাজনীতি চর্চার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক দিক আছে, আর অন্যদিকে রয়েছে রাজনীতির কায়িক চেহারা, যেখানে ‘দাপুটে’ নেতার রমরমা। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে রাজনীতির তথাকথিত ভদ্রলোকেরা শুধু নিজেদের সামাজিক পরিসরে ক্ষমতা দখলের খেলায় মেতে ওঠেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে যে আখড়া, সেখানে ভিড় বাড়তে থাকে। রাজনীতি চর্চা হয়ে দাঁড়ায় মুদ্রাদোষের মতো। না করে থাকতে পারেন না।
কেউ বলতে পারেন, প্রত্যক্ষ রাজনীতি মানেও তো দুর্নীতি। তার জন্যই তো যত সমস্যা। কিন্তু এখানে সেটা প্রশ্ন নয়। পাড়ার স্কুল, কলেজ, ক্লাব, ট্রেড ইউনিয়কে কব্জা না করে বা নিজেরই সহকর্মীকে বিভাগ থেকে না তাড়িয়ে, যদি সেই কূটবুদ্ধি যদি তারা বৃহত্তর রাজনীতির মঞ্চে নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োগ করতেন, ভালো হতো নাকি?
ক্ষুদ্র পরিসরে পরোক্ষ রাজনীতির কোনও সুফল নেই, এমন কথাও বলছি না। হাজার হোক, রাজনীতির সাহায্যেই তো অশুভ শক্তিকে ঠেকানো যায়, অন্তত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সেটাই শিক্ষা। কিন্তু অত্যধিক রাজনীতির সমস্যা বিস্তর। যেমন, নামি-দামি অধ্যাপকের পরিচয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম হওয়া উচিত। সেই নাম ও দাম তার কাজের প্রতিফলনে হবে, এটাই বাঞ্ছনীয়; কে ভিসি-প্রোক্টর হবেন, কে সিনেট-সিন্ডিকেটের সদস্য হবেন, তা নিয়ে নয়। এই কথাটাই আমরা এখন ভুলতে বসেছি।
পরিশেষে একটা সর্বগ্রাসী সর্বব্যাপ্ত রাজনীতির কথা না বলে পারছি না। ‘আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি’র রাজনীতি, যেখানে কয়েকজন বলে, আর সবাই চুপ করে থাকে। অশান্তি নেই, প্রতিবাদ নেই, মিছিল নেই, মশাল নেই। যেন স্বেচ্ছায় স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছে সবাই কোনও এক অমোঘ, নিরঙ্কুশ, সদাসত্য রাজনৈতিক দর্শনের তাড়নায়। বিতর্ক নেই, তাই সংঘাতও নেই। দিনের পর দিন হাড়-হিম-করা শৃঙ্খলে আবদ্ধ সে ব্যবস্থা, যেখানে কাতারে কাতারে যোগ্য পদপ্রার্থীরা বঞ্চিত বা বিতাড়িত। শান্ত রাজনীতিই সর্বদা কাম্য, এমনটা হয়তো নয়।
রাজনীতি অবশ্যই চাই। সে রাজনীতি হবে কাজের ভিত্তিতে, সুস্থ প্রতিযোগিতা ও গণতান্ত্রিক বিধান মেনে। তর্ক চাই, প্রতিবাদ চাই, বিরোধিতাও চাই, কিন্তু সেটা হবে শালীন, নিয়মতান্ত্রিক, সুস্থ চর্চা। ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে গায়ের জোরে, কূটকৌশল প্রয়োগ করে সবকিছু দখল করে নেওয়া, নীতিহীন ষড়যন্ত্রের পথকে আদর্শ মেনে সেই ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর চর্চা চালিয়ে যাওয়া আর যাই হোক রাজনীতি হতে পারে না। এই রাজনীতি কেউ চায়ও না।
লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ