বিএনপির নতুন স্বজন ‘ঐক্যফ্রন্ট’

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৯:৪২, অক্টোবর ১৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৪, অক্টোবর ১৬, ২০১৮

আহসান কবিরঅনেক মিটিং, সিটিং আর ইটিং (একসঙ্গে বসা, আলোচনা ও শেষমেষ খাওয়া-দাওয়া) এরপর শেষমেষ রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। আমরা আশাবাদী হতে হতে শেষপর্যন্ত একশ’ ভাগ আশাবাদী হতে পারিনি। কারণ এই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় শুরু থেকে যুক্ত ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা। শেষমেষ বিকল্পধারাকে বাদ দিয়েই মাঠে নেমেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই ঐক্যফ্রন্ট হয়েছে মূলত আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ভবিষ্যৎই বলে দেবে ভোটকেন্দ্রিক ভালোবাসা শেষমেষ কতদূর গড়ায়।
প্রথমেই আসা যাক মাহী বি. চৌধুরী ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার ফাঁস হয়ে যাওয়া কথোপকথন প্রসঙ্গে। মাহী বি.চৌধুরীর মতে, বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্যকে আত্মপ্রকাশ করানোটা একটা ষড়যন্ত্র। মাহী বলেছেন–‘মান্না ভাই একটা রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র হইতেছে। আপনাকে দিয়া ঘোষণাপত্র পাঠ করানো হইছে! আল্লাহর রহমত আমি বাঁইচা গেছি!’ তবে এই কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পর একটা অনলাইন পোর্টাল নিউজটা কাভার করার সময়  প্রয়াত নায়ক মান্না এবং হাল আমলের নায়িকা মাহীর ছবি প্রকাশ করেছিল! তবে ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ কেন ষড়যন্ত্র হবে আর আল্লাহ কীভাবে মাহী বি চৌধুরীকে রক্ষা করলেন, তার কোনও ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ আত্মপ্রকাশের পর  বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, বিএনপিকে এককভাবে ক্ষমতায় বসানোর জন্য বিকল্পধারা ঐক্য করবে না। জাতীয় ঐক্য করতে হলে প্রথম শর্ত হলো স্বাধীনতাবিরোধীদের (মূলত, জামায়াতে ইসলামীকে) ত্যাগ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনীতিতে ভারসাম্য আনার সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে।
প্রেম ভালোবাসা নাকি শর্ত দিয়ে হয় না কিন্তু রাজনৈতিক ভালোবাসায় শর্ত ছাড়া অন্য কিছু চলে না। বি চৌধুরী এখন যে শর্ত দিচ্ছেন, রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে তিনি সেটা একেবারেই করেননি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান যখন দল গঠন করেন, তখন থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগবিরোধী প্রায় সব মত ও দলের নেতা-কর্মীদের ঠাঁই হয়েছিল বিএনপিতে। একারণে রাজনীতিতে একথা প্রচলিত আছে যে, এদেশে দল দু’টি। একটি আওয়ামী লীগ আর অন্যটি এন্টি আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতাবিরোধীদের দলে নেওয়া নিয়ে তিনি কোনও প্রতিবাদ করেছেন কিনা, তা ২০১৮ সালের আগে জানা যায়নি।
বি চৌধুরী আনন্দের সঙ্গে সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরী, আবদুল আলীম, জুলমত আলি খান কিংবা নিজামী-মুজাহিদদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন।  জিয়াউর রহমান যে রাতে নিহত হন, সেই রাতে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ছিলেন। তার এই অক্ষত ফেরা নিয়েও অনেক বিতর্ক ও গুঞ্জন ছিল, যা এখনও আছে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের অলিখিত চুক্তি হয়েছিল। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গোলাম আজম এই দেশের নাগরিকত্ব ফিরে পেয়েছিলেন। বি. চৌধুরী  তখনও কোনও প্রতিবাদ করেননি। রাজাকার আবদুর রহমান বিশ্বাস যখন রাষ্ট্রপতি, তখন তিনি ওই মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৯৯-২০০০ সালে চারদলীয় ঐক্যজোট গড়ার পেছনে বি. চৌধুরীর উদ্যোগ ছিল। তিনি ও তার ছেলে মাহী বি চৌধুরীর উদ্যোগে নির্মিত একটা অনুষ্ঠান একটি বেসরকারি চ্যানেলে ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত হতো। এরপর ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ও চারদলীয় ঐক্যজোট ক্ষমতায় এলে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই মন্ত্রিসভায় জামায়াতে ইসলামীর দু’জন সদস্য (মতিউর রহমান নিজমী ও আলী আহসান মু.মজাহিদ) পূর্ণমন্ত্রী হন, পরবর্তী সময়ে যাদের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ড কার্যকর হয়েছে। বি. চৌধুরীকে তখনও জামায়াতের বিরোধিতা করতে দেখা যায়নি।
এরপর তার রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পতন ও রেললাইন ধরে দৌড়ে পালানোর জীবন শুরু। কয়েক দশক ধরে করে আসা দলটার ব্যবহারে চৌধুরী সাহেবের দুঃখ পাওয়ার কথা, তার অভিমান হওয়ার কথা। ঐক্যফ্রন্ট গঠনে  তিনি যেমন বিএনপিকে ছাড় দিতে চাননি, শেষমেষ বিএনপির কারণেই তিনি ঐক্যফ্রন্টে থাকতে পারেননি। কামাল হোসেন কিংবা মান্নারা বিএনপিকে ছাড়তে চাননি। বিএনপি সঙ্গে না থাকলে ব্যক্তিগতভাবে কামাল হোসেন কিংবা মান্নারা নির্বাচনে জিতে আসার যোগ্যতা বা সামর্থ্য এখনও অর্জন করতে পারেননি। জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে না থাকার কারণে সরকার দলীয় নেতা কর্মীরা বি. চৌধুরীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েছেন। আগামী নির্বাচনে বিকল্পধারা থেকে একটা বা দুটো আসন পেতে হলেও বি. চৌধুরীকে এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গেই হাত মেলাতে হবে। যদিও আওয়ামী লীগের কেউ কেউ তাকে ‘বদু’ চাচা বলেই সম্বোধন করতেন। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে নির্বাচন করে জিতে এলে তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন কিনা, সন্দেহ আছে।
ঐক্যফ্রন্ট থেকে ছিটকে পড়ে আবারও হয়তো ‘রাজনৈতিক এতিম’ কিংবা নিঃসঙ্গ রাজনীতিবিদে পরিণত হবেন বি চৌধুরী। বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করে কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্না আসন্ন নির্বাচনে জিতে মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নটা আপাতত জিইয়ে রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এ পর্যন্ত কামাল হোসেন কখনও নির্বাচনে জিততে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ এবং অসাম্প্রদায়িক যে ভাবমূর্তি ছিল কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্নার, তার ঠিক বিপরীত মেরুকরণে শেষমেষ নিজেদের সমর্পণ করলেন তারা। নির্বাচনের রাজনীতিতে জিতে আসাটাই সব? তাহলে কি জামায়াতের উপস্থিতি এখন আর তাদের খারাপ লাগবে না? আওয়ামী লীগ যেমন বন্ধুত্ব করেছে হেফাজতে ইসলামীর সঙ্গে। তাই হেফাজতকে এখন আর খারাপ লাগে না আওয়ামী লীগের!
বি. চৌধুরীর মতো কাদের সিদ্দিকীও দোটানায়। সম্ভবত আওয়ামী লীগের ইশারার অপেক্ষায়। ২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত যেকোনও আন্দোলনে বিএনপির-জামায়াত নির্ভরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনকেন্দ্রিক বিএনপির  নতুন স্বজন এক্যফ্রন্টের প্রতি তাদের নির্ভরতা ও আসন ভাগাভাগিটা কেমন হয়, সেটাই দেখার ব্যাপার!
লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ