মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের হারার সম্ভাবনা বেশি

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৩৪, নভেম্বর ০১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৯, নভেম্বর ০১, ২০১৮

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী৬ নভেম্বর আমেরিকার কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্পের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। বারাক ওবামা আমেরিকার দু’ দুবার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, সিনেটর ছিলেন, রাজ্যসভার সদস্যও ছিলেন। আবার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শাসনতান্ত্রিক আইনের শিক্ষকতাও করেছেন। সব মিলিয়ে আমেরিকার শাসনতন্ত্রের ওপর তার সমৃদ্ধ জ্ঞান রয়েছে। তার লেখা বইয়ে তিনি শাসনতন্ত্র সম্পর্কে সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন। শাসনতন্ত্রের তুলনামূলক আলোচনায় সময় তার নাকি মনে হতো যে রচয়িতারা দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন।
আমেরিকার আদালত, কংগ্রেস আর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এত সুনিপুণভাবেই বিন্যস্ত যে একজন আরেকজনকে ইগনোর করে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেন না। একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন চার বছরের জন্য। দু’ বছরের মাথায় মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়। দু’ বছরের মাথায় অনুরূপ মধ্যবর্তী নির্বাচন হয় বলে ভোটাররা ক্ষমতাসীন দলকে শাস্তি দেওয়ার একটা উপায় খুঁজে পায়। সুতরাং ক্ষমতায় বসে জগণের স্বার্থকে ইগনোর করার অবকাশ কোথায়?
মার্কিন পার্লামেন্টের যৌথ নাম কংগ্রেস। মার্কিন কংগ্রেস দু’কক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষের নাম সিনেট আর নিম্নকক্ষের নাম প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভ)। উচ্চকক্ষ সিনেটের সদস্য সংখ্যা প্রতি রাজ্য থেকে ২ জন করে মোট ১০০ জন। আর প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৪৩৫ জন। একজন সিনেট সদস্যের কাজের মেয়াদ ৬ বছর আর প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যের মেয়াদ দুই বছর। সিনেটে প্রতি দুই বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ পদে আর প্রতিনিধি পরিষদে সব আসনে ভোট হয়।

বর্তমান সিনেটে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের ৫১ জন সদস্য রয়েছেন আর ডেমোক্র্যাটদের সিনেটরের সংখ্যা ৪৭ জন। দুইজন স্বতন্ত্র সিনেটর তাদের সঙ্গে থাকায় ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৩৩টি পদে নির্বাচন হবে। তবে ২টি বিশেষ পদের নির্বাচনসহ মোট ৩৫টি সিনেট আসনে নির্বাচন হবে। এই ৩৫টি সিনেটর পদের শূন্য আসনের নির্বাচনে ২৬টি পদে সিনেটর হচ্ছেন ডেমোক্র্যাট দলের (দুইজন স্বতন্ত্র সিনেটরসহ)।

এবারের সিনেট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে হলে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের আসন পাওয়ার পরও আরও দুটি আসন বেশি পেতে হবে। অর্থাৎ অনুষ্ঠিতব্য ৩৫টি সিনেট সদস্য পদে ডেমোক্র্যাটরা ২৮টি আসনে জয়লাভ করলে তারা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের মালিক হবে। জনপ্রিয়তায় ধস নামার কারণে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা যেমন কঠিন আবার নিজেদের সিনেট আসন অধিক সংখ্যক শূন্য হওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করাও তত সহজ নয়।

অবশ্য সর্বশেষ জরিপে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানের চেয়ে ১২ শতাংশ এগিয়ে আছে বলে বিশ্লেষকেরা ডেমোক্র্যাট দলের ৫১ সিনেট আসনে বিজয় প্রত্যাশা করছেন। গৃহযুদ্ধের পর থেকে হিসাব কষে দেখা গেছে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার সময় যত সিনেটর তার অংশে ছিল তার থেকে দুইটা আসন হারায়। আবার প্রতিনিধি পরিষদে ৩২টি আসনে সাধারণত পরাজিত হয়।

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৫০ রাজ্যের গভর্নরের মাঝে ৩৩ রাজ্য গভর্নরের নির্বাচনও হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য ২৩টির বিজয় ছিনিয়ে আনা। গভর্নর নির্বাচনে ওহাইও, মিশিগান, ফ্লোরিডা এবং পেনসিলভানিয়া প্রতি উভয় দলের দুর্বলতা আছে। গভর্নররা রাজ্যে ক্ষমতাবান। বাজেট প্রণয়ন এবং রাজ্যের আইন প্রণয়নে তাদের যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত বয়স্ক, শ্বেতাঙ্গ এবং রক্ষণশীলেরাই বেশি নির্বাচিত হয়ে থাকে। যাক, জরিপ যদি সঠিক হয় তবে এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এবারের নির্বাচনে বিচারপতি পদে কাভানার নিয়োগ, অভিবাসন, অর্থনীতি এবং অভিশংসন ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে। বিচারপতি পদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে কাভানা নিয়োগ পেলেও ডেমোক্র্যাটরা তা মেনে নিতে পারছে না। অভিবাসীদের ছোট শিশুকে মা-বাবা থেকে পৃথক করার বিষয়টিও নিষ্ঠুরতা হিসেবে ভোটারদের কাছে উত্থাপন করেছে ডেমোক্র্যাটরা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর থেকে বলে আসছেন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাশিয়া বড় ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারে। কারণ, এর আগে কোনও প্রেসিডেন্ট তার মতো রাশিয়ার প্রতি এত কঠিন হননি। আবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছেন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চীন চায় না তার দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখুক। ট্রাম্প বলেছেন, চীন মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে পারে। কারণ, চীন তাকে আর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চায় না।

আমরা আগে শুনতাম তৃতীয় বিশ্বের কোনও দেশে সরকার পরিবর্তনে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করে। গত শতাব্দীর ছয় দশক থেকে শুরু হয় সামরিক অভ্যুত্থান। এতেও আমেরিকার সিআইএ’র  নাকি হাত থাকতো। আলেন্দে, বঙ্গবন্ধুর হত্যার ব্যাপারে আমেরিকার ষড়যন্ত্রের কথা সর্বজনবিধিত। আর এখন নাকি রাশিয়া-চীন হস্তক্ষেপ করছে আমেরিকার কংগ্রেস নির্বাচনে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পেছনেও নাকি রাশিয়ার হাত ছিল। কারণ, রাশিয়া বিশ্বাস করতো হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে রাশিয়ার জন্য গ্লোবাল পলিটিক্সে বিভিন্ন অন্তরায় সৃষ্টি করবে। গত দুই বছর ধরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার গোয়েন্দাদের তদন্তের মুখে অস্থির হয়ে আছেন তার নির্বাচনে রাশিয়ার সহায়তা প্রদানের বিষয়টা নিয়ে। এখন তিনিই বলে বেড়াচ্ছেন রাশিয়া ও চীন আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে। চীন ও রাশিয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি হস্তক্ষেপ করে সফল হয় তবে ট্রাম্পের অভিশংসন অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বহু নিয়ম-নীতিবহির্ভূত কাজ করেছেন। যেমন, তিনি ওবামা কেয়ার বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কীয় প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, ইউনিসেফ থেকে বের হয়ে গেছেন। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে যে জলবায়ুর পরিবর্তন আসছে তা তিনি বিশ্বাস করেন না। এসব কারণে অনেকে মনে করেন এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির ওপর গণভোট।

ট্রাম্প বলেছেন, সিনেটে তাদের সদস্য সংখ্যা বাড়বে মন্টানা, নেভাদা, নর্থ ডাকোটা এবং ইন্ডিয়ানায়। অথচ বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন জনমত তার দলের বিপক্ষে। রাজনীতি বিশ্লেষণের ওয়েবসাইট ‘ফাইভ থার্টি এইট’ বলেছে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তার নিশ্চয়তা ৮৫.৯ শতাংশ আর সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকার সম্ভাবনা ৭৮.১ শতাংশ। যদি প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ হাতে পায় তবে প্রেসিডেন্টকে ক্ষণে ক্ষণে চাপে ফেলতে পারবে তারা। রিপাবলিকানদের প্রত্যাশা তারা সিনেটে হেরে গেলেও যেন প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।

প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন ডেমোক্র্যাটরা পেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তারা অভিশংসন প্রস্তাব আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ট্রাম্প ৮৩ প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন প্রকাশ্যে। তারা যদি জিতে আসে ভালো কথা। বেশি লোক হেরে গেলে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রার্থী হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়বেন। যা হোক, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কখনও উভয় কক্ষে জেতার কোনও নজির নেই। সুতরাং ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে আসা অনেকটা নিশ্চিত। চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অবশ্য আমাদের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ