সুখের এক দেশে

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ১৫:৫৪, অক্টোবর ২৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৬, অক্টোবর ২৯, ২০১৮

ইকরাম কবীরভুটান যাওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। কিন্তু বুঝতে পারলাম এত কাছের সার্কভুক্ত একটি দেশ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না। শুধু তাদের রাজাকে চিনি। তিনি বেশ ক’বার বাংলাদেশে এসেছিলেন সম্মেলন করতে। শুনেছি সেই রাজাও এখন রাজত্ব করেন না। তার পুত্র এখন রাজা। শুনেছি সেখানকার মানুষগুলো আইন মেনে চলেন এবং তাদের রাজাকে ভালোবাসেন।
রাজাকে ভালোবাসেন? বিশ্বাস করা কঠিন। মজা পেয়েছিলাম এ চিন্তা করে যে এখনও জগতে এমন জনগোষ্ঠী আছে যারা তাদের রাজাকে ভালোবাসে। ইতিহাস বলে রাজারা স্বৈরাচারী, স্বেচ্ছাচারী। কয়েক বছর হলো ভুটান রাজ্যপাল পেছনে ঠেলে গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছে। রাজ্যপালকে পেছনে ঠেলে দেওয়া মানুষ পছন্দ করেনি। তারা রাজাই চেয়েছিলেন। রাজাকেই তারা ভালোবেসে ছিলেন।
ভুটানে যাওয়ার পথে ভয় ভয় লাগছিল। বিমানে চড়ে যাওয়ার কথা। বিমানে চড়তে এমনিতেই ভয় লাগে। যারা আমার আগে দেশটিতে গেছেন তারা বলেছেন। কিন্তু যখন দেখলাম আমাদের ড্রুক এয়ারলাইন্সের বিমানটি বাতাসে সাঁতার কাটতে কাটতে পর্বতগুলোর ঠিক মাঝ দিয়ে উড়ে ধীরে ধীরে পারো বিমানবন্দরে নামছে, তখন আর ভয় লাগলো না। বৈমানিকের পারদর্শিতা বুঝে গেলাম। এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। সংকল্প করলাম যে এমন অভিজ্ঞতা আবারও পেতে হবে। ছবি বা ভিডিও দেখে ভুটানের সৌন্দর্য অনুধাবন সম্ভব নয়। সেখানে গিয়ে বুঝতে হয়।

সেখানে নেমেই স্থানীয় মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম। আমি যত দেশে ভ্রমণ করেছি তার মধ্যে ভুটানিদের আমার কাছে সবচেয়ে ভদ্র মানুষ মনে হয়েছে। অচেনা মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সৎ। রেস্তোরাঁয় মোবাইল ফোন ফেলে এলেও পেছনে দৌড়ে এসে তা হাতে তুলে দেয়।

জানতে পারলাম যে জনসম্মুখে ধূমপান করা যাবে না। আইন করে মানা করে দেওয়া হয়েছে। তামাক ও তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ভুটানে নিষিদ্ধ। স্থানীয় মানুষ কেউ কেউ ধূমপান করেন, তবে তা অত্যন্ত সন্তর্পণে। লুকিয়ে। ভারত থেকে আমদানি করা কিছু সিগারেট পাওয়া যায়। স্থানীয় মানুষ এমনভাবে সিগারেট পান করেন যেন এক বড় দোষ করে ফেলেছেন। বিদেশিদের কাছে সিগারেট বিক্রি করা আইনত  মানা। বিদেশিরা শুল্কমুক্ত দোকান থেকে সিগারেট আনতে হলে, কড়া শুল্ক দিতে হয়। জনসম্মুখে ধূমপান না করা ভুটানের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। আমার ভালো লেগেছে। এমন পরিস্থিতি তৈরির কথা কেউ না কেউ ভেবেছিলেন এবং তা পরে বাস্তবায়নও করেছেন। কেউ না কেউ স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারপর জনজীবনে সংস্কৃতির রূপ নিয়েছে।

পাঁচদিন ছিলাম ভুটানের দুটি শহরে। থিম্পু ও পারোতে। একদিনে আমি একবারও গাড়ির ভেঁপু বাজাতে শুনিনি। বলে কী! কেউ ভেঁপু বাজাচ্ছে না! কী করে সম্ভব? হয় আমি পাগল, না হলে ঠিকমত চারদিকে কান দিচ্ছি না। পাঁচদিনে একবারও ভেঁপু শুনবো না তা হতে পারে না। বিশ্বাস করুন পূর্বদিকে সূর্য ওঠার মতো সত্যি; কেউ বাজাননি। আমি যে দেশ থেকে এসেছি সেখানে বিনা কারণে গাড়ির ভেঁপু বাজানো জাতীয় শখ।

প্রশ্ন হচ্ছে, কে ভুটানিদের শিখিয়েছেন যে ভেঁপু না বাজিয়েও রাস্তায় গাড়ি চালানো যায়? কেউ না কেউ তাদের বলেছেন যে সভ্য মানুষ ভেঁপু বাজায় না। তিনি নিশ্চয়ই এ নিয়ে ভেবেছেন এবং জনগণকে বোঝাতে পেরেছেন।

রাস্তায় চলাচল করতে করতে বুঝলাম ভুটানিরা সবাই পর্যটক নিয়ে চলাফেরা করছে এমন বাহনকে চিনতে পারে। দেখলেই থেমে গিয়ে আমাদের গাড়িসহ অন্যান্য পর্যটক গাড়িকে আগে রাস্তা দিয়ে যেতে দিচ্ছে। এমনটি আরও কয়েকটি দেশে দেখেছি। এ কাজ কেউ না কেউ তাদের শিখিয়েছেন। পর্যটকদের জীবন সহজ করতে ভুটানিরা সজাগ।

পথচারীরা সবাই জেব্রা-ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে আমার আক্কেল গুড়ুম। পথচারী জেব্রা-ক্রসিংয়ে পা দিলেই সব গাড়ি থেমে যাচ্ছে। পথচারীদের পার হতে দিচ্ছে। পথচারীদের কারও তাড়াহুড়ো নেই; গান শুনতে শুনতে, কথা বলতে বলতে পার হচ্ছেন। গাড়িগুলো থেমে আছে। কোনও গাড়ির চালক ভেঁপু বাজিয়ে পথচারীদের তাড়াতাড়ি পার হতে সংকেত দিচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতি আমার জন্য কষ্টদায়ক। আমি অভ্যস্ত নই।

প্রায় সবাই তাদের জাতীয় পোশাক পরে থাকেন। অফিসে, আদালতে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছেলেদের জন্যে ‘ঘো’ এবং মেয়েদের ‘কিরা’। আমার মতো বাঙালিরা সবাই দেখেছি। ভুটানের রাজা আমাদের দেশে অনেকবার এসেছেন।

আমাদের গাড়ি চালক ভুটানি। নাম গুড্ডু দর্জি। সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। দেশের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে জানালেন। বললেন, প্রায় তিন শতাব্দী আগে এই পোশাকের প্রচলন হয়েছিল। সে আরও জানালো, এখনকার ভুটানিরা তাদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে চান এবং সে কারণেই তারা বেশিরভাগ সময় জাতীয় পোশাক পরেন। আমার মনে প্রশ্ন জাগে আমাদের জাতীয় পোশাক কী? পাঞ্জাবি-পায়জামা? নাকি ফতুয়া-লুঙ্গি? শাড়ি? নাকি সালোয়ার-কামিজ? আমি জানি না।

ড্রুক হোটেলের বাইরে একটি শানবাঁধানো মঞ্চে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন স্কুলের শিশু একটি অনুষ্ঠানের পরিশীলন করছিল। তাদের শিক্ষকরাও ছিলেন সেখানে। সবাই জাতীয় পোশাক পরে আছেন। শিক্ষকদের কাছে জানতে চাইলাম সবাই কি স্কুলে জাতীয় পোশাক পরে। তারা জানালেন, হ্যাঁ, সবাই সারা দেশের স্কুলে জাতীয় পোশাক পরে। ব্যাপারটি আমার বেশ ভালো লাগলো।

আমাদের গাড়িচালক জানালেন, তারা তাদের খাদ্য জৈব পদ্ধতিতে উৎপন্ন করেন। কোনও রাসায়নিক সেখানে ব্যবহার হয় না। তাদের খাদ্যে কৃত্রিম কোনও রসায়ন নেই। খুব অবাক হলাম জেনে যে তারা একেবারেই পশুপাখি মারেন না। পশুপাখি তাদের ইচ্ছেমতো উন্মুক্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়ায়। রাস্তায় অনেক কুকুর চরে বেড়াতে দেখেছি। কুকুরগুলোকে দেখে অনাহারি মনে হয়নি। বরং অনেক আদর-যত্নে তাদের খাদ্য পরিবেশন করা হয়, যে যেমন পারেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর লেগেছে এটি জেনে যে ভুটানিরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘সুখী’ হতে চেয়েছেন। ধনী হতে চাননি। ভাবলেই মন ভালো হয়ে যায়। তাদের চতুর্থ রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুক জাতিকে সুখী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভুটানের কাছে ‘গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট’-এর চেয়ে ‘গ্রস ডোমেস্টিক হ্যাপিনেস’ আরও গুরুত্বপূর্ণ। তারপর থেকে সবাই মিলে সুখী হওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন, যার ছাপ সারা দেশেই চোখে পড়ে।

ভুটানিরা যখন তাদের সুখ খোঁজার গল্প বিশ্বকে জানাচ্ছিল, তখন কেউ তেমন আমলে নেয়নি। ভেবেছে, ছোট্ট একটি গরিব দেশ, কী বলে না বলে তার ঠিক আছে। কিন্তু বছরের পর বছর ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের পর বিশ্ব যখন দেখলো মানুষকে কেমন করে দেশের নেতারা ভালো রাখছেন, এখন অনেকেই ভুটানের বেঁচে থাকার হোলিস্টিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে চান। সুখের অনুসন্ধান করতে করতে দেশটি এক কার্বনহীন সমাজে পরিণত হয়েছে। কার্বন নিয়ে সারা বিশ্বজুড়ে অনেক কথা বলা হয়, কিন্তু তেমন কিছু করা হয় না। বিশ্বে কার্বনহীন দেশ ক’টি আছে?

দেশটিতে এত সুন্দর সুন্দর কাজ হয়, তা একবার সেখানে না গেলে বোঝা যায় না। এই কাজের পেছনে কেউ না কেউ চিন্তা দিয়েছেন, মেধা দিয়েছেন এবং পুরো জাতিতে হোলিস্টিক উপায়ে জীবনযাপন করতে শিখিয়েছেন। আহারে, সবাই যদি ভুটানিদের মতো নিজের জীবনকে সাজিয়ে নিতো, বিশ্বটি কতই না সুন্দর হতো!

লেখক: গল্পকার

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ