কেমন হলো আওয়ামী লীগের মনোনয়ন?

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৫:৩৬, নভেম্বর ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৮, নভেম্বর ২৬, ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকারএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণায়ও এগিয়ে থাকলো আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সবদিক থেকেই সুবিধাজনক অবস্থায় থেকে নির্বাচন করছে এটা সবাই বুঝতে পারছেন। বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মানুষের মনে স্বস্তি এসেছে। একতরফা নির্বাচন, ফাঁকা মাঠে নির্বাচন–  এসব যে হবে না সেটা স্পষ্ট হয়েছে। আবার নির্বাচন নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কাও কমে এসেছে। তবে নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও পক্ষপাতমুক্ত হবে তা নিয়ে সংশয় আছে সব মহলেই।
আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু করেছিল আগে। মনোনয়নপত্র কেনার জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের হুমড়ি খেয়ে পড়া, এক আসনে সর্বোচ্চ ৫২ জনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার ঘটনা থেকে বোঝা গিয়েছিল আওয়ামী লীগ টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশের যেমন উন্নতি করেছে, তেমনি দলের ভেতরেও এমপি হওয়ার জন্য আগ্রহীদের সংখ্যা স্ফীত করতে সক্ষম হয়েছে। এটা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সবলতার লক্ষণ, নাকি ক্ষতিকর প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ সেটা বোঝা যাবে নির্বাচনি যুদ্ধে দল কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা দেখে।

তবে বিএনপির মনোনয়নপত্র সংগ্রহেও উৎসাহের কোনও ঘাটতি ছিল না। বরং আওয়ামী লীগের থেকে বিএনপির এমপি হতে ইচ্ছুক নেতা বেশি বলে মনে হয়েছে। বিএনপির মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি। বিএনপি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে খুব সুবিধাজনক অবস্থায় না থাকা সত্ত্বেও এতজনের প্রার্থী হতে চাওয়াটা কম কথা নয়। বিএনপি নির্বাচনে কেমন করবে, মানুষ আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে গ্রহণ করবে কিনা, সেসব প্রশ্ন থাকলেও এটা স্পষ্ট বোঝা যায়, বিএনপির অবস্থান কেউ কেউ যতটা দুর্বল মনে করেছিলেন,প্রকৃতপক্ষে ততটা দুর্বল নয়।

বিএনপি যেমন এককভাবে নির্বাচনের মাঠে নামছে না,  তেমনি আওয়ামী লীগও একা নয়। বিএনপির পুরনো ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। একসময় আওয়ামী ঘরানার রাজনীতি করেছেন সেই ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রব, কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মনসুররা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে কার লাভ কার ক্ষতি হলো তারচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আদর্শহীন ও আওয়ামী লীগ বিরোধিতার এই ঐক্য সামগ্রিক বিবেচনায় দেশের জন্য ভালো হলো কিনা।

আওয়ামী লীগও নীতিগতভাবে একমতে একপথে চলা সবাইকে নিয়ে নির্বাচনে নামছে, তা নয়। এতদিন চরম আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি করেছে তাদের কারও কারও সঙ্গেও আওয়ামী লীগ নির্বাচনি সমঝোতা করেছে। ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলকেও সঙ্গে নিয়েছে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার এই সাময়িক কৌশল রাজনীতিতে নীতিহীনতাকে জোরদার করা ছাড়া আর কোনও ইতিবাচক উপাদান যুক্ত করছে কিনা তা এখনই পরিষ্কার নয়। তবে সাধারণভাবে বলা যায়,  নীতিহীন আদর্শহীন রাজনৈতিক ঐক্য-সমঝোতা সাময়িক সুবিধা দিলেও এসবের সুদূরপ্রসারী ফল ভালো হতে পারে না।

নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে বড় দুই দলকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের যেমন প্রতি আসনেই গড়ে এক ডজনের বেশি প্রার্থী আছে, তেমনি বিএনপিরও আছে। তারমধ্যে মিত্রদের আসন ছাড়তে হবে। কাকে কোন আসন ছাড়া হবে সেটা ঠিক করা সহজ কাজ নয়। আসন ভাগাভাগী নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে বিপাকে পড়তে হবে। তবে ২৫ নভেম্বর দলের মনোনীত প্রার্থীদের হাতে মনোনয়নের চিঠি ধরিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনয়নে একধাপ এগিয়ে আছে। মিত্রদের জন্য আওয়ামী লীগ যে আসনগুলো ছাড়ছে তাতে তাদের প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে এবং মিত্রদের কারণে দলের মনোনয়ন বঞ্চিতরাইবা কীভাবে বিষয়টিকে গ্রহণ করছে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। আওয়ামী লীগ ২৩০ জনকে চিঠি দিয়েছে। ধরে নেওয়া যায় বাকি ৭০ আসন মিত্রদের দেওয়া হবে। মিত্ররা কি তাতে সন্তুষ্ট থাকবে? আবার ওই ৭০ আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা কি এখন উৎসাহ নিয়ে মিত্রদের জয়ের জন্য কাজ করবে?

বলা হয়েছিল, এবার আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবে। নানা কারণে যারা বিগত সময়ে বিতর্কিত-সমালোচিত হয়েছে তাদের এবার মনোনয়ন দেওয়া হবে না। শতাধিক মন্ত্রী-এমপির বাদ পড়ার কথা শোনা যাচ্ছিল। ক্লিন ইমেজের কিছু নতুন মুখ এবার মনোনয়ন পাবেন বলেও প্রচার ছিল। কয়েকজন পেশাজীবীর নামও আলোচনায় ছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। কয়েকজন বাদ পড়েছেন, নতুন কয়েকজন যুক্ত হয়েছেন। তবে এই সামান্য পরিবর্তন মানুষকে খুশি করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। চরম বিতর্কিত সংসদ সদস্য কক্সবাজারের বদিকে বাদ দিয়ে তার স্ত্রীকে এবং টাঙ্গাইলে খুনের মামলার আসামিকে বাদ দিয়ে তার বাবাকে মনোনয়ন দেওয়া এক অর্থে জনপ্রত্যাশার মুখে চপেটাঘাতের মতোই হয়েছে। ‘পরিবারের সবাই খারাপ নয়’–এই যুক্তিতে স্ত্রী ও বাবাকে মনোনয়ন দিয়ে আওয়ামী লীগ কী প্রমাণ করলো?  দলটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে?

কিছু তারকা প্রার্থীর নাম শোনা গিয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় তারকা বলতে মাশরাফি বিন মুর্তজা এবং নায়ক ফারুক ছাড়া আলোচিত কেউই মনোনয়ন পায়নি। মাশরাফি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন এটা তার জন্য কোনও বাড়তি গৌরবের বিষয় হয়তো নয়, কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো অর্জন। তবে রাজনৈতিক দলের ভেতরের যে অবস্থা তাতে মাশরাফি কতটুকু কী করতে পারবেন, বলা মুশকিল।

ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে, নারীদের মধ্য থেকে অধিক সংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কথা শোনা গেলেও তেমন হয়নি। তবে নারী প্রার্থী হিসেবে নারী উদ্যোক্তা সেলিমা আহমদ মনোনয়ন পেয়েছেন। এটা ভালো সংযোজন।

৩০০ আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হবে।

বিএনপির কতজন প্রার্থী হচ্ছেন, মিত্রদের বিএনপি কতটি আসন ছাড়বে, কার বিরুদ্ধে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, সেটা পরিষ্কার হতে আরও কিছু সময় লাগবে। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়,  তাহলে লড়াই হবে মন্দে মন্দে। জমবে ভালো। তবে বিএনপি বিরোধী দলে থাকায় এবং দেশে আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী একটি ভোটব্যাংক থাকায় বিএনপি নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী। বিএনপি মনে করে মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে তাদেরই ভোট দেবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মনে করে দেশে তারা যে উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি করেছে তাতে মানুষ ভোট দেবে তাদেরই। মাঠের অবস্থা এখনও কোনও দলের সহজ জয়ের বার্তা দিচ্ছে না। মানুষ সবকিছু দেখছে। সব দলের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে এবং নির্বাচনি প্রচারণা জমে উঠলে বোঝা যাবে হাওয়া কোন দিকে। তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা দেখে রাজনৈতিক মহলে উৎসাহ দেখা দেওয়ার কোনও তথ্য জানা যায় না। ভালো প্রার্থী দেওয়ার নীতি থেকে আওয়ামী লীগ কেন সরে গেল সে প্রশ্ন এখন অনেকের মনেই উঠছে। প্রশ্ন আছে। কিন্তু উত্তর পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ