এক পা আন্দোলনে, এক পা নির্বাচনে

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৪:২৯, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩১, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকারদেশের রাজনীতি ক্রমেই তপ্ত হয়ে উঠছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনীতি ততই গরম হচ্ছে। গরম তাওয়ায় রুটি সেকতে সুবিধা হয়। তবে তাওয়াটা কে, কতটুকু গরম করতে পারবে তা বলা মুশকিল। এবং কে কতটা রুটি কত দ্রুত সেকবে সেটাই দেখার বিষয়! দেশের সবচেয়ে পুরনো দল আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এই দলের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বলা হয়ে থাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সহজ কিংবা অন্য কথায় সম্ভব হতো না। আওয়ামী লীগ নামক সংগঠনটি বঙ্গবন্ধুরই হাতে গড়া। তার হাতের জাদুস্পর্শে আওয়ামী লীগ হয়ে উঠেছে রাজনীতির এক দুর্দমনীয় শক্তি।
আওয়ামী লীগের আগে-পরে দেশে আরও অনেক দল গড়ে উঠেছে। এর কিছু বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে, কোনোটাবা হ্যারিকেনের আলোর মতো টিমটিম করে জ্বলছে। আবার আওয়ামী লীগের অনেক পরে জন্ম নিয়েও দু-একটি রাজনৈতিক দল রাজনীতিতে প্রভাব বজায় রেখে চলেছে। এরমধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি।

১ সেপ্টেম্বর বিএনপি ৪০ বছরে পা রাখলো। কম নয়। জন্মদিনে বিএনপিকে অভিনন্দন ও শুভ কামনা।

বিএনপিকে বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান দল। এই দলটি জন্মলাভ করেছে ক্ষমতার গর্ভে। জনগণের প্রয়োজনের কথা ভেবে এই দলের জন্ম হয়নি। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনের ভিত শক্ত করার প্রয়োজন থেকেই বিএনপির জন্ম। তাই বিএনপি হলো ক্ষমতার দল। অনেকে এমনও মনে করতেন যে জিয়াউর রহমানের অবর্তমানে বিএনপি নামক দলটির অস্তিত্ব থাকবে না। কেউবা বিএনপির পরিণতি মুসলিম লীগের মতো হবে বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।

তবে এসব কিছু ভুল প্রমাণ করে বিএনপি এখনও টিকে আছে এবং বেশ প্রবলভাবেই আছে। কারও কারও ধারণা, জিয়াউর রহমানের সময়ের চাইতে খালেদা জিয়ার সময়ে বিএনপি বেশি সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। খালেদা জিয়ার মতো রাজনীতিবিমুখ একজন সামরিক কর্মকর্তার গৃহবধূ বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটিকে নতুন প্রাণ ও গতি সঞ্চার করেছেন। খালেদা জিয়া বিএনপিকে একাধিকবার ক্ষমতায় বসিয়েছেন। আবার সত্য এটাও যে খালেদা জিয়ার কারণেই  বিএনপি বর্তমানে এক গভীর সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের কারণে বিএনপি মূলত সংসদীয় রাজনীতির ধারার বাইরে চলে যায়। বিএনপি না সংসদে, না রাজপথে অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায়।

এরমধ্য রাজনীতিতে আরও কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দোষী সব্যস্ত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ থেকে খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন। বেগম জিয়াকে জেলে নিলে দেশে ব্যাপক গণঅসস্তোষ দেখা দেবে বলে বিএনপি আশা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে খালেদা জিয়ার গ্রেফতারে দেশে তেমন কোনও তোলপাড় তৈরি হলো না। মানুষ বিষয়টিকে খুব অস্বাভাবিকভাবে নেয়নি।  খালেদা জিয়া দ্রুত মুক্তি পাবেন বলে যে আশা বিএনপি করছিল তাও বাস্তবে ঘটেনি। এখন বিএনপির মূল দাবি বেগম জিয়ার দ্রুত মুক্তি। কিন্তু বিষয়টি যেহেতু এখন আদালতের এখতিয়ারে চলে গেছে, সেহেতু বেগম জিয়া কবে মুক্তি পাবেন বলা কঠিন।

বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়া মুক্তি না পেলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। আবার সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিও বিএনপির আছে। প্রশ্ন হলো, এই দুই দাবি আদায় না হলে কি বিএনপি নির্বাচনে যাবে না? বিএনপি যদি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাহলে দলগতভাবে টিকে থাকা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করতে হলে বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে–এর কোনও ভালো বিকল্প নেই। অনেকেই মনে করেন, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান প্রকাশ্যে যাই বলুক না কেন, বিএনপিকে নির্বাচনে যেতেই হবে। তা না হলে রাজনীতি থেকে বিএনপির ছিটকে পড়ার অবস্থা হবে। বিএনপি মহাসচিব সঙ্গত কারণেই বলেছেন, বিএনপির এখন এক পা আন্দোলনে, একপা নির্বাচনে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে গেলে বিএনপি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থা পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু  প্রশ্ন হচ্ছে, আন্দোলন বলতে বিএনপি কী বোঝাচ্ছে? আন্দোলন মানে কি হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও, সহিংসতা? নাকি শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকারের ওপর কোনোভাবে চাপ সৃষ্টি?

আন্দোলনের আসলে কোনও ধরাবাঁধা ছক নেই। কোনও ঘটনায় মানুষের মনে তীব্র ক্রোধ অথবা কোনও ঘটনায় ব্যাপক অনীহা তৈরি হবে সেটা আগেভাগে আন্দাজ করা যায় না। মানুষের মনস্তত্ত্ব এক জটিল জিনিস। ২০ জন কিংবা তারও বেশি মানুষের মৃত্যুও হয়তো কখনও আমাদের আবেগমথিত করে না, আবার দুইজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু আমাদের উদ্বেলিত করে তোলে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা এখন মূলত জনমনস্তত্ত্বের তোয়াক্কা করেন না। মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনা করে রাজনীতির কর্মসূচি নির্ধারণ করেন না। নিজেদের চাওয়া-পাওয়াকে জনগণের দাবি বলে চালিয়ে দেন। ফলে তাদের ডাকে মানুষ সাড়া দেয় না।

মানুষের বাকস্বাধীনতা নেই, কথা বলার সুযোগ নেই, সরকার মতপ্রকাশে বাধা দিচ্ছে–এসব মুখস্থ কথা বলে এখন মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ কম। কারণ, এখন মানুষের হাতে হাতে খবরের যন্ত্র। বলা যায় যার হাতে একটি এনরয়েড ফোনসেট আছে তিনি আসলে একটি টেলিভিশন সেটের মালিক। মানুষের কাছ থেকে এখন তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই। আপনি যখনই আমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উত্থাপন করবেন, তখনই আপনাকে নিজের সম্পর্কেও সাবধান হতে হবে। কারণ, আপনার তথ্যও আমার হাতের মুঠোয়।

পুরনো কৌশলে রাজনীতি করার দিন শেষ। চল্লিশ বছরের বিএনপিকে এখন চোখ খুলে সামনে দেখতে হবে। গাঁজাখুরি গল্প একসময় মানুষকে মোহগ্রস্ত করতো, এখন আর তা করে না।

এক গ্লাস পানি, এক মুঠ গুড় এবং এক চিমটি লবণ দিয়ে যে খাবার স্যালাইন বানানো যায় সে তথ্য এখন অনেক সাধারণ মানুষই জানে। এটা মনে রেখেই রাজনীতির কৌশল ঠিক করতে হবে। আপনি সরকারকে চেপে ধরার জন্য নানা কৌশলে বিভিন্ন ধারার লোককে সমবেত করতে চাইবেন, আর সরকার সুর সাধনায় মগ্ন থাকবে, সেটা কী হয়? ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় দিয়ে সরকারও আপনাকে চেপে ধরবে।

রাজনীতি সব সময় কৌশলের খেলা এবং এই খেলায় ফাউল হবে না সেই নিশ্চয়তা কে দিতে পারে?

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ