‘গিনিপিগ’ মানুষ!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:০৬, অক্টোবর ৩১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৭, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

রেজানুর রহমানআমার ভোট আমি দেবো যাকে খুশি তাকে দেবো। রাস্তায় গাড়ি চলাচলের ব্যাপারটাও তো একই রকম- আমার গাড়ি আমি চালাবো, যখন খুশি তখনই রাস্তায় নামাবো। কিন্তু বাধা আসছে কেন? ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘটের নামে গত ২৮ ও ২৯ অক্টোবর এসব কী ঘটলো সারাদেশে? হাসপাতালে নিতে না পারায় দুই শিশুর মৃত্যু হলো। ব্যক্তিগত গাড়ির চালকের মুখে, শরীরে পোড়া মোবিল লাগিয়ে দেওয়া হলো দেশের নানা জায়গায়। অসহায় গাড়িচালক অশিক্ষিত বর্বর কিছু শ্রমিকের হাতে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত হলো। এত কিছুর পরও প্রিয় শ্রমিক ভাইয়েরা দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের দাবি মানা না হলে আবারও ধর্মঘটে যাবেন তারা। এই নিয়ে সারাদেশে সাধারণ মানুষের মনে অজানা ভীতি ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ধর্মঘটের নামে দেশে ব্যাপক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পরও সরকারিভাবে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় জনমনে ভয় আর আতঙ্কের ছায়া বাড়তে শুরু করেছে।
দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রচার মাধ্যম পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘট ও ধর্মঘটের নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির বিভিন্ন নারকীয় ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা সত্ত্বেও পরিবহন শ্রমিকরা নির্বিকার ভূমিকা পালন করছেন। গত দুই দিনে কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের অনেকে এমন ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে যে, কারও কথাই শুনতে নারাজ তারা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রমিকদের যে সংগঠনটি ধর্মঘট ডেকেছিল তার সভাপতি সরকারেরই একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটের ব্যাপারে তিনি নাকি কিছুই জানেন না। তার এই ভূমিকাও জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। যদি ঘটনা সত্যি হয়, যদি সংগঠনের সভাপতি ধর্মঘটের ব্যাপারে কিছুই না জেনে থাকেন তাহলে তো সেটা আরও শঙ্কা ও উদ্বেগের ব্যাপার।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যেটা তা হলো এবার দুইদিনের পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘট চলাকালে ঢাকাসহ দেশের অনেক জায়গায় এমন কিছু উচ্ছৃঙ্খল তরুণকে দেখা গেছে, যারা সাধারণ মানুষকে কোনও গুরুত্বই দেয়নি। বরং চরম ভয়ভীতি দেখিয়েছে। প্রকাশ্যে অযোগ্য অকথ্য ভাষায় অনেকে সাধারণ মানুষের প্রতি গালাগালও ছুড়েছে। ধর্মঘটের নামে শ্রমিকদের অনেকের আচরণগত এই প্রকাশভঙ্গিই জনমনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন ধর্মঘট আহ্বান করা সবারই গণতান্ত্রিক অধিকার। একইভাবে ধর্মঘট না মানাও সবার গণতান্ত্রিক অধিকার। এবার পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘটের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে যা ঘটেছে তা এক ধরনের সন্ত্রাসী সংস্কৃতি। ভয় দেখিয়ে অযৌক্তিক দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া। প্রশ্ন উঠেছে যারা দুইদিনের পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘটের নামে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখালো, জিম্মি করে রাখলো, তাদের শক্তির উৎস কী? সাধারণ জনগণ নয় নিশ্চয়ই?

পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘট নিয়ে গত দুইদিনে দেশের অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশন মাধ্যমে ভয়ঙ্কর সব তথ্য ও খবর প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে। অথচ এক্ষেত্রে ধর্মঘট আহ্বানকারী শ্রমিক সংগঠনটি নির্বিকার। গতকাল (৩০ অক্টোবর) দেশের একটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘ধর্মঘটে আরেক শিশুর মৃত্যু’ শিরোনামে প্রধান খবর ছাপা হয়েছে। খবরের সঙ্গে ‘নবজাতকের কি অপরাধ’ শীর্ষক পোস্টার হাতে কয়েকজন তরুণের ছবি ছাপা হয়েছে। তাদের কারও কারও মুখে পোড়া মোবিল। খবরটির পাশে ‘ধর্মঘটে পোড়া মোবিল ও আইনের শাসন’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে।

আরেকটি দৈনিক পত্রিকায় ‘আরেক শিশুর প্রাণ কাড়ল পরিবহন ধর্মঘট’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। রিপোর্টের সঙ্গে মায়ের কোলে মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা এক শিশুর ছবি ছাপা হয়েছে। এই খবরের পাশাপাশি প্রকাশিত একটি রিপোর্টের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘ধর্মঘট নিষিদ্ধে আইন চান বিশেষজ্ঞরা’।

আরও একটি দৈনিকে ‘অসভ্যতা মানবিকতা’ শিরোনামে একটি রিপোর্টের সঙ্গে একজন তরুণের দুই হাতে দুই কান ধরে রাখা একটি ছবি প্রকাশ হয়েছে। ধারণা করাই যায় এই তরুণ তার ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামিয়েছিল। ফলে তাকে পরিবহন শ্রমিকদের রোষানলে পড়তে হয়েছে।

এমনই ধারাবাহিকতায় আরেকটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের প্রথম পাতায় ‘আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য’ শিরোনামে একটি রিপোর্টের সাথে শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রাস্তা পার হওয়া এক অসহায় মায়ের ছবি ছাপা হয়েছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা ‘২৫ দিনের অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে শিশু হাসপাতাল থেকে হেঁটে গাবতলীতে গিয়েও কোনও যানবাহন পাননি এই মা। এ তো গেলো দৈনিক পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘট চলাকালে ভয়াবহ পরিস্থিতির বিবরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ভাইরাল হয়েছে। অথচ ধর্মঘট আহ্বানকারী শ্রমিক সংগঠনটি অনেকটাই বেপরোয়া। সংগঠনটি আবারও নতুন তারিখ ঘোষণা করেছে। তার মানে আবারও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ? আবারও কালো মোবিল, নাকি এর চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে?

প্রশ্ন উঠতে পারে পরিবহন শ্রমিকরা কেন ধর্মঘট ডেকেছিলেন? তাদের দাবি কী? মোটা দাগে তাদের দাবি হলো, সড়ক পরিবহন আইনের সব ধারা জামিনযোগ্য করা, সড়ক দুর্ঘটনায় সাজার পরিমাণ কমানো, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ৫ম শ্রেণি করা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধ করা। একটু বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় তাদের কয়েকটি দাবি কতটা ভয়ঙ্কর। ৫ম শ্রেণির সার্টিফিকেট নিয়ে চালকরা বাস, ট্রাক চালাতে পারবে। মানুষকে মারলেও চালকের অপরাধ হবে জামিনযোগ্য। তার মানে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে তারা এই দাবি আদায় করবে আবার সাধারণ মানুষকেই মেরে ফেলার জামিনযোগ্য অধিকার পাবে। কী হাস্যকর! দেশের সাধারণ মানুষ কি তাহলে গিনিপিগ? কেউ কি তাদের পাশে নেই? এই মুহূর্তে কবি সৈয়দ শামসুল হকের একটি কবিতার লাইন মনে পড়ছে- জাগো বাহে কোনঠে সবায়...।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ