‘বেচারা’ কামাল হোসেন!

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৫:৪২, অক্টোবর ২৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৫, অক্টোবর ২৫, ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকারনব গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ড. কামাল হোসেন ২২ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা কোনও রাষ্ট্রীয় পদ পাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই। যারা ক্রমাগতভাবে আমার বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ ভিত্তিহীন ব্যক্তিগত আক্রমণ করে চলেছেন, তাদের প্রতি আমার এই পরিষ্কার বার্তা। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে’। তিনি আরও বলেছেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুমাত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমি কাজ করে যাবো। জামায়াতে ইসলামী বা তারেক রহমানসহ অন্য কোনও বিশেষ নেতার প্রতি সমর্থন হিসেবে এ উদ্যোগকে (ঐক্যফ্রন্ট) দেখার কোনও সুযোগ নেই’।
ড. কামাল হোসেনের কথার মর্মার্থ বোঝার জন্য বাক্যগুলো কয়েকবার পড়লাম। তার এই আত্মপক্ষ সমর্থন এবং নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার কোনও প্রয়োজন ছিল কিনা, সে প্রশ্ন যেমন মনে আসছে, তেমনি তার জন্য কিছুটা করুণাও হচ্ছে। তার বক্তব্যে এক ধরনের আত্মসমর্পণ ও পলায়নপর মনোভাবের প্রকাশ পেয়েছে বলেই অনেকের কাছে মনে হবে। তিনি রাজনীতিবিদ। রাজনীতির পথ কখনও ফুল বিছানো হয় না। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য। রাজনীতি যে আঁকাবাঁকা পথ ধরেই চলে, এটা তার অজানার কথা নয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে একটি গুরুদায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন ড. কামাল হোসেন । তাকে এখন নানা ধরনের কথা শুনতে হবে। তার প্রশংসা যেমন কেউ করবে, তেমনি নিন্দাও কেউ কেউ করতে পারে। রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন প্রশংসনীয় কাজ করেছেন, তেমনি নিন্দনীয় কাজও করেছেন। তার প্রশংসা না করলে কিংবা তার উদ্যোগের সঙ্গে সহমত পোষণ না করলে তিনি যদি রুষ্ট বা মনোক্ষুণ্ণ হন, তাহলে তিনি রাজনীতি করবেন কীভাবে?
তিনি মনে করছেন তার বিরুদ্ধে ‘বিদ্বেষপূর্ণ ভিত্তিহীন ব্যক্তিগত আক্রমণ’ করা হচ্ছে। কার কোন বক্তব্য তার কাছে এমন মনে হয়েছে, সেটা পরিষ্কার করা দরকার ছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কীভাবে গ্রেফতার হলেন, পাকিস্তানে গেলেন, সে বিষয়গুলো কি তিনি কখনও স্পষ্ট করেছেন?  বঙ্গবন্ধু-হত্যা পরবর্তী সময়ে যথাযথ ভূমিকা পালনে তিনি যে ব্যর্থ হয়েছিলেন, এটা কি তিনি অস্বীকার করতে পারবেন? তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি কি আওয়ামী লীগের কোনও উপকারে লেগেছিল? এসব প্রশ্ন যদি কেউ তোলে, তাকে তিনি ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ বা ‘ব্যক্তিগত আক্রমণ’ বলে মনে করবেন?
কামাল হোসেন জানিয়েছেন, তিনি সংসদ সদস্য হতে চান না। রাষ্ট্রীয় কোনও পদ পাওয়ার কোনও ইচ্ছেও তার নেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, তাহলে তিনি রাজনীতি করছেন কেন? কার জন্যই বা তার রাজনীতি? ‘একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুমাত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য’ কাজ করে যাচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেছেন। তার এই স্বপ্নপূরণের সঙ্গী কি কোনোভাবে বিএনপি হতে পারে? তার এই বক্তব্যের সঙ্গে কি বিএনপির রাজনীতির সামান্য কোনও মিল আছে? বিএনপি কি একটি গণতান্ত্রিক দল? বিএনপির সমর্থক আছে, ভোট আছে বলেই বিএনপিকে গণতান্ত্রিক দল বলতে হবে? যে দলের প্রধান নেত্রী অত্যন্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব থেকে বঙ্গবন্ধুর শোকাবহ মৃত্যুদিনকে নিজের ভুয়া জন্মদিন হিসেবে পালনে দ্বিধা করেন না, তিনি হলেন কামাল হোসেনের গণতান্ত্রিক স্বপ্নযাত্রার সঙ্গী? যারা একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারে, তাদের দিয়ে গণতন্ত্র কায়েম করবেন ড. কামাল হোসেন? ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুমাত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায়ই বা বিএনপি কীভাবে ড. কামালকে সহযোগিতা করবে?
জামায়াত বা তারেক রহমানসহ বিশেষ কারও প্রতি সমর্থন হিসেবে ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোগ নয় বলে ছেলে ভোলানো গল্প শুনিয়েছেন বিজ্ঞ আইন বিশারদ। বিএনপি হলো ঐক্যফ্রন্টের মূল নিয়ামক শক্তি। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হচ্ছেন তারেক রহমান। ঐক্যফ্রন্টের সভা-সমাবেশে বিএনপি নেতারা যখন তারেকবন্দনা করবেন, তখন সেটা কি কামাল সাহেব বন্ধ করতে পারবেন?
বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের বন্ধন পুরনো। বিএনপি নেতৃত্বাধীন  ২০-দলীয় জোটে জামায়াত আছে। ২০-দল ঐক্যফ্রন্টকে স্বাগত জানিয়েছে। আলাদাভাবে জামায়াতও ঐক্যফ্রন্টকে সমর্থন জানিয়েছে। বিএনপিও জানিয়েছে তারা জামায়াত ছাড়বে না। তাহলে কামাল সাহেব জামায়াতকে দূরে রাখবেন কীভাবে?
অনেক হাঁকডাক করে ঐক্যফ্রন্টের জন্মবার্তা ঘোষণা করা হয়েছিল। নেপথ্য কারিগরদের মনে কী ছিল, তা আমরা জানি না, তবে তাদের মূল টার্গেট যে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা; সেটা বোঝার জন্য বড় গবেষক হওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে পরিকল্পনাকারীরা যে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটাও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারকে বিপাকে ফেলার আশায় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তুলে উদ্যোক্তারাই এখন বিপাকে পড়েছেন। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ঐক্যফ্রন্টে যোগ না দিয়ে অথবা কৌশলে তাকে দূরে রাখায় বড় ধাক্কা খায় ফ্রন্ট। একটি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করতে পারলেই সরকার হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে অথবা দেশের মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বানের পানির মতো ধেয়ে আসবে বলে যে স্বপ্নজাল বোনা হয়েছিল তা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন ফ্রন্টের দুই সহ উদ্যোক্তা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এই দুই দলহীন বিএনপি-দরদি বিএনপিকে উদ্ধার করতে গিয়ে নতুন ঝামেলায় জড়িয়ে দিয়েছেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সেনাবাহিনী প্রধান সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন টকশোতে। আর মইনুল হোসেন অসম্মানজনক উক্তি করেছেন নারী সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির প্রতি, সেটাও এক টকশোতে। এখন দুজনকেই মামলামোকদ্দমা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মইনুল হোসেন গ্রেফতার হয়েছেন। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কী হবে কে জানে!
বেচারা ভদ্রলোক ড . কামাল হোসেন এখন কী করবেন?
সহকর্মীদের বিপদমুক্তির জন্য আইনি লড়াই লড়বেন, নাকি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আন্দোলন এবং জনমত গড়ে তুলবেন? সরকারকে ভয় দেখাবেন, শক্তি দেখাবেন আর সরকার ফুল হাতে আপনাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাবে, সেটা কি আমাদের মতো দুর্বল গণতন্ত্রের দেশে আশা করা যায়? গণতন্ত্রের জন্য যারা কান্নাকাটি বেশি করেন, তারা নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে গণতান্ত্রিক আচার-আচরণে কতটুকু অভ্যস্ত, সেটা নিশ্চয়ই দেশের মানুষ এক সময় জানতে চাইবে।
সরকারকে যা খুশি তা বলাই শুধু গণতন্ত্র নয়, গণতন্ত্র হলো জবাবদিহিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। কেউ তার নিজের সমালোচনা করলে কামাল হোসেন সেটা সহ্য করবেন না, তাহলে তিনি অন্যের সমালোচনা করবেন কোন মুখে?

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ