রাজনীতির সংলাপ শেষ, এরপর দায়-দায়িত্ব ইসির

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৯:১৯, নভেম্বর ০৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৭, নভেম্বর ০৮, ২০১৮

মাসুদা ভাট্টিদেশের রাজনীতিতে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংলাপ-পর্ব আপাতত শেষ হলো। আজকে সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জাতির উদ্দেশে ভাষণের মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবো এবং তা হবে সম্পূর্ণ নির্বাচনমুখী একটি যাত্রা। যদিও আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে, কারা এই যাত্রায় সামিল হচ্ছেন আর কারা হচ্ছেন না, তা নিয়ে। সে আশঙ্কা নিয়েই আমাদের একটু পেছনে তাকানো দরকার যে, এই সংলাপ প্রক্রিয়া থেকে আসলে কে কী পেলেন?

মোট ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরমধ্যে সবাই উল্লেখযোগ্য হলেও দেশবাসী ও রাজনীতি-সচেতনরা লক্ষ রাখছিলেন মূলত নবগঠিক ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপটির ওপর। এর সঙ্গে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সংলাপও আলোচনার দাবি রাখে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নতুন যে ঐক্যফ্রন্টটি গঠিত হয়েছে, তা মূলত বিএনপি’র একটি নতুন প্ল্যাটফরম। বহু কারণে গত দশ বছরে এই রাজনৈতিক দলটি কোনও সুবিধা করতে না পারায় এবং দলের দুই প্রধান নেতৃত্বের একজন কারাগারে ও অন্যজন পলাতক থাকায় দলটির পক্ষে কার্যকর নেতৃত্ব দিয়ে কোনও দাবি আদায় করা সম্ভবপর হয়ে উঠছিলো না। এই মহাদুর্যোগে ড. কামাল হোসেন বলতে গেলে দলটির জন্য ত্রাতার ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং একটি আলোচিত ঐকফ্রন্টের নেতৃত্বের অবস্থানে থেকে তিনি তাদের দাবি-দাওয়াকে সরকার-প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পর্যন্ত নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। অতি অল্প সময়ে ঐক্যফ্রন্টের এটাই যে সবচেয়ে বড় সফলতা, সেটা সবাই স্বীকার করবেন। ৭টি দাবি নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট দেশব্যাপী তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে এবং মানুষের সাড়াও পাচ্ছে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। ফলে তারা সেই ৭টি দাবি নিয়েই মূলত সংলাপে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে।

এই ৭ দাবির সারাংশ করলে দেখা যায় যে, সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই এর মূল কথা এবং আবারও সেই একজন প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে ১০ জন উপদেষ্টামণ্ডলীর দাবিই তারা জানিয়েছেন। এরসঙ্গে অন্য একটি মৌলিক দাবি হচ্ছে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে যে, মাত্র কিছুদিনের জন্য কোনও অনির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে রাজনীতিবিদদের জন্য বিপদ ডেকে আনার পক্ষে তারা নন। এ প্রশ্ন ১/১১-র আমলে যদি বিএনপি-নেত্রী খালেদা জিয়াকেও করা হতো, তাহলে তিনিও নিশ্চিতভাবেই বলতেন যে, তিনি আর কোনও ধরনের অনির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিতে আগ্রহী নন। যেহেতু ১/১১-র সরকারের পরে আওয়ামী লীগ দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে, সেহেতু তারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেয়। এখনও যে আশঙ্কা থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবিগুলোকে বিশেষ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে অগ্রাহ্য করছে সরকার, তা আর কিছু নয়, একটি অনির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে নতুন করে যে আরেকটি ১/১১-র মতো ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে? অনির্বাচিত সরকারের সবচেয়ে বড় রোষের শিকার আওয়ামী লীগ। এমনকি ভোটার তালিকা সংক্রান্ত যে জটিলতা থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে, তাও একটি অনির্বাচিত সরকারের দ্বারা বৈধ হয়েছিল। ফলে সব মিলিয়ে যে নির্বাচনি, রাজনৈতিক ও গণতন্ত্র হারানোর ভীতি থেকে জাতিকে একবার মুক্ত করা গেছে, সেই একই ভয়ের মাঠে জনগণকে আরেকবার ছেড়ে দিতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা নতুন করে রাজি হবেন না, তা বলাই বাহুল্য। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে অনেক বিদেশি রাষ্ট্রও যে একমত, সেটা বোঝা যায় এ কারণে যে, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় যখন আলোচনার জন্য সংলাপে রাজি হলেন শেখ হাসিনা, তখন তার কট্টর সমালোচক বিদেশি রাষ্ট্রও এই পদক্ষেপে শুধু আশ্চর্য হয়েছে, তাই-ই নয়, তারা বেশ প্রশংসাই করেছে। এদিকে, একটি অনির্বাচিত ও অগণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠান করিয়ে কোনও নির্বাচিত সরকারের সক্ষমতাকে খাটো করার মতো অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রকাশ্যে কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমর্থন দিতে পারে না—এটাও কিন্তু একটি বাস্তবতা বটে।

সংলাপ শেষে আমরা দেখতে পেলাম যে, দেশ কার্যত দ্বিধাবিভক্ত। একপক্ষে আওয়ামী লীগ, ১৪ দল, জাতীয় পার্টি, বিকল্প ধারাসহ উল্লেখযোগ্য কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বর্তমান কাঠামোতে অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দিয়ে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষপাতি; অন্যদিকে সংলাপশেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সরাসরি ও খোলাখুলিভাবে তাদের অবস্থান না জানালেও কেবল এটুকু তারা জনগণকে জানিয়েছেন যে, সরকার তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। ফলে তারা এখন বিকল্প চিন্তা করছেন। তাদের সঙ্গে বাকি যারা তাদেরই মতো সংসদ ভেঙে দিয়ে অনির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন করানোর কথা বলছেন, তারাও এখনপর্যন্ত কিছুই জানাইনি আমাদের যে, তাদের দাবি মেনে না নেওয়ার পর তারা আসলে কোন্ পথে এগুবেন? তারা কি নির্বাচনে যাবেন? নাকি নির্বাচন বর্জন করবেন? ঐক্যফ্রন্ট বলছে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি আদায়ে বাধ্য করা হবে সরকারকে। কিন্তু আজকে যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দেন তাহলে কি খুব সহজে আর আন্দোলন জমানো সম্ভব হবে? ড. কামাল হোসেন মানুষকে তার পক্ষে জড়ো করতে পারবেন বটে কিন্তু তার পক্ষে কি নেতৃত্ব দিয়ে একটি গণ-আন্দোলন জমানো সম্ভব? এরকম অনেক প্রশ্ন নিয়েই আমাদের দিন পার করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর। আজকে সংলাপ-পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু কোনও কারণ দর্শানো ছাড়াই বাতিল করা হয়েছে সে সংবাদ সম্মেলন। অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের পূর্বঘোষিত রাজশাহীর উদ্দেশে রোডমার্চও বাতিল করা হয়েছে। এমনকি হতে পারে যে, ভেতরে ভেতরে আরও কোনও ‘সম্ভাবনা’-র পথ খোলা রাখতে চাইছে উভয় পক্ষই? একথা সবাই স্বীকার করেন যে, সংলাপে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসুক কিনা আসুক, জনমনে এক ধরনের স্বস্তি এই সংলাপ দিতে পেরেছে এবং সরকারপক্ষ একথা প্রমাণ করতে পেরেছে যে, তারা গোয়ার্তুমি নয়, বরং আলোচনার মধ্য দিয়েই একটি লক্ষ্যে পৌঁছুতে চায়। অন্যদিকে ২০১৩ সালে খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চরমভাবে অপমান করার পর দুই পক্ষের মাঝে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তা ঐক্যজোটের এই সংলাপে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে অনেকটাই কেটে গেছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের উষ্ণতা অন্তত তৈরি হয়েছে। আর কে না জানে, উষ্ণতা আসলে সম্পর্কের বরফ গলাতে সহায়তাই করে।

এই মুহূর্তে আমাদের সামনে তাহলে  ক’টি দরোজা খোলা থাকছে? হতে পারে একাধিক কিন্তু আমার সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন যে, কোনও সহিংসতাকে এড়িয়ে যে প্রধান দরোজাটি আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে, তাহলো সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের তফসিল ঘোষণার পর একটি পক্ষ কার্যকরভাবে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নেমে পড়বে, আরেকটি পক্ষ যদি আন্দোলন আর বক্তব্য-বিবৃতিতে নিজেদের ব্যস্ত রাখে, তাহলে তাদের বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীর জন্যও তা হবে হতাশাজনক। ফলে একটি পন্থা বের করে অবিলম্বে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার জন্য তাদেরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এমনকি তাদের দাবি অনুযায়ী নির্বাচন তারিখ পেছানো হলেও নির্বাচনি প্রচারণায় তারা এখনই নেমে না পড়লে তারা পিছিয়ে পড়বেন, তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। নির্বাচন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটাই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এই মুহূর্তের একমাত্র লক্ষ্য, তাতে কেউ দ্বিমত হবেন না। প্রশ্ন হলো, সেই নির্বাচনটি কতোটা গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ হয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী সংলাপকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে আশ্বস্ত করেছেন বটে কিন্তু তাতে সব পক্ষই যে আশ্বস্ত হয়নি, তা বলাই বাহুল্য। এখন বাকিটুকু কি নির্বাচন কমিশন করতে পারবে? আজকের পর থেকে তো দেশ মূলত চলবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে। দেখাই যাক, নির্বাচন কমিশন তাদের হাতে অর্পিত ক্ষমতা দিয়ে আমাদের কোথায় নিয়ে যায়। ক্ষমতা খুব মিষ্টি হলেও ক্ষমতার দায় কিন্তু ইতিহাস-নির্ধারণী। বাংলাদেশে বারবার এই সত্যটি অগ্রাহ্য হয় বলেই সব সমস্যা বারবার ফিরে আসে। আশা করি, নির্বাচন কমিশন আগামী দিনগুলোতে ক্ষমতার দায় ও দায়িত্ব সুচারুভাবেই পালন করতে সক্ষম হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

masuda.bhatti@gmail.com

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ