আন্দোলন নয়, নির্বাচনই বিএনপির শেষ ভরসা

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৩:২৮, অক্টোবর ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, অক্টোবর ০২, ২০১৮

আনিস আলমগীরবিএনপি একটি জনসভা করেছে, ঢাকায়, ৩০ সেপ্টেম্বর। জনসভার লোকসমাগম নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করছেন সরকারি দলের নেতা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ওই জনসভার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মন্তব্য করেছেন, বিএনপির সমাবেশে উপস্থিতি প্রমাণ করে তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে। এটা তাকে ‘হতাশ’ করেছে। তার জবাব দিতে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে তিনি হতাশ হয়েছেন। তারা চিন্তাও করতে পারেননি এত অল্প সময়ের মিটিংয়ে এত মানুষ হবে, হতাশ হওয়ারই কথা।’
যারা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন তাদের অনেকেও বলেছেন, লোকসমাগম কম ছিল। অবশ্য বেশিরভাগ মিডিয়ায় বিএনপির এই দুর্বলতাকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা ছিল না। বরং অনেক পত্রিকা নিজ দুর্বলতার কারণে জনসভার ছবিটাকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। যাহোক, অনুমতি পাওয়া নিয়ে জটিলতায় বারবার তারিখ পিছিয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপি জনসভা করার অনুমতি পেয়েছে এটা ইতিবাচক। স্বল্প সময়ে লোকসমাগম কম হতেই পারে। আর লোকসমাগম কম হওয়ার পেছনে যে ভয়ভীতি কাজ করেনি তাও নয়। বিএনপির কর্মীরা তো দৌড়ের ওপর রয়েছে।

এমনকি খবরে দেখলাম, জনসভার পর প্রথম সারির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
মির্জা ফখরুলসহ ৫৫ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলায় ৭ জনকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ, রাজধানীর মগবাজার রেলগেট এলাকায় রবিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিশের কাজে বাধা দিয়েছেন, পুলিশকে আক্রমণ করেছেন, যানবাহন ভাঙচুর ও ক্ষতিসাধন করেছেন। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে বাঁশের লাঠি, পেট্রোলবোমা, বিস্ফোরিত ককটেলের অংশ, কাঁচের টুকরা ও ইটের টুকরা উদ্ধার করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

আর আরেকটা সত্য উপলব্ধি বিএনপি নেতাদের থাকা উচিত।  তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে আজ প্রায় ১২ বছর। তখন যে ছেলের বয়স আট বছর ছিল এখন তার বয়স হয়েছে ২০ বছর। তার হুঁশ জ্ঞান হওয়ার পর সে বিএনপিকে মাঠেও দেখেনি, ক্ষমতায়ও দেখেনি। সুতরাং বিএনপি ধীরে ধীরে জেনারেশন গ্যাপ ক্রাইসিসেও পড়তে শুরু করেছে। বিএনপি এখন গভীর সংকটে আর এই সংকটে বিএনপির জেনারেশন গ্যাপের ক্রাইসিস সংগঠনকে আরও দুর্বল করবে।

৩০ সেপ্টেম্বরের জনসভায় বিএনপি কোনও মারমুখী কর্মসূচি ছিল না। জনসভায় যাওয়া কর্মীদের কথাবার্তায়ও মনে হয়নি যে তারা কোনও বিপ্লবী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত। একটা আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে দীর্ঘ এক/দেড় বছর সময় লাগে। কিন্তু সে প্রস্তুতি নিতে বিএনপি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা কোনও বিপ্লবী কর্মসূচি প্রদান করলে তাও ২০১৩ সালের শেষ চার মাসের আন্দোলনের মতো যাত্রীবাসে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যার অনুরূপ কিছু ছাড়া আর কিছু হবে না। অনুরূপ আত্মঘাতী কাজ কিছু সন্ত্রাসী কর্মী নিয়োগ করে করা সম্ভব। বিএনপি জামায়াতের কাছে অনুরূপ লোক রয়েছে, টাকাও আছে। কিন্তু এটাও ভুললে চলবে না, এটি ২০১৩/১৪ নয়, তখন যুদ্ধাপরাধীরা সরকার পরিবর্তনের পর জেলমুক্ত হওয়ার স্বপ্নে ছিল। তখন আগুনে যারা ঘি ঢেলেছিল তারা এখন পরপারে। আর খালেদা জিয়াকে জেলমুক্ত করতে বিএনপির দৌড় কতটুকু তা তো দেখাই যাচ্ছে।

আগামী ১০ অক্টোবর গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হবে। এই রায় নিয়ে বিএনপি খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ, তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অনেক নেতা এ মামলার আসামি। এ হত্যাকাণ্ডে মহিলা লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে প্রাণ হারিয়েছেন, তিন শতাধিক পঙ্গু হয়েছেন। প্রসিকিউশন চূড়ান্ত শাস্তি দাবি করেছে। জজ মিঞাকে আসামি করে চার্জশিট প্রদানের কারণে তারেক জিয়া আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পৃক্ততার কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে। এখানে লঘু শাস্তির কোনও সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। তারেক জিয়া যদি কোনও চূড়ান্ত শাস্তির সম্মুখীন হন তবে বিরাট স্থবিরতা আসবে সংগঠনে।

বেগম খালেদা জিয়া জেলে। বিএনপি সেদিন তার মুক্তির দাবিতে আয়োজিত জনসভায় তাকে প্রধান অতিথি করে ব্যান্যার টানিয়ে হাস্যকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও সহসা তার মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সুতরাং অনুরূপ কোনও আঘাত আসলে দলের পক্ষে বিপর্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তবে গত ৭/৮ মাস এতো বিপর্যয়ের মধ্যেও বর্তমান নেতৃত্বে নিজেদের অস্তিত্ব এবং দলীয় ঐক্য অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে। তারা যদি সাহসে ভর করে এগিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ হন তবে ধীরে ধীরে হয়তো এ গভীর সংকট থেকে উত্তরণের একটা উপায় বের হয়ে আসবে।

বিএনপি নেতারা রবিবারের জনসভায় বেগম জিয়ার মুক্তি, তারেককে ২১ আগস্ট মামলা থেকে বাদ দেওয়াসহ ৭ দফা দাবি দিয়েছেন। নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত যে দাবিগুলো বিএনপি দিয়েছে, তাতে সংসদ ভেঙে দেওয়া, সরকারের পদত্যাগ এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং ইভিএম পদ্ধতি চালু না করার দাবিও রয়েছে। এই পাঁচটি দাবির সঙ্গে একমত বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্য দলগুলো। তারাও ইতিমধ্যে একই ধরনের দাবি তুলে ধরেছে। বাম দলগুলোর দাবি একই রকম। তবে বিএনপি বলেছে তারা দাবি পূরণ ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না এবং দলীয় অনুসারীদের আন্দোলন এবং নির্বাচন দুটোর জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

সরকারি দল যদি বিপ্লবী কোনও সিদ্ধান্তে না আসে তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এখন আর সম্ভব নয়। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর শাসনতন্ত্র থেকে অনুরূপ ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা রয়েছে শাসনতন্ত্রে। আওয়ামী লীগ তার থেকে কখনও সরবে- কেউ বিশ্বাস করবে না। দাবি পূরণের মতো জনমত সৃষ্টি করা বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট বা ঐক্য প্রক্রিয়া কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। আগামীতে যদি নির্বাচন করতে হয় তবে বিএনপিকে বা ঐক্য প্রক্রিয়া বা যুক্তফ্রন্টকে বর্তমান ব্যবস্থা মেনেই করতে হবে।

অবশ্য ঐক্য প্রক্রিয়া, যুক্তফ্রন্ট ও বিএনপির মাঝে যে সমঝোতা হওয়ার কথা ছিল তা শেষ পর্যন্ত হয় কিনা সন্দেহ চূড়ান্ত। ৩০ সেপ্টেম্বর ডা. বি চৌধুরী মহাখালীতে একটা সমাবেশ করেছেন। তাতে আ স ম রব আর মাহমুদুর রহমান মান্না যোগদান করেননি। জামায়াত নিয়ে বি. চৌধুরী এবং মাহি চৌধুরীর বাড়াবাড়িতে বিরক্ত বিএনপি। শুনেছি বিএনপি বৃহত্তম ঐক্যে বিকল্পধারা না থাকলেই খুশি। আ স ম রব ও মান্না অনুরূপ কোনও পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে যুক্তফ্রন্ট ছেড়ে যাবেন।

বিএনপি জনসভায় বলেছে তারা তাদের নেত্রীর নির্দেশে সব বিরোধী দলের সঙ্গে ঐক্য করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ঐক্য সম্ভব হলে তারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করবে আর ঐক্য না হলেও তারা রাজপথে থাকবে। আমি মনে করি, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিএনপির বর্তমান সময়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বেশি জরুরি। আওয়ামী লীগ সব হারানোর পরও যদি ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতো এবং ৩৯ সিটে জিতে সংসদে অংশগ্রহণ না করতো তবে আওয়ামী লীগ আজকের পর্যায়ে এসে উপস্থিত হতে পারতো কিনা সন্দেহ ছিল।

২১ বছর পরে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তো সব কাজই সমাধান করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, জেল হত্যার বিচার, আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার– কিছুই তো অবশিষ্ট রাখেনি। দীর্ঘদিন তারা জৌলুসের সঙ্গে ক্ষমতায়ও আছে।

রাজনীতি করতে গেলে বহু দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। ১৯৬৭ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আওয়ামী লীগ অফিসের ওপর দিয়ে কাক চিল উড়ে যায়নি। আমেনা বেগম সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে থাকতেন। সরকার বৈদ্যুতিক সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলো। আর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ইতিহাসের নানাবিধ আরম্ভ আছে, আবার সমাপ্তিও আছে। ইতিহাসের বহু মুহূর্ত আসে সেখানে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত আছে, আবার অতীতকে নিয়ে ঘোরও আছে। এই সবকিছু নিয়েই রাজনীতি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ