জামায়াতের বিচারের প্রতিশ্রুতি কি থাকবে নির্বাচনি ইশতেহারে?

Send
তপন মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৬:৫৮, নভেম্বর ২০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৩, নভেম্বর ২০, ২০১৮

তপন মাহমুদজামায়াতের নিবন্ধন বাতিল নতুন কিছু নয়। ২০১৩ সালে আদালতের রায়ের পর থেকে জামায়াতের নিবন্ধন কার্যত স্থগিত ছিল। কোনও নির্বাচনে দল হিসেবে তারা অংশ নিতে পারেনি। তবে এই দলের নেতারা বিভিন্ন নির্বাচনে কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছে। তাই এটা সহজেই বোঝা যায় নিবন্ধন বাতিল জামায়াতের ভোটের রাজনীতিকে সংকুচিত করলেও তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বহাল তবিয়তেই আছে। তাই দলটির নিবন্ধন বাতিল বিষয়ে কিছু দিন আগে প্রকাশিত নির্বাচন কমিশনের গেজেট নিয়ে চূড়ান্ত সন্তুষ্ট হওয়ার তেমন কিছু নেই। কারণ, এতে নতুন কিছু যোগ হবে না, গত পাঁচ বছর ধরে যা হয়ে আসছে সেটাই চলবে। অর্থাৎ জামায়াত দল হিসেবে যেহেতু নিবন্ধিত নয়, সেহেতু তারা নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনও নির্বাচনে দল হিসেবে অংশ নিতে পারবে না। এ বিষয়ে একটি তথ্য জেনে রাখা ভালো, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের সঙ্গে কিন্তু যুদ্ধাপরাধ ইস্যুর কোনও সম্পর্ক নেই।
কিন্তু ২০১৩ সালে নিবন্ধন বাতিলের পর পুরনো যে দাবিটি আরও জোরালো হয়েছিল, দল হিসেবে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। সে সময় অনেক মন্ত্রীকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘জামায়াত নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র’। এক মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘নিবন্ধন বাতিল জামায়াত নিষিদ্ধের প্রথম ধাপ’। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে গিয়ে সবই যেন থমকে আছে রহস্যময়ভাবে। 

আমাদের হয়তো অনেকেরই মনে আছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের বিচারের রায়ে আদালত জামায়াতকে অপরাধী দল হিসেবে তাদের পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দল হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে বিচার করার কথাও বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে একটি প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করা হয়। কিন্তু সেটি আর এগোয়নি এই বলে যে যেহেতু আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেহেতু আইনটি সংশোধন করে সংগঠনের শাস্তি সুনির্দিষ্ট করা না গেলে কার্যত এই তদন্ত ফল বয়ে আনবে না। কিন্তু সেই সংশোধন প্রক্রিয়াটিও দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে।

এই যখন অবস্থা, তখন জামায়াত নিষিদ্ধ করা কি তাহলে আইনি জটিলতা? আমরা সমস্বরেই বোধ হয় বলে উঠতে পারি ‘না’। অনেকের মতো আমিও বলবো– ‘এরমধ্যে রাজনীতি আছে’। আর থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। ১৯৭১ সালে এই জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম বা মুসলিম লীগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। হত্যা, ধর্ষণসহ হেন মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড নেই, যার সঙ্গে এরা যুক্ত ছিল না। আর এ কারণেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই ১৯৭১ সালের বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তেই জামায়াতসহ চারটি দলকে দালালি তৎপরতার জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর আমলে সব ধরনের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হয়। কিন্তু আমরা পরবর্তীতে দেখি, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান, যিনি মুক্তিযুদ্ধে একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, বহুদলীয় রাজনীতির পথ খুলে দেওয়ার মাধ্যমে জামায়াতসহ যুদ্ধাপরাধী দলসমূহের ফের বাংলাদেশে রাজনীতি করার রাস্তা প্রশস্ত করে দেন। আর তারই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়ে নতুন ইতিহাস নির্মাণ করলো বিএনপি। বলা যায়, বিএনপির রাজনৈতিক পতন তখনই শুরু হয়েছিল। প্রথম মেয়াদে সাহস না করলেও দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই সমস্ত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করালো আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠতায় এটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। বলা যায়, অসাধ্য সাধন করেছেন তিনি। একই সঙ্গে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলেছে, তা বন্ধের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই জামায়াতসহ সব যুদ্ধাপরাধী দলকে বিচারের মুখোমুখি করা ও বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করা সময়ের দাবি। আওয়ামী লীগ যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল, তাই যুদ্ধাপরাধীদের মতো এই দলসমূহকেও বিচারের মুখোমুখি করাও আওয়ামী লীগের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তাই আওয়ামী লীগকে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অবশ্যই নিতে হবে। এটা নিয়ে গড়িমসি করলে তাদের প্রতি জনগণের সন্দেহ তৈরি হবে। আর যেহেতু এই দলটির রজনীতির প্রধান ভিত্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সেহেতু তাকে সেই চেতনা বাস্তবায়নে দেশকে অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

জামায়াতের মতো যুদ্ধাপরাধী দলকে রেখে যদি কোনও রাজনৈতিক ফায়দা লাভের চেষ্টা কেউ করে, সেটা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে প্রবঞ্চনা। তাহলে জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার সুযোগ দিয়ে বিএনপি যে ভুল করেছে, আখেরে সেই একই খেসারত দিতে হবে। ভোটের সমীকরণ, কিংবা ক্ষমতা অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এই সমীকরণ মেলাতে গিয়ে একটা জাতির বিনির্মাণের অপরিহার্য শর্তকে, একটা ন্যায়ের প্রশ্নকে উপক্ষো করলে, ভালো কোনও ফল বয়ে আসবে না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি পুরোপুরি মীমাংসা না করে, নতুন বাংলাদেশের পথ কিছুতেই তৈরি করা সম্ভব হবে না। তাতে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে যাবে।

জামায়াতের বিচার বা নিষিদ্ধের প্রসঙ্গ এলেই অনেকেই লাভ ক্ষতির হিসাব মেলাতে শুরু করেন। কেউ বলেন, ‘লাভ নেই, জামায়াত অন্য নামে আসবে’। কারো যুক্তি, ‘জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে পারে’। আবার কারো মত, ‘তারা বিএনপিতে ভিড়ে যাবে’। এসব যুক্তি যারা দেন বা এই বিষয়গুলোকে আলোচনায় নিয়ে আসেন, আমার মনে হয় তারা বিষয়টির নৈতিক অবস্থানকেই ধরতে পারছেন না। এমনকি তারা স্পর্শ করতে পারছেন না মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের আবেগের বিষয়টিও। তারা কেবল তথাকথিত রাজনৈতিক জ্ঞান দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতির হিসাব মেলাতে চান। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কোনও ক্ষমতা লাভের বিষয় না। এটির সঙ্গে জড়িত আছে ন্যায়ের প্রশ্ন। আইনের শাসনের প্রশ্ন। এই ধারণাটা তৈরি করতে হবে, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করে কেউ পার পেতে পারে না। তাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে ঠাঁই হয় না।

এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কথা। মিত্রবাহিনী তাদের পরাজিত করার পরই যে প্রক্রিয়াটা শুরু করেছিলেন, সেটা হলো সমাজের সর্বস্তর থেকে তাদের উৎখাত করা বা সরিয়ে দেওয়া। এই দলের সদস্যরা অন্য কোনও নামে দল করা তো দূরের কথা, অন্য কোনও দলে তাদের যোগ দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। এমনি প্রকাশ্যে বলাও যাবে না, তারা কোনও দিন এমন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া আর্থসামাজিক রাজনৈতিক সামাজিক স্তরের কোনও স্থানে তারা যাতে স্থান না পান সেই চেষ্টাও ছিল। এটি এখনও বহাল আছে। ১৯৪৩ সালে এই প্রক্রিয়াকে আইনিভাবে নামকরণ করা হয়েছে ‘ডিনাৎসি-ফিকেশন’। জামায়াতসহ যুদ্ধাপরাধী সব দল ও সে সময়ের সব সদস্যদের নিষ্ক্রিয়করণে আমাদের এমন একটি প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে।

কিন্তু কবে? কে করবে? সবাই যদি 'সস্তা' রাজনীতির শিকার হয়ে বিষয়টিকে শুধু প্রলম্বিত করতে থাকে, তাহলে যুদ্ধাপরাধী দলের গলায় ঘণ্টা কে পরাবে? বিএনপি দল হিসেবে এর নৈতিকতা তো অনেক আগেই হারিয়েছে। আর এ নিয়ে তার কোনও কমিটমেন্টও নেই। বরং জামায়াতের সঙ্গে তারা এখনও জোটবদ্ধ। আসছে নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে যুদ্ধাপরাধী দলটিকে লড়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলেই বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে। তাহলে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী দলগুলোই পারে এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে। যেহেতু সামনে নির্বাচন, তাই এ মুহূর্তে নতুন আইন করে বা আইনের সংশোধন করে যুদ্ধাপরাধী দলের বিচার করা অনেকটাই অবাস্তব। কিন্তু আসছে নির্বাচনে এই প্রতিশ্রুতি তো আসতে পারে, ক্ষমতায় এলে জামায়াতসহ যুদ্ধাপরাধী দলসমূহকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। নিষিদ্ধ করা হবে। আর এজন্য সময়ও নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। সেই প্রতিশ্রুতি কি আসবে?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ