তামিম কি ঠিক কাজ করেছেন?

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ১৭:০৩, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১১, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮

ইকরাম কবীরএশিয়া কাপে খেলতে গিয়ে আমাদের তামিমের হাতে চোট লেগেছিল। পরে জানা গেছে, তার হাড়ে চিড় ধরেছে। তারপরও তাকে মাঠেনামা থেকে কেউ বিরত করতে পারেনি। দল জেতানোর জন্যেই অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েও খেলতে নেমেছিলেন তামিম। সবাই বাহবা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম, দেশবাসী, স্পন্সর–সবাই। তামিমের দেশপ্রেমের প্রশংসা করে সবাই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। চারিদিকে তামিমের ‘সাহসিকতা’, তামিমের ‘দেশপ্রেম’, তামিমের ‘জেতার ইচ্ছা’র প্রশংসা। যে সাহস জীবনে বাংলাদেশের আর কেউ দেখাননি, তামিম তাই দেখিয়েছেন। চিড় ধরা হাত নিয়ে একহাতে খেলেছেন তিনি।
অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে ব্যাপারটি। নিজের শরীরে এমন দুর্যোগ নিয়ে ক’জন খেলোয়াড় আবার মাঠে নামতে সাহস করবেন? এই সাহসের কাজই তামিম করেছেন এবং আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলকে জেতানোর জন্য তার কতটা ইচ্ছে ছিল, কতটা উন্মাদনা। তার সাহস ও সদিচ্ছা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

তবে আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। ব্যাপারটিতে দেশপ্রেমের প্রতিফলন হয়েছে, সাহসের প্রতিফলন হয়েছে, কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তে পেশাদারিত্বের কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, তা দেখার বিষয়। আমি মনে করি, এটি ছিল একটি ‘অপেশাদার’ সিদ্ধান্ত। দলের ফিজিও-থেরাপিস্ট তাকে মাঠে নামতে মানা করেছিলেন। দলের প্রশিক্ষক তাকে মানা করেছিলেন। খবরে পড়লাম, দলপতি মাশরাফির কথা শুনেই নাকি তামিম উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। দলপতি কেন তাকে এই অনুরোধ করলেন? তিনি কার সঙ্গে আলোচনা করে তামিমকে আবারও নামতে বলেছিলেন? দলের ম্যানেজার? প্রশিক্ষক? চিকিৎসক? কে? হাড়ে চিড় ধরা একজন খেলোয়াড়কে দলপতি কেন মাঠে নামতে বলবেন? মাশরাফির মতো দলপতি বাংলাদেশের ক্রিটেটের ইতিহাসে বিরল, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তার সব সিদ্ধান্তই ঠিক!  দলপতি মানুষ এবং তিনি ভুলও করেন। আমি মনে করি, এমন আহত একজন সদস্যকে ঠেলে আবার মাঠে প্রবেশ করিয়ে দেওয়াটা উচিত নয়। একটি ম্যাচ আমাদের জন্য জীবন-মরণ সমস্যা নয়। বরং তামিমের মতো একজন খেলোয়াড়কে সুস্থ করে তোলার ওপরই নির্ভর করবে আমাদের ভবিষ্যৎ খেলার জয়-পরাজয়। একটি ম্যাচে হেরে গেলেই আমাদের সব মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে যেতো না।

ধরুন আপনার সন্তানের প্রচণ্ড জ্বর হয়েছে; আপনি কি তাকে জোর করে স্কুলে পাঠাবেন? অবশ্যই না। তার সুস্থতা সবার আগে, স্কুল নয়। তেমনই তামিমের সুস্থতা ম্যাচ জেতার চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ।

আমার নিজের জীবনের দু’টি ঘটনা উল্লেখ করি। ১৯৮৩ সাল। ঝিনাইদাহ ক্যাডেট কলেজে আন্তঃহাউস বাস্কেটবল প্রতিযোগিতা চলছে। খায়বার হাউসের সঙ্গে বদর হাউসের খেলা। বলতে লজ্জা-লজ্জা ভাব হচ্ছে। তবে, আমি নিজেই ছিলাম দলের সবচেয়ে ভালো বাস্কেটবল খেলোয়াড়। খেলা চলছে। আমরা ভালো খেলছি। কিন্তু প্রথম দশ মিনিটের মাথায় বদর হাউসের জিলানি ও শাফিনের ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়লাম একেবারে শানের ওপর। আমি টের পাইনি যে, আমার থুতনি কেটে গেছে। প্রিন্সিপাল স্যার কাছেই বসে খেলা দেখছিলেন। হাসপাতালের কমপাউন্ডারও কাছেই ছিলেন। আমাকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। তিন-তিনটে সেলাই করা হলো। সেলাই শেষ করেই আমি দৌড়ে চলে এলাম আবার মাঠে নামতে। আমার দলকে জেতাতেই হবে। বাদ সাধলেন প্রিন্সিপাল স্যার। জানালেন আমার সুস্থতা তার কাছে খায়বার হাউস জেতার চাইতেও অনেক বড়। রাগে ফুলে উঠেছিলাম তখন। তার সিদ্ধান্তের কারণেই আমার দল জিততে পারেনি। তবে, পরে বুঝেছিলাম, তিনি ঠিক সিদ্ধান্তেই নিয়েছিলেন। একজন আহত খেলোয়াড় আহত হওয়ার আগে যেই খেলা খেলতে পারবে, পরে আর তেমন খেলতে পারবে না, তা বুঝেছিলাম।

অন্য ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮২ সালে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে আন্তঃক্যাডেট কলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়। ভলিবলে আমাদের সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড় কবীর ভাই ছিলেন আহত। তার ডান হাত পুড়ে গিয়ে তিনি আহত হয়েছিলেন। তিনি যখন দেখলেন যে, আমরা রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের কাছে দু’টো গেইম পর-পর হেরে গেলাম, তিনি তখন খেলতে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তার বাম-হাত দিয়ে খেলবেন। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। বিরক্তও হয়েছিলাম। তিনি খেলতে নামার পর দেখা গেলো আমরা আরও খারাপ খেলছি। আরও তাড়াতাড়ি হেরে যাচ্ছি। কবীর ভাই ডান হাতে যা খেলতেন, বাম হাত দিয়ে কিছুই করতে পারছিলেন না। এমন ঘটনা বিশ্বে ভুরি-ভুরি আছে।

ঘটনা দু’টোর কথা যে কারণে বললাম তা হচ্ছে, আঘাত পেলে খেলায় একজন খেলোয়াড়ের গতি ও দক্ষতা কমে যায়। আগের মতো আর খেলতে পারেন না। মনে হতে পারে আমি পারবো, তবে বিশ্বাস করুন, পারা সম্ভব নয়। একহাতে ব্যাট করা সম্ভব নয়। সবাই জানে। তামিম যেই কাজ দেখে আমরা বাহবা দিয়েছি, তা দিয়ে আবেগ-আপ্লুত হয়ে। পেশাদারিত্বের দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে ছিল না। তামিম ভাঙা হাত নিয়ে মাঠে নামতে চাইলো, আর  (দলের অন্যান্য সবাই) তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো সবাই? কেউ তাকে বাধা দিতে পারলো না! তাহলে তো বলবো, দলের ভেতর শৃঙ্খলারও ঘাটতি আছে।

খবরে আরও দেখলাম, একটি কোম্পানি তামিমকে এই ভাঙা হাত নিয়ে খেলতে নামার জন্য দশ লাখ টাকা দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছে। দিক, অবশ্যই তামিমকে টাকা দিক। তবে তামিম হওয়ার জন্য অর্থ দিক, আহতাবস্থায় মাঠে নামার জন্য নয়। তাকে অর্থ দিক আরেকজন তামিম তৈরি করার জন্য। শুধু তামিমকে নয়, আমাদের সব ক্রিকেটারকেই দিক। মাশরাফিকে দিক আরেকজন মাশরাফি তৈরি করার জন্য। আমাদের তামিম বসে পড়লে আর তামিম নেই, আমাদের মাশরাফি অবসর নিতে চাইলে আর মাশরাফি নেই। মুশফিক আহত হলে আর মুশফিকের মতো কেউ নেই। আবেগাপ্লুত  হওয়ার চেয়ে এই বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া সবার আগে জরুরি।

লেখক: গল্পকার ও কলাম লেখক।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ