তবুও ক্রিকেট

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৬:৫৮, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৯, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

আহসান কবিরএশিয়া কাপের ফাইনাল বাংলাদেশের জন্য এক নিয়মিত দুর্ভাগ্যের নাম! ২০১২ আর ২০১৬ সালের পর ২০১৮। পরপর তিনবার ফাইনালে হেরেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালের এশিয়া কাপে  পাকিস্তানের কাছে দুই রানে হারার পর মুশফিক ও সাকিবের সেই কান্না কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়েছিল। ক্রিকেটকে ঘিরে যে আবেগ বা প্রেম, কখনও-সখনও তার শেষ পরিণতি বেদনা। বেদনার সবটুকু শুধু পরাজিতদের জন্য। কারণ ‘পৃথিবীর সব সুখ হাসি, বিজয়ীর হাত ধরে হাঁটে’! ইংরেজি গানের কথা এমন–উইনার টেকস ইট অল।
বিজ্ঞান নাকি মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। কিন্তু এখনও সর্বোচ্চ আবেগ জড়ানো থাকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে। ক্রিকেটকে গতিশীল করার জন্য ক্রমশ টেস্ট ক্রিকেটকে ভেঙে একদিনের ক্রিকেট (৫০ ওভার) এবং টি-টুয়েন্টি ম্যাচ চালু হলে মানুষের আবেগের গতিশীলতাও যেন বেড়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা—এই চার দেশের ক্রিকেট বাস্তবতা এক। এই চার দেশে ক্রিকেট স্বপ্ন দেখায়, ক্রিকেট এক করে রাখে মানুষকে। মানুষকে বুঁদ করে রাখে ক্রিকেট, মানুষকে উন্মাদনায় ভাসায়, কাঁদায়, হাসায়; কখনও-সখনও হয়তো উন্মত্তও করে তোলে। দেশের পরাজয় মেনে নিতে না পারায় কেউ হয়তো কেঁদে বুক ভাসায়, কেউ হয়তো শুরু করে ভাঙচুর। ক্রিকেট এখন ভাঙচুর এক প্রেমের নামও। আবার সেই ক্রিকেট বাণিজ্য কিংবা করপোরেটশিপের আওতায় বন্দি। বিশ্ব ক্রিকেটের তিন বড় মোড়ল ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের কাছে বাকি সব ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ খানিকটা অসহায়। ২০১৮-এর এশিয়া কাপে তাই ভারত যেভাবে খেলার সূচি সাজায়, যেভাবে খেলার ভেন্যু নির্ধারণ করে, এশিয়া কাপ আয়োজকরা সেটাই মেনে নিতে বাধ্য হয়। এশিয়া কাপের আয়োজকরা আসলে চেয়েছিলেন আবুধাবি আর দুবাইতে তিন তিনটি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। সেটি শেষমেষ সম্ভব হয়নি বাংলাদেশের কারণে। বাংলাদেশের কাছে হেরে পাকিস্তান বিদায় নেয় এশিয়া কাপ থেকে।

বোমা ও জঙ্গি-বান্ধব দেশ পাকিস্তানে যেদিন ক্রিকেট খেলা থাকে, সেদিন নাকি পাকিস্তানে বোমা গ্রেনেড কম ফাটে। সন্ত্রাসী হামলা হয় না বললেই চলে। শ্রীলঙ্কায় যখন তামিল বিদ্রোহীরা ছিল, তখনও নাকি শ্রীলঙ্কার খেলার দিন তারা হামলা চালাতো না।

বলা হয়ে থাকে, বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ আর জাতিসত্তার দেশ ভারতকে এক সূতোয় গেঁথে রাখে হিন্দি ছবি ও ক্রিকেট। ভারত আর পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশ এখন ভিন্নরকম একটা নাম। ভালোবাসার পাশাপাশি জন্মলগ্নের বিদ্বেষ আর প্রতিবেশিসুলভ কিছু হিংসাও তাই জড়িয়ে থাকে খেলায়। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে রমিজ রাজারা বাংলাদেশকে ছোট করার মন্ত্র জপে। ভারতের সঙ্গে খেলা হলে সিধুরা সেই একই কাজটা করার চেষ্টা করে। পাকিস্তান হেরে গেলে সেদেশের পত্রিকা শিরোনাম দেয় এভাবে–‘শেষমেষ বাংলাদেশের কাছে হারলো বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা’ (!)

একবার বিশ্বকাপ জয় করেই তাদের এই গর্ব। আর বাংলাদেশের কাছে ভারত হেরে গেলে গাধার গলায় মহেন্দ্র সিং ধ্বনির ছবি ঝুলিয়ে মিছিল বের করে ভারতীয় সমর্থকরা। কখনও তারা ক্রিকেটারদের বাসায় ঢিল মারে কিংবা তাদের বাসায় কালো রঙ মেখে দেয়। তবে, বাংলাদেশের ক্রিকেটার লিটন দাসের আউটটি ছিল বিতর্কিত। বেনেফিট অব ডাউট নাকি পান খেলোয়াড়। লিটন দাস সেই বেনিফিট পাননি, পেয়েছে ইন্ডিয়া।

ক্রিকেটের বাণিজ্যকরণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রোমা। খেলোয়াড়দের জীবনের খ্যাতির সঙ্গে এই রোমা এখন ক্রিকেট অঙ্গনের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। পাকিস্তান ক্রিকেটের বড় তারকা ইমরান খানের প্লেবয় ইমেজ নিয়েও বহু গাল গল্প ছিল। তার সাবেক স্ত্রী ও পুরনো বান্ধবীরা তার চরিত্র নিয়ে অনেক কিছুই বলেছেন, যা সবারই জানা। তবে ক্রিকেটারদের ভেতর হয়তো তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। পাকিস্তানে অবশ্য ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হতে পারায় ক্রিকেটের কিছু ‘দুষ্টুবালক’ খুশি। কারণ স্ক্যান্ডাল, বহু বিয়ের পরে যদি প্রধানমন্ত্রী  হওয়া যায়, তাহলে নাকি স্ক্যান্ডালই ভালো।

ভারতীয় ক্রিকেট টিমের সাবেক ক্যাপ্টেন (নবাব) মহসিন আলী খান পতৌদির সঙ্গে শর্মিলা ঠাকুরের সম্পর্ক নিয়ে অনেক গুঞ্জন ছিল, এই সম্পর্ক বিয়েতে গড়ানোর পরেও অনেকের ধারণা ছিল এই সম্পর্ক টিকবে না। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সেটা টিকে যায়। মহসিন আলী খান মারা গেছেন। ভারতীয় ক্রিকেট টিমের আরেক ক্যাপ্টেন মো. আজাহারউদ্দীনের প্রথম বিয়েটা টেকেনি। নায়িকা সঙ্গীতা বিজলানির সঙ্গে আজহার জড়িয়েছিলেন সম্পর্কের দুষ্টুমিতে। সঙ্গীতাকে বিয়ে করার পরও আজহারের আরেকটা সম্পর্ক হয়েছিল। ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় জাওয়ালি গুপ্তার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে সঙ্গীতার সঙ্গে সংসারটাও ভেঙে যেতে বসেছিল।  ক্রিকেটের ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মামলায় জড়ানোর কারণে জাওয়ালির কাছ থেকে ফিরে আসেন আজাহার। আজাহার সম্ভবত ‘প্রেমকপালি’ ছিলেন।  

রোমা, রাজনীতি, বাণিজ্য, করপোরেটশিপ যা কিছুই থাকুক ক্রিকেটকে ঘিরে, আবেগ সম্ভবত কখনোই কমবে না। আর এই আবেগকে পুঁজি করে যিনি ঘুরে দাঁড়াতে শেখান খেলোয়াড়দের তার নাম মাশরাফি বিন মর্তুজা। যিনি হৃদয় দিয়ে খেলেন। ঘুম থেকে জেগে এখনও পা ফেলতে পারেন না কিছুক্ষণ। হাঁটু বাঁকাতে হয়, কৌশল আর কসরত করতে হয় ঠিক মতো পা ফেলার জন্য। খেলা থেকে ফিরে প্রতিদিন পা থেকে ফেলে দিতে হয় বিষাক্ত রস। হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে সাতবার। মোট অস্ত্রোপচার দশবার। ব্যান্ডেজ বাঁধা থাকে পায়ে। স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারেন জেনেও আবেগ আর দেশের প্রতি ভালোবাসার এক অদম্য টানে জীবন বাজি রাখতে পারেন তিনি। সহ-খেলোয়াড়দের শেখাতে পারেন কীভাবে লড়াই করতে হয়। মাশরাফির মতো কেউ কখনও খেলায় ফিরতে পেরেছে কিনা, ক্রিকেট বিশ্ব জানে না। জানে একজনের নাম। মাশরাফি বিন মর্তুজা। অবিশ্বাস্য তার ফেরার গল্প। বুকে আগলে রাখতে পারেন নবীন খেলোয়াড়দের, জড়িয়ে ধরতে পারেন, চুলে বিলি কেটে দিতে পারেন। বন্ধু ক্রিকেটার রানা, যে কিনা মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়, তার পাশে দাঁড়াতে পারেন অবলীলায়। পরম মমতায় বাঁচাতে পারেন পাগল ভক্তদের। পরাজয়ে নিয়মিত এমন একটা দলকে ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে তুলে এনে জয়ের ধারায় ফিরিয়েছেন। শিখিয়েছেন জীবন কাউকে অপরিহার্য করে না, দলের জন্য কেউ চির নিয়মিত নয়। তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান দলে না থাকলেও দল জিততে পারে। মাশরাফি সেটা করে দেখিয়েছেন।

ক্রিকেট জয় পরাজয়ের আনন্দ ও বেদনার এক আবেগীয় ব্যারোমিটার। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিয়েছেন মাশরাফি। একদিনের ক্রিকেট থেকেও হয়তো অবসর নেবেন একদিন। শুধু ফিরে আসার কারিশমাটা, দলকে জয়ের ধারায় ফেরানোর মন্ত্রটা যেন দিয়ে যান নবীন ক্রিকেটারদের। পরাজিত হওয়ার বেদনা ভুলে ক্রিকেট বিজয়ের  প্রতিটি ক্ষণে নবীন মাশরাফিদের জন্য খুব বেশি প্রয়োজন এই প্রেরণা।

বিজয়ের বাঁশি, হৃদয়ের বাঁশি সবাই বাজাতে পারে না। মাশরাফির মতো কেউ কেউ পারেন।

লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ