অবশেষে নির্বাচনে বিএনপি

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৫:১৭, নভেম্বর ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৯, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকারসব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত ড. কামাল হোসেনের হাত ধরে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। বিএনপির মতো একটি বড় দলের এখন হাঁটুভাঙা অবস্থা। বিএনপি এখন পরনির্ভর একটি দলে পরিণত হয়েছে। একদিকে পুরনো ২০-দলীয় জোট (যাতে সম্ভবত আরও তিন দল যোগ দিয়েছে),  অন্যদিকে নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই দুই জোটের কাঁধে ভর দিয়ে চলতে চাইছে বিএনপি। বিএনপির মতো দলের  অবস্থা এমন হয়েছে যে, একা আর পথ চলতে পারছে না, বলতে হচ্ছে ‘হাত ধরে মোরে নিয়ে চলো সখা’। তবে বিএনপি আবার কোনও অজুহাতে নির্বাচন থেকে সটকে পড়বে কিনা সেটা অবশ্য এখনই বলার সময় আসেনি।
বিএনপি তার মিত্রদের নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের  সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেই অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। তবে আশা করা যায়, গত নির্বাচনের তুলনায় একটি ভালো নির্বাচন এবার হবে। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, বিএনপি তার মিত্রদের নিয়ে সরকার গঠন করতে পারবে– এমন ধারণা নিয়ে যার নির্বাচনি ভাবনায় ভাববেন, তারা হতাশ হবেন। পিছিয়ে পড়া অবস্থানে থেকেই বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হচ্ছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা যতই বলা হোক না কেন, বাস্তবে সেটা সম্ভব নয়। নতুন মামলা-হামলা যদি নাও হয়, প্রচার-প্রচারণায় যদি কোনও বাধা নাও দেওয়া হয়, তাহলেও কি বিএনপি খুব সুবিধা করতে পারবে?

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। খালেদা জিয়া আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি পেলেও শারীরিক কারণে সারাদেশে ছুটে বেড়াতে পারবেন না। সবচেয়ে বড় কথা, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর দলের নেতৃত্বে থাকতে পারবেন কিনা সে প্রশ্নও আসনে আসছে। খালেদা-তারেকের অবর্তমানে বিএনপির ‘অভিভাবক’ কে? যৌথভাবে দল পরিচালনার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেটার প্রতিফলন ঘটানো খুব সহজ নয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্থান কি অন্য সিনিয়ররা খুশি মনে গ্রহণ করবেন?

জোট এবং ঐক্যফ্রন্ট নিয়েও বিএনপিকে ঝামেলা পোহাতে হবে। জোটে এলডিপির অলি আহমেদ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তার নেতৃত্ব কি বিএনপি মেনে নেবে? ঐক্যফ্রন্টে ‘জাতীয়’ নেতার অভাব নেই। ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে আগানোর চেষ্টা হলেও আ স ম আব্দুর রব, কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মনসুর– সবাই তো বড় নেতা। কে কাকে নেতা মেনে চলতে চাইবে সেটা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়েও বিএনপিকে চাপে পড়তে হবে। দুই ডজনের বেশি দল। মিত্রদের জন্য কতটি আসন ছাড়বে বিএনপি? বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থায় নেই– এটা মিত্ররা জানে। তাই তারা এখন বিএনপির কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধাটাই নিতে চাইবে। আসন ছাড়তে গিয়ে না বিএনপিই শেষে ছোট দলে পরিণত হয়!

জামায়াতকে নিয়েইবা কী করবে বিএনপি? জামায়াত দলীয়ভাবে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে পারবে না। জামায়াত কি ধানের শীষ নিয়ে বিএনপির নামেই নির্বাচন করবে? বিএনপি কি জামায়াতকে আত্তীকরণ করবে? করলে কী প্রতিক্রিয়া হবে ড. কামাল হোসেনের?

নির্বাচনের পর সংসদে ঐক্যফ্রন্ট এবং জোটের নেতৃত্ব কে দেবেন সে প্রশ্নও আসবে? ঐক্যফ্রন্টের ছোট শরিকরা চাইবে ড.কামাল হোসেনকে সংসদীয় নেতা নির্বাচিত করতে। বিএনপি সেটা মানবে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে জিতবেন তো? তার কিন্তু নির্বাচনে জেতার রেকর্ড নেই। তিনি যদি বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন না করেন তাহলে তার এমপি হওয়ার বাসনা পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ড. কামালের নির্বাচনি আসন কোনটি সেটাও এখনও নিশ্চিত নয়।

ড. কামাল হোসেন যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন না করতেন, বিএনপি যদি এই ফ্রন্টে যোগ না দিতো, গণভবনে যদি প্রধানমন্ত্রী আলোচনায় না ডাকতেন, তাহলে কী হতো– এসব প্রশ্ন কারো কারো মনে উঠতে পারে। তবে এসব প্রশ্ন নিয়ে লেবু কচলানো এখন অর্থহীন হলে বা না হলে কী হতে পারতো বা হতো না তা নিয়ে গবেষণা এখন অর্থহীন। এখন বাস্তবে যা হয়েছে এবং আর কী কী হতে পারে তা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যেতে পারে।

রাজনীতি সম্পর্কে যাদের সামান্য জ্ঞানবুদ্ধি আছে তারাই বুঝতে পারছিলেন যে নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপির কোনও উপায় নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি যে ভুল করেছে, রাজনীতির মূল কক্ষপথ থেকে বিএনপি যেভাবে ছিটকে পড়েছে, আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস-সহিংসতা করে বিএনপি যেভাব সরকারের তোপের মুখে পড়েছে, তাতে বিএনপির কোমরভাঙা অবস্থা হয়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে। তার আশু কারামুক্তির সম্ভাবনা কম।  এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে, শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে– না হলে নির্বাচন নয়, বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতেও দেওয়া হবে না– এসব কথা এতদিন বিএনপি বলেছে। কিছু একটা আদায় না করে নির্বাচনে যেতে কারো কারো আপত্তি থাকলেও এখন কিছু আদায় না করেই বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হচ্ছে। বিএনপিকে এখন বিজয়ী মুডে নয়, পরাজিত মানসিকতা নিয়েই নির্বাচনে যেতে হচ্ছে। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মন ভাঙা। ভোটারদের মধ্যে এর একটা বড় প্রভাব পড়বে। মানুষ এটা দেখছে যে, বিএনপির শর্তে বা কথায় রাজনৈতিক ঘটনাবলি পরিচালিত হচ্ছে না। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে। আওয়ামী লীগই আবারও ক্ষমতায় ফিরবে– এটাও এখন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছেন।

আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনাকে পুনর্নির্বাচিত না করার জন্য কিছু রাজনৈতিক শক্তি ও ব্যক্তির মধ্যে এক ধরনের তাড়া বা অস্থিরতা দেখা গেলেও সাধারণ মানুষ সরকার বদলের জন্য অতটা উদগ্রীব বলে মনে হয় না। কারণ মানুষ শান্তি স্বস্তি চায়। সরকারের ওপর মানুষ কিছু ক্ষোভ-বেদনা আছে, তবে সেটা সন্তুষ্টির চেয়ে হয়তো বেশি নয়। শেখ হাসিনার সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করেনি, এই সরকারের আমলে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়নি– এটা কেউ বলেন না। সমস্যা হলো আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-মন্ত্রী-এমপির দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ  আচার-আচরণ। এবার যদি এ ধরনের বিতর্কিতদের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া না হয়, যদি ক্লিন ইমেজের অন্তত শ'খানেক নতুন মুখ মনোনয়ন তালিকায় দেশবাসী দেখতে পায় তাহলেও কিন্তু শেখ হাসিনার ইমেজ সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। এমনিতেই সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার চেয়ে যোগ্যতর কেউ দেশে আছেন– এটা অনেকেই মনে করেন না। নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল হবে– এটা কেউ কেউ মনে করলেও বাস্তবতা সেরকম নয়। নির্বাচনি প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে মাঠের বাস্তবতা আরও পরিষ্কার হবে। তবে এটা এখনই বলা যায় যে, নির্বাচনকে বিতর্কিত করার সব ধরনের চেষ্টা বিরোধীদের থাকবে। নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না, এটা ক্রমাগত বলা হবে। এখন বল সরকারের হাতে নয়, নির্বাচন কমিশনের হাতে। নির্বাচন কমিশনকে তার সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। নির্বাচনি আইন ও আচরণবিধি মানতে সব পক্ষকে বাধ্য করতে হবে। আইন থাকবে অথচ তার যথাযথ প্রয়োগ থাকবে না, তেমন আইন থাকা না-থাকা সমান। বিএনপিসহ তার মিত্ররা যাতে অভিযোগ করার সুযোগ কম পায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশন চাইলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন যে করতে পারে সে প্রমাণ আমরা আগে পেয়েছি। খারাপ নজির অনুসরণ না করে ভালো নজির অনুসরণ করতে অসুবিধা কোথায়? তবে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীরই সহযোগিতার মনোভাব থাকতে হবে। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। জয়ের সুযোগ কেবল একজনের। অন্যদের পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে যে স্বস্তির হাওয়া বইয়ে দিয়েছে সেটা যেন বজায় থাকে নতুন সরকার গঠনের সময় পর্যন্ত।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ