জমে উঠছে রাজনীতি

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৫:৩১, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৯, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৮

 

বিভুরঞ্জন সরকারদেশের রাজনীতির অঙ্গন জমে উঠতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে নানামুখী তৎপরতা। 
আওয়ামী লীগ নির্বাচনি দৌড় আরম্ভ করে দিয়েছে। বিএনপি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ড.  কামাল হোসেন এবং ডা. বদরুদ্দোজার ঐক্য প্রচেষ্টায় বিএনপি শামিল হয়েছে। এই ঐক্যের দৌড় কতদূর পর্যন্ত তা এখনও পরিষ্কার নয়। অনেকে এ নিয়ে নানা খোয়াব দেখছেন। আমার কাছে দুই প্রবীণ নেতার উদ্যোগকে তেমন কোনও বড় ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। ডক্টর ও ডাক্তার সাহেবদের নামডাক আছে। কিন্তু তাদের পিছে মানুষ নেই। বিএনপি-জামায়াতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার কোনও সক্ষমতা তারা দেখাতে পারবেন না। তাদের নিজস্ব শক্তিতে নির্বাচনে জিতে আসার সম্ভাবনা তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও দেখেন বলে মনে হয় না। দফায় দফায় বৈঠক করে একমঞ্চে সমবেত হওয়ার ঘোষণা দিলেও নানা অমিল-গরমিলের খবর অচিরেই পাওয়া যাবে।
তবে দেশের কিছু সংখ্যক মানুষের মনে ঐক্যফ্রন্ট বা যুক্তফ্রন্ট নিয়ে আগ্রহ থাকলেও নির্বাচন আসতে আসতে সেটা কী আকার বা রূপ নেবে সেটা এখনই স্পষ্ট করে বলা যাবে না। কিছু এদিক ওদিক হওয়ার ঘটনা ঘটবে। জাতীয় ঐক্যে আরও কিছু যোগ-বিয়োগ হবে। জামায়াত প্রশ্নে মীমাংসা হতে হবে। একাত্তর, বঙ্গবন্ধু, পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি নিয়ে ঐক্যওয়ালাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। বিএনপি ছাড় দিয়ে হলেও বৃহত্তর ঐক্য চায় বলে জানিয়েছে। তবে ছাড় দেওয়ার প্রশ্ন যখন সত্যি সামনে আসবে তখন বোঝা যাবে প্রকৃত অবস্থা। বিএনপিকে যদি আসন এবং নীতি সব ক্ষেত্রেই ছাড় দিতে হয় তাহলে বিএনপি তা মানবে কি? ঐক্যের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে? ঐক্যের স্বার্থে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে দূরে রাখার প্রশ্ন আসলে অবস্থা কেমন দাঁড়াবে?

সরকার পতনের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। আন্দোলন করে যদি সরকারের পতন ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয় তাহলে বেশিদূর এগুতে পারবে বলে মনে হয় না। আন্দোলন করে সরকারের পতন হবে না। আন্দোলন করার ক্ষমতাও যেমন সরকারবিরোধীদের নেই, তেমনি দেশের মানুষও আন্দোলনের মুডে নেই। মানুষ এখন যার যার জীবন ও জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগায়োগ মাধ্যমে ঝড় উঠবে, কিন্তু বাস্তবে আন্দোলনের বাতাসে গাছের পাতাও নড়বে বলে মনে হয় না।

তবে সরকারকে চাপে রাখার নানা চেষ্টা চলবে। অনির্ধারিত বা হঠাৎ ইস্যু খোঁজা হবে। তৈরি করার চেষ্টা হবে। ছাত্রসহ পেশাজীবীদের ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা হবে। তবে কৌশলের খেলায় সরকার বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে সরকার প্রধান শেখ হাসিনাকে হারানোর সক্ষমতা কেউ এখন পর্যন্ত অর্জন করতে পেরেছে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। নির্বাচনের আগেই দেশে ‘কিছু একটা' ঘটিয়ে সরকার পতনের চপলতা দেখাতে গেলে তার ফলও ভালো হবে না। কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর চেষ্টায় সময় অপচয় না করে রাজনীতির স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গেই সবাইকে থাকতে হবে।

নির্বাচন ছাড়া অন্য উপায়ে সরকার বদলের স্বপ্ন দেখার বদঅভ্যাস থেকে যারা এখনও বেরিয়ে আসতে পারছেন না তারা নিজেরাই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তা নয়, দেশেরও বড় ধরনের ক্ষতি করবেন। জাতীয়, আঞ্চলিক এবং গ্লোবাল রাজনীতির যারা পর্যবেক্ষক তারা মনে করছেন না যে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিএনপিকে বা এই ধরনের কোনও শক্তিকে ক্ষমতায় বসানোর কথা কোনও পর্যায় থেকে ভাবা হচ্ছে। বাংলাদেশের সরকারবিরোধীদের মনোভাব একরোখা এবং ক্ষতিকর চিন্তাদুষ্ট। তাদের প্রশ্রয় দেওয়ার মতো অবস্থা বাইরের কারও আছে বলে মনে হয় না।

দেশে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক– এটা অনেকেই চায়। সরকারও ২০১৪ সালের মতো একটি নির্বাচন চায় না। তাই যারা সরকারকে মোকাবিলা করতে চান তাদের উচিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া। এই সরকারের অধীনে বা দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না– এই মুখস্থ কথা না বলে নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয় সেই জন্য চেষ্টা করা দরকার। সাধারণ মানুষের মত ও ক্ষমতার প্রতি সবারই শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।

সরকারকেও মনোভাব বদলাতে হবে। বিরোধীদের শক্তিসামর্থ্য ছোট করে দেখলে চলবে না। সবার জন্য বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিরোধীদের হাতে ইস্যু তুলে দেওয়ার একটি প্রবণতা সরকারের কারো কারো মধ্যে আছে। বাম জোটের মতো একটি নিরীহ রাজনৈতিক শক্তির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশের ঝাঁপিয়ে পড়ার কোনও প্রয়োজন ছিল? বামপন্থী কয়েকশ কর্মী নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করলে কী হতো? সরকারের পতন হতো? বামপন্থীদের ওপর পুলিশের অ্যাকশন মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। সরকার বিরোধী মত প্রকাশ করতে দেয় না, তা তো নয়। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রচার ও প্রকাশ হচ্ছে। তাহলে রাস্তায় মিছিল দেখলেই পুলিশের মাথা গরম হয়ে ওঠে কেন? মিছিল-মিটিং তো দেশে নিষিদ্ধ বা বেআইনি নয়। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু একটি মিছিল বের হলেই আতঙ্কিত হওয়ার দরকার আছে কি?

সরকার ঢাকা শহরে মানুষের চলাচল নিশ্চিত করতে পারছে না। যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বেপরোয়া চালকদের বাগে আনতে পারছে না। মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে পারলে পুলিশ প্রশংসিত হবে। প্রশংসিত হওয়ার কাজটি না করে নিন্দিত হওয়ার কাজটি ঠিকই করছে। সরকার যদি সাধারণ মানুষের কাছে আরো বেশি অপ্রিয় হতে না চায় তাহলে অবিলম্বে পুলিশের অতি উৎসাহ এবং বাড়াবাড়ি বন্ধ করতে হবে। ন্যায়সঙ্গত দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে মিছিল করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কোনটা বর্জন করতে হবে, আর কোনটা গ্রহণ করতে হবে সেটা মানুষকেই নির্ধারিত করার সুযোগ দেওয়া ভালো ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে নতুন বিতর্ক তৈরি করা কি এখন খুব জরুরি এবং প্রয়োজনীয় ছিল। এই আইনের সমালোচনা তো সরকার সমর্থকরাও করছে। বলা হচ্ছে, এই আইন মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আইনটি পাস হলে কী এমন ক্ষতি হতো? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে যে সমালোচনা ও উদ্বেগ তা অকারণ ভাবার কারণ নেই। আমরা ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘে আমাদের ভয়। আইন এবং আইনের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে। আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। যেকোনও আইনের প্রয়োগের চেয়ে অপপ্রয়োগ হয় বেশি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও যেন নির্দোষদের গলার ফাঁস হয়ে না দাঁড়ায়।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দেওয়ার পর রাজনীতি আরও গতি পাবে। শুরু হয়ে যাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি উৎসব।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ