হিরো আলম-সেফাতউল্লাহ অপরাধী আমরা

Send
শেগুফতা শারমিন
প্রকাশিত : ১৩:৪৭, অক্টোবর ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৩, অক্টোবর ০২, ২০১৮

শেগুফতা শারমিনবাংলাদেশে কিছু দিন পরপর একেকটা ইস্যু নিয়ে হাইপ ওঠে। হয়তো আগেও ছিল, কিন্তু এখন অতিরিক্ত। আগে সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। শুধু মুখে মুখে তো আর হাইপ ছুটতো না। কারো পক্ষে প্রচারণা চালাতে হলে, খরচাপাতির ব্যাপার ছিল। এই জায়গায় এসে মানুষ খরচ করতো এমন জিনিসের জন্য, যেটা আসলই সলিড। যে কারণে শুধু কথায় চিড়ে ভিজিয়ে কেউ আলোচিত হতে পারতো না। আর এখন ফ্রি সোশ্যাল মিডিয়ায় হাইপ ছড়াতে লাগে একটা ক্লিক। মাইক্রো সেকেন্ড। তাই হাইপ ছড়ায় বাতাসের আগে।
ইথারে ইথারে ভেসে বেড়ায় হিরো আলমের বেসুরো গান, সেফাতুল্লাহর অসংলগ্ন বাক্যবাণ অথবা এরকম আরও নানা নামের নানা চেহারার তথাকথিত সেলিব্রেটিদের প্রতিভার বিচ্ছুরণ। এখানেই এসব লোককে লাখো লাখো মানুষ ফলো করে। ভাইরাল করে। কথায় কথায় আলোচনায় আনে। আবার এখানেই মানুষ প্রশ্ন করে এরা কেন এত জনপ্রিয়?  হিরো আলম, সেফাতুল্লাহ বা অপরাধী গানের মাত্রাতিরিক্ত ভিউ দেখে এখানেই মানুষ হতবাক হয়ে প্রশ্ন করে, এত ভিউ কেন? এরা এত জনপ্রিয় কেন?

দেখা আর জনপ্রিয় হওয়া কি এক? হিরো আলম বা সেফাতুল্লাহর ভাড়ামো দেখে আমার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়, অনলাইনে হিট হওয়া আর সত্যি সত্যি জনপ্রিয় হওয়া এক কথা না। হিরো আলম বা সেফাতুল্লাহ যদি সত্যিকারের জনপ্রিয় চরিত্র হয়, তাইলে বিশ্বাস করতে হবে, ইতোমধ্যেই আমরা অধঃপতিত হয়ে গেছি। আমাদের উঠে আসার পথ নেই।

এমনিতেই আমাদের সামনে কোনও আইকন নেই, কোনও রোল মডেল নেই। এত এত টিভি চ্যানেল, কোথাও কোনও সুস্থ বিনোদন নেই। কোনও শহরে অবসরযাপনের একটা সুন্দর জায়গা নেই। আমাদের রুচি নির্মাণের কোনও জায়গা নেই। আমাদের রুচি তৈরি হয় নাই অথবা রুচি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বলে আমরা মানুষের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে নাক গলাই, পাবলিকলি। অন্যায় মনে করি না। তাসকিন সামর্থ্যবান একজন পুরুষ, তার বউ বাচ্চার দায়িত্ব নিতে সক্ষম। তার বাচ্চা কবে হবে, কীভাবে হবে একান্ত তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেই জায়গাতেও আমরা বুড়ো আঙুল দেই। আমরা কি খবর রাখি আমাদের এই নোংরা মানসিকতার জন্য, সপ্তাহ মাসের হিসাব জানার পারদর্শিতার (!) জন্য কত শিশু পৃথিবীর আলো দেখার আগেই ঝরে পড়ে? আমরা সুন্দরকে সুন্দর বলে নিতে শিখিনি। আমরা সুন্দরের ভেতরেও কুৎসিতের অনুসন্ধান করি। আদতে আমাদের কুৎসিত চেহারাটাই প্রকাশ করে ফেলি।

জগতজুড়ে ছড়িয়ে আছে এত সুন্দর। এত ভালো গান, ভালো সিনেমা, ভালো বই। তারপরও আমরা ঘুরেফিরে হিরো আলম আর সেফাতউল্লাহর কাছে আসি। হয়তো হাসাহাসি করতে আসি। হয়তো হালকা হতে আসি। কিন্তু আসি তো! তারপর আসতে আসতে আমরাই তার ফ্যান হয়ে যাই, ফলোয়ার হয়ে যাই। আমরাই তার প্রচারক হয়ে যাই। অধঃপতনে যাওয়ার সিঁড়িতে আমরাই এক ধাপ যোগ করে দেই। হিরো আলম বা সেফাতউল্লাহকে বানিয়ে ফেলি আমাদের রোল মডেল, আইকন!

আইকন দেখে বোঝা যায় পেছনের মানুষরা কেমন! সুতরাং ধারণা করা যায় এ সমাজের কী অবস্থা! হাসির ছলে হোক বা ভেংচির ছলে, শেষ পর্যন্ত আমাদের রুচি বেছে নেয় এদেরকেই। রুচির অবস্থা যদি এমন হয়, শিক্ষার অবস্থা তাইলে কেমন হতে পারে? কাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে এক সুন্দরী প্রতিযোগিতার ক্লিপিং। প্রতিযোগীকে বিচারক প্রশ্ন করলেন, তিনটি উইশ পেলে বাংলাদেশের জন্য কি উইশ করতে চাও। প্রতিযোগী বললেন, কক্সবাজার, সুন্দরবন আর পাহাড় পর্বতকে উইশ করবো। বিচারক চেষ্টা করলেন উইশের মানে বোঝাতে, কিন্তু এর একটা যথার্থ প্রতিশব্দ বলতে পারলেন না । না বাংলায় না ইংরেজি। হয়তো বিচারক ইংরেজি ভালো পারেন, তাই বাংলা শব্দ খোঁজার ধার ধারলেন না।  কিন্তু আদতে উনি কোনটা ভালো পারেন  বোঝা গেলো না। কারণ, উনি গ্রিট বা সম্ভাষণ করলেন গুডনাইট বলে! তবে ওনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলে দিলো প্রতিযোগী মেয়েটা বোকা। সুতরাং আমরা পেয়ে গেলাম গণহাসির উপলক্ষ। হাইপ তোলার ইস্যু। ছি! কী জ্ঞানহীন প্রতিযোগী! মাঝখান থেকে চোখে পড়লো না গুডনাইট বলে সম্ভাষণ করা বিচারকের জ্ঞানের বহর। কারণ, হয়তো কেউ এটা বলে দেয়নি, ধরিয়ে দেয়নি আমাদের।

তো, আসলে কী দাঁড়ালো? যিনি প্ল্যাটফর্মে নতুন, তিনি কিছু জানেন না। যিনি দীর্ঘদিন প্ল্যাটফর্মে আছেন, তিনিও আসলে কম জানেন এবং কম জ্ঞান নিয়েই এতদিন টিকে আছেন। আর যারা দর্শক, তারাও ভুলটা ধরিয়ে দিলেই কেবল সেটা  চোখে দেখে। ধরিয়ে না দিলে ধরার ক্ষমতা রাখে না। এত কম সামর্থ্য নিয়েই বাহাদুরি করে, যার যার জায়গায়, সবাই।  আমাদের এই সামর্থ্যের দৈন্যতা, জ্ঞানের দৈন্যতা, রুচির দৈন্যতাই আমাদের সুযোগ দেয় হিরো আলম আর সেফাতউল্লাহদের দেখতে শুনতে। জাতির আইকন বানিয়ে দিতে।

ওরা যত ছড়াবে, আমি, আপনি, আমরা তত অপরাধী হবো।

লেখক: উন্নয়নকর্মী

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ