‘আনপ্রেডিকটেবল’ এরশাদ!

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:৪৩, অক্টোবর ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৭, অক্টোবর ০৩, ২০১৮

চিররঞ্জন সরকারবাংলাদেশের রাজনীতিকে যারা কলুষিত করেছেন, তাদের মধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিঃসন্দেহে অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। শিল্পী কামরুল হাসান তাঁর মৃত্যুর খানিক আগে যাকে ‘বিশ্ববেহায়া’ হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন।
এরশাদের অসংখ্য দুষ্কর্মের একটি ছিল সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ যোগ করা। ১৯৮৮ সালের ৫ জুন চতুর্থ জাতীয় সংসদে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী পাস হয়। সেই সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। এর মাধ্যমে কার্যত দেশের ভিন্ন ধর্মের নাগরিকদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ বানিয়ে দেওয়া হয়। উচ্চ আদালত যখন সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছিল, সেদিন আর কেউ কিছু বলার আগেই এরশাদ উচ্চকণ্ঠে স্বাগত জানালেন সেই রায়কে। অত বড় একটি অপকর্ম করে সেই অপকর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ না করে বললেন, হাইকোর্টের এই রায়ে তিনি খুশি। রায় তিনি মাথা পেতে নিচ্ছেন, কেননা তিনি আইন ও সংবিধানের শাসনে বিশ্বাসী!
সেদিনই তার দলের এক ইফতার অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, ক্ষমতা গ্রহণের কোনও ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু জাতির এক ‘ক্রান্তিকালে’ তিনি বাধ্য হয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। কথাগুলো বলে তিনি প্রমাণ করলেন, এরশাদ শুধু একজন বিশ্ববেহায়াই নন, তার চেয়েও বড় কিছু। ১৯৮২ সালের যে সময় তিনি ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তখন দেশের কোনও ক্রান্তিকাল ছিল না। বরং সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। রাষ্ট্রপতি সাত্তার মোটামুটি ভালোভাবেই দেশ পরিচালনা করছিলেন। ‘গালকাটা কামাল’, ‘ইমদু’ নামের অপরাধীকে পাকড়াও করে তিনি দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। দ্রব্যমূল্যও নিয়ন্ত্রণে ছিল। এমন সময় এরশাদ রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে বন্দুকের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য করলেন। যদিও তিনি এর আগে মাস দশেক থেকেই ষড়যন্ত্র করছিলেন, তবু এরশাদ বললেন, দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করার জন্য তিনি বাধ্য হয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। তার কোনোরকম রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই! কিছুদিন পরই একটি নির্বাচন দিয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা ত্যাগ করবেন।

এহেন ডাহা মিথ্যা কথা বলে তিনি পরবর্তী প্রায় নয় বছর ক্ষমতায় রইলেন। দুর্নীতি দমন করবেন বলে ক্ষমতা গ্রহণ করে তিনি দেশটিকে একটি তস্করতন্ত্র বা ক্লেপ্টোক্র্যাসিতে পরিণত করলেন। এ দেশের আর একজন বহুরূপী রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমদের মতো তিনিও মুখটি শুকনো শুকনো রেখে হাসি হাসি ভাব করে নানা রকম সিরিয়াস মিথ্যা কথা বলতে লাগলেন। রতনে রতন চেনে।

সেই মওদুদ আহমদকে উপ-রাষ্ট্রপতি বানালেন এরশাদ। এমনিতেই তার কুবুদ্ধির অভাব ছিল না, কিন্তু মওদুদ আহমদ এসে তাকে আরও কুপরামর্শ দিতে শুরু করলেন। অন্যায়ের ষোলকলা পূর্ণ হলো।

কী পারেন না এরশাদ? তার পক্ষে সবই সম্ভব। ১৯৯৬ সালে সদ্য জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এরশাদ তার জাতীয় পার্টি নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধলেন এবং সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলো। কিন্তু এরশাদের দল সেখানে এমনভাবে রইলো যে শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে কোনও রকম অগ্রগতি করতে পারলো না। এ ব্যাপারে এরশাদ কোনও সহযোগিতা করলেন না। এর আগে তার প্রায় নয় বছরের শাসনামলে তিনি ওই সব খুনিকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে থাকতে দিলেন। কারও বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিলেন না।

তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত তারেক রহমান ও লুৎফুজ্জামান বাবরকে বাড়িতে ছোট মাছ দিয়ে ডিনার খাইয়ে আপ্যায়ন করেছেন। অর্থাৎ তিনি বরাবরই দুই নৌকায় পা রেখে চলেছেন। চরম সুবিধাবাদের এরকম উদাহরণ আমাদের দেশের রাজনীতিতে আর মাত্র একজনই আছেন।

সারা জীবন নানাজনের সঙ্গে তিনি বিরোধে জড়িয়েছেন। নিজের স্বার্থের জন্য যখন যাকে খুশি কাছে টেনেছেন, যখন যাকে খুশি ছুড়েও ফেলেছেন। তাইতো গাঁও-গেরামের লোকেরা বলেন, এরশাদ চাচা, নিজের প্রাণ বাঁচা। তিনি যেমন নানা অপকর্মে জড়িয়েছেন, আবার তার নিন্দিত ভাবমূর্তি মুছে জাতীয় রাজনীতিতে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও নন্দিত হওয়ার জন্যই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। ক্ষমতার জীবনেই শুধু নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তার কেলেঙ্কারির শেষ নেই। বহুজনের সঙ্গে তিনি অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন। কার সঙ্গে তার কত বছরের সম্পর্ক তা প্রকাশ করতে কোনও লজ্জা-শরমের ধারেননি। ধূর্ত এরশাদ নানা ‘রঙ্গ-তামাশার’ মাধ্যমে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই নেত্রীকে- কখনও শেখ হাসিনাকে, কখনও বেগম খালেদা জিয়াকে প্রলুব্ধ করেছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ‘খেলা’ তিনি খেলেছেন। মহাজোট নামে কার্যত আওয়ামী লীগ সরকারের অংশীদার হয়েও ব্যক্তিগত স্বার্থে, আশানুরূপ প্রাপ্তিযোগ না হওয়ায় ‘বিদ্রোহী-বিদ্রোহী’ ভাব দেখিয়েছেন। বারবার এদিক-সেদিক মোচড়ও দিয়েছেন। একবার তো এমন ভাব দেখালেন, থাকবেন-ই না মহাজোটে। এই বুঝি ঢুকে যাচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়ার জোটে। কিন্তু শেষটায় আবার ডিগবাজি খান। তার ডিগবাজি খাওয়ার উপাখ্যানটি বেশ উপভোগ্য।

নির্বাচনের আগে এরশাদ-নাটকটা ছিল আরও কৌতুকপ্রদ। কথিত সর্বদলীয় সরকারে যোগদান, মনোনয়নপত্র জমাদান সবকিছু এরশাদের সম্মতিতেই হয়েছে। অথচ তিনি নাটক করলেন তাতে তার সম্মতি নেই। তিনি মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বললেন এবং দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে বললেন। কিন্তু কেউ তার কথা শুনলো না। জাপা মন্ত্রীরা নাকি তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু তা যথাস্থানে পাঠাননি। রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীক না দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিলেন, কিন্তু কমিশন পাত্তা দেয়নি। কারও বিরুদ্ধেই কোনও ব্যবস্থা নেননি এরশাদ। হাসির নাটকটি ক্লাইমেক্সে নিয়ে গিয়েছেন অসুস্থতার নামে স্বেচ্ছাবন্দিত্ব বরণ করে। গভীর রাতে তাকে নাকি তুলে নিয়ে গেলো। বলা হলো বৃদ্ধ এরশাদ ‘বেজায়’ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তার জরুরি চিকিৎসা দরকার। তাই তাকে সিএমএইচে নেওয়া হয়েছে। পরে দেখা গেলো হাফপ্যান্ট পরে তিনি গলফ খেলছেন।

২০১৪ সালের নভেম্বরে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, অনেক শিক্ষা হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে বেহেশতে যেতেও রাজি নই। এরশাদ বলেন, বিএনপি ছাড়া নির্বাচনে গেলে মানুষ আমাকে থুতু দেবে। পরে সকালে মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ঘোষণা দেন নির্বাচনে যাওয়ার। এ সময় তিনি বিএনপিকেও নির্বাচনে আসার ব্যাপারে বারবার আহ্বান জানান। বিকালে যোগ দেন ‘সর্বদলীয় সরকারে’। দলের ৭ নেতার জন্য বাগিয়ে নেন মন্ত্রিত্ব। অনেক নাটকীয়তার পর তিনি এখনও মন্ত্রীর পদমর্যাদা নিয়ে ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত’ হিসেবে বহাল রয়েছেন। তার দল একই সঙ্গে সরকারে এবং বিরোধী দলে আছেন।

নির্বাচন এলেই ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ হয়ে যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। হয়ে ওঠেন ঝানু খেলোয়াড়। এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবর মতে, জাতীয় নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই রহস্যজনক হয়ে উঠছে তার চরিত্র। এবারও তিনি দুদিকেই খেলছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটেও থাকতে চান, আবার সরকারবিরোধী জোটেও ঢোকার পথ পরিষ্কার করে রাখতে চাইছেন। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে ব্যক্তিগত দূত পাঠিয়ে খবরাখবর নিয়েছেন চলমান আন্দোলন-সংগ্রামের। আশ্বাসও দিয়েছেন অবস্থা ‘অনুকূলে’ থাকলে তিনি যুক্ত হবেন তাদের সঙ্গে।

এরশাদ মূলত অধিকতর সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকাটা যেমন তার জন্য একটা সুযোগ, তেমনি আওয়ামী লীগের বিপরীতে কোনও বড় শক্তি যদি রাজনীতিতে দাঁড়িয়ে যায় এবং তাদের কাছে আওয়ামী লীগ ধরাশায়ী হয়, সেটাকেও বড় ধরনের সুযোগ হিসেবে নেবেন এরশাদ। সুযোগের পাল্লা যেদিকে ভারী হবে এরশাদ সেদিকেই যাবেন। এ জন্য সব ধরনের ক্ষেত্রই তার অনুকূলে প্রস্তুত রাখতে চান তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরশাদ সম্পর্কিত প্রচলিত কথন: ক. মানুষ পরিবর্তনশীল; ম্যান ইজ এরশাদ, খ. মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে এরশাদ হয়ে যায়, গ. দুটি প্রাণী ইচ্ছামতো রং বদলাতে পারে-গিরগিটি ও এরশাদ, ঘ. সাপকে বিশ্বাস করো কিন্তু এরশাদকে বিশ্বাস করো না, ঙ. এরশাদ মানেই আসল  পুরুষ, চ. আকাশের রং আর এরশাদের মন ক্ষণে ক্ষণে বদলায়, ছ. একজন এরশাদ; সারা জীবনের কান্না, জ. এরশাদ বারবার বেলতলায় যায়, ঝ. অসম্ভবকে সম্ভব করাই এরশাদের কাজ, ঞ. এরশাদকে অর্জনের চেয়ে এরশাদকে রক্ষা করা কঠিন!

আমাদের রাজনীতিতে তবু এরশাদ নাহি মানে পরাভব!

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ