নানা ফাঁদে নারী ও তার প্রতিকার

Send
শারমিন আকতার
প্রকাশিত : ১৪:৪৫, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৭, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮

শারমিন আকতারমাও সে-তুং বলেছিলেন, ‘নারীরা অর্ধেক আকাশ’। কিন্তু এই অর্ধেক আকাশ যখন মেঘে ঢাকা থাকে, তখন পৃথিবীর অর্ধেকেও নেমে আসে অন্ধকার। এই অন্ধকার দূর করতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন। সীমিত ক্ষমতায়ন শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীকেও ঠেলে দিচ্ছে বিভিন্ন ফাঁদে, ফলে তারা শিকার হচ্ছেন শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক হয়রানির। এমনই কয়েকটি ফাঁদ হলো:

কর্মক্ষেত্রের ফাঁদ

‘বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদন-২০১০’ অনুযায়ী দেশের ৩৬ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভারতসহ অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। নারীর কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে পোশাক কারখানা। বর্তমানে পোশাক কারখানায় নিয়োজিত মোট শ্রমিকের ৮০ ভাগই নারী। কিন্তু এই নারীদের বেশিরভাগই তাদের সহকর্মী ও সুপারভাইজারদের তৈরি ফাঁদে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) জরিপ অনুযায়ী, পোশাক কারখানায় কর্মরত ৮৪ শতাংশ নারী বিভিন্ন রকম হয়রানির শিকার। এছাড়া, দেশে কর্মক্ষেত্রের স্বল্পতার কারণে অনেক নারীই পাড়ি জমাচ্ছেন বিভিন্ন দেশে। কিন্তু এসব নারীর অনেকেই চাকরির প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে বৈধ ও অবৈধ উপায়ে পাচার হয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যাশিত চাকরি পাওয়ার বদলে তারা বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন যৌনদাসী হিসেবে। যৌনদাসত্ব ও নির্যাতনের শিকার এসব নারীর অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরছেন। বেসরকারি এনজিও ব্র্যাকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় ৫ হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।

শুধু শ্রমিক শ্রেণির নারীরাই যে কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, এমনটি নয়। বাংলাদেশ মহিলা পুলিশের ওপর করা কমনওয়লেথ হিউম্যান ইনিশিয়েটিভের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১০ শতাংশ মহিলা কনস্টেবল ও ৩ শতাংশ মহিলা দারোগা পুলিশ যৌন হয়রানির শিকার হন। নারী সাংবাদিকদের ওপর করা ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সেফটি ইনস্টিটিউটের একটি জরিপে দেখা যায়, ৩১ দশমিক ৮৮ শতাংশ নারী সাংবাদিক তাদের কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হন। এছাড়া, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি জরিপে জানা যায় যে, ২২ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

প্রেমের ফাঁদ
কর্মক্ষেত্রের ফাঁদের পাশাপাশি প্রেমের ফাঁদে পড়ে প্রতিবছর ধর্ষিত ও পাচার হয়ে যাচ্ছেন হাজারও নারী। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির হিসাব মতে, প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। পাচারকারী চক্রগুলো কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে প্রেমের ফাঁদ। মানবপাচারের বিরুদ্ধে কাজ করা একাধিক সংস্থার মতে, গ্রাম বা মফস্বলের কলেজপড়ুয়া ছাত্রীরা এই ফাঁদে সবচেয়ে বেশি পড়ছে। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, পাচারের শিকার হওয়া নারীদের ৬০ ভাগেরও বেশি কিশোরী, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।

প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের ঘটনাও প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে। পোশাককর্মী, গৃহবধূ, চাকুরিজীবী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাও আটকে যাচ্ছে এই ফাঁদে। গত বছর প্রকাশিত রেইনট্রি হোটেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের ঘটনা জনমনে নাড়া দিয়ে যায়। এছাড়া, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের ঘটনার কথা প্রায়ই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে উঠে আসছে। বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, থানায় রুজুকৃত ধর্ষণ মামলার ৮০-৯০ শতাংশ ঘটে প্রেমে প্রতারণার মাধ্যমে।

বিবাহের ফাঁদ

মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিয়ে এবং পরবর্তী সময়ে প্রতারণার ফাঁদেও পড়ছেন নারীরা। প্রতারকরা কথিত বিয়ের মাধ্যমে যৌতুকের নামে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছেন অনেক নারীর কাছ থেকে। শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানিরও শিকার হচ্ছেন অনেকেই। সম্প্রতি বিয়ের ফাঁদে পড়ে বাংলাদেশ থেকে চীনে পাচার হয়ে যাচ্ছেন অনেক পাহাড়ি নারী। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে ম্যারেজ মিডিয়ার নামে বিয়ের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে এসব নারীকে। ধর্ম ও চেহারাগত মিলের কারণে পাহাড়ি তরুণীরা পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী গত ছয় মাসে প্রায় ৫০০ নারী চীনা নাগরিকদের বিয়ের ফাঁদে পড়ে পাচার হয়ে গেছেন। ফলস ম্যারেজ বা ছলনার বিয়ের ফাঁদেপড়া এই নারীরা পরবর্তী সময়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন অন্ধকার জগতে।

বিয়ের ফাঁদে পড়ছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নারীরাও। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলো স্থানীয় ছেলেদের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই আইন মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশিদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বিয়ে নিষিদ্ধ করে একটি পরিপত্র জারি করায় বিয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব তারা পাচ্ছেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিয়ের কিছুদিন পরই এসব তরুণী হচ্ছেন স্বামী পরিত্যক্তা। এছাড়া, বাংলাদেশি ছেলেদের সঙ্গে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রোহিঙ্গা মাঝি নামক দালালরা রোহিঙ্গা তরুণীদের জড়িয়ে ফেলছে অনৈতিক কাজে। উখিয়ার ১২ অস্থায়ী শিবির থেকে স্থানীয় ভালো পরিবারে বিয়ের নামে বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছেন রোহিঙ্গা তরুণীরা। কিন্তু পাচারের এই বিষয়টি এখন পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি জরিপের আওতায় না আসায় সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা যাচ্ছে না।

প্রযুক্তির ফাঁদ

প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে-সঙ্গে বেড়ে চলছে সাইবার অপরাধ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরা পড়ছেন এই অপরাধের ফাঁদে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেমন—ফেসবুক, টুইটার, ও ইউটিউবে নারীরা সবচেয়ে বেশি হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। কোনও কারণে সম্পর্কের অবনতি ঘটলেই এসব মাধ্যমে অশ্লীল ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে বা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে নারীদের। বিআইএসআর-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের ৭৩ শতাংশ সাইবার অপরাধের শিকার। তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সাইবার হেল্প ডেস্কের তথ্য মতেও সাইবার অপরাধে অভিযোগকারীদের ৭০ ভাগই নারী। অভিযোগকারীদের ৬০ ভাগেরও বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন। এরমধ্যে ১০ ভাগ অভিযোগের মাত্রা ভয়াবহ (অশ্লীল ছবি ও ভিডিও প্রকাশ)। সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা থেকেও দেখা যায় ৮২ শতাংশ সাইবার অপরাধের ফাঁদে পড়ছেন নারীরা। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৮-৩০ বছরের নারীরা সাইবার অপরাধের ফাঁদে সবচেয়ে বেশি পড়ছেন যা ৭৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। জরিপটিতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্টের ফাঁদে পড়ছেন ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ নারী। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিদেশ থেকে উপহার পাঠানোর নামে বড় অঙ্কের টাকাও আদায় করে নেওয়া হচ্ছে নারীদের কাছ থেকে।

এসব ফাঁদ থেকে বাঁচার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে সচেতনতা বৃদ্ধি। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের গবেষণাটিতে দেখা যায় সাইবার অপরাধের ফাঁদে পড়া ৩০ শতাংশ নারীই জানেন না, কীভাবে এই অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হয় এবং ৩৯ শতাংশ ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে অভিযোগ করে আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না। তাই এসব নারীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে কর্মশালা আয়োজনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও এ বিষয়ে দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন।

ছলনার বিয়ে ও প্রেমের ফাঁদ থেকে বাঁচতেও প্রয়োজন সচেতনতার। যেহেতু কিশোরী ও তরুণীরাই এই ফাঁদে বেশি পড়ছেন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের হারও তাদের মাঝে বেশি, মিডিয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ফাঁদগুলো সম্পর্কে তাদের অবহিত করতে হবে। তবে পরিবারের ভূমিকা এক্ষেত্রে মুখ্য। কোনও ফাঁদে তারা পড়ছে কিনা, সেটা জানতে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অপরিচিত বা ভিনদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের আগে যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। এছাড়া, কমিউনিটি লেভেলে স্থানীয় এনজিও, চেয়ারম্যান বা মেম্বারের মাধ্যমে পরিবারগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

কর্মক্ষেত্রের ফাঁদ এড়াতে কর্মক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া চাকরির ফাঁদে পড়ে পাচার হওয়া নারীদের বাঁচাতে সরকারি পদক্ষেপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে বিশেষ করে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের রক্ষার্থে তেমন কোনও আইন না থাকায় নারী নির্যাতনের প্রতিকার স্বরূপ ২০১৫ সাল থেকে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও শ্রীলঙ্কা সেখানে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে জি-টু-জি পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। এছাড়া তাদের সেখানে বেসরকারি শিল্পকারখানার কর্মী হিসেবে বা সেবা খাতে যেমন নার্স বা আয়াসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে কর্মসংস্থান করা যেতে পারে। দোকানে বিক্রয়কর্মী, স্বর্ণের দোকানকর্মী, প্যাকেজকর্মী বা ড্রাইভারসহ (বর্তমানে তা অনুমোদিত) নানাবিধ খাতেও তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গৃহকর্মী হিসেবে চাকরিতে যারা যাচ্ছেন, তারা সেখানে গৃহকর্তার বাসায় না থেকে একটি শহরে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে একদল গৃহকর্মী একসঙ্গে থাকতে পারেন। প্রতিদিন তারা আট ঘণ্টা কাজ করে নিজ বাসায় এসে থাকবেন। এভাবে একটি বড় শহরের বিভিন্ন এলাকাকে জোন ভাগ করে একাধিক গৃহকর্মী বাসস্থানের ব্যবস্থা করে সরকার অনায়াসে এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। এছাড়া তাদের হাতে মোবাইল দিতে হবে, যেন যেকোনও সময়ে কোনও সমস্যা হলে তারা পুলিশসহ বাংলাদেশ দূতাবাসে হটলাইনে  জানাতে পারেন। তাহলে পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব হবে এবং এ বাজারটির সুবিধা বাংলাদেশের নারীরা নিতে পারবে।

লেখক: গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট। জেন্ডার, অভিবাসন ও অপরাধ তার গবেষণার বিষয়।
ই-মেইল: akther.sarmin101@gmail.com

 

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ