বিএনপির ধারণা ও আশাবাদ!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৫:৫২, নভেম্বর ২৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫০, নভেম্বর ২৮, ২০১৮

আহসান কবির১৯৮৬ ও ২০১৪ সালের বাস্তবতায় নেই বিএনপি। পুরনো কিন্তু চমকপ্রদ সংবাদ হচ্ছে, বিএনপি ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন–সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। অবশ্যই বিজয়ীও হবে। তাহলে ষড়যন্ত্রটা কী আর হঠাৎ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বেশি করে বলছে কেন বিএনপি?
দল গঠনের পর বিএনপি প্রথম অংশ নিয়েছিল দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। প্রথম (১৯৭৩), দ্বিতীয় (১৯৭৯), তৃতীয় (১৯৮৬) এবং চতুর্থ (১৯৮৮) নির্বাচন ব্যবস্থা ছিল একইরকম অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ছিল ক্ষমতাসীন সরকারের অধীন এবং ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়েছিল। স্বৈরাচার এরশাদের অধীনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কেউই অংশ নেয়নি। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের চেহারা ছিল একই। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের অধীন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়নি। আওয়ামী সরকারের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত অংশ নেয়নি।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ওই সময়ে সারাদেশে নির্বাচনি সহিংসতা ও বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে কত শত মানুষের প্রাণ গেছে, তার সঠিক হিসাব সম্ভবত নেই। কিন্তু এবার আওয়ামী সরকারের অধীনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে কেন? কী এমন জাদুতে আওয়ামী সরকার অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে গেলো বিএনপির কাছে?

২০১৩-১৪ সালের বিএনপির মতো ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার একই ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। আন্দোলনের মুখে মাত্র আড়াই মাসের মাথায় সরকার থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল বিএনপি। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জিতে ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরেছিল আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার ঘোষণা দিলেও ১৯৯৬ সালের মতো ২০১৪ সালে একইরকম নির্বাচন করে পাঁচ বছর ক্ষমতায় টিকে গেলো আওয়ামী লীগ! আওয়ামী লীগের টিকে যাওয়া এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে এই বিশাল পার্থক্য জনগণের নিশ্চয়ই নজর কেড়েছে!
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে খালেদা জিয়ার একটা আপসহীন ইমেজ গড়ে উঠেছিল। ১৯৯১ সালে নির্বাচনে অনেকেরই ধারণা ছিল ক্ষমতায় আসছে আওয়ামী লীগ। ধারণা পাল্টে দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি, দল থেকে প্রচার করা হতে থাকে, বিএনপি-দ্য চয়েস অব এ নিউ জেনারেশন! তাহলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়া কি ভুল ছিল বিএনপির? এই নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে কি সাধারণ মানুষের বিপক্ষে চলে গিয়েছিল বিএনপি?
২০১৪ সালের নির্বাচনে না আসার প্রধান কারণ কী ছিল? অনেকেই বলেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়েছিল বিএনপিকে। ২০০৯ সাল থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অনেকের সঙ্গে জামায়াতের কয়েকজন নেতার যখন বিচার শুরু হয়, তখন এই বিচার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল বিএনপি। এরপর রাস্তার আন্দোলনে জামায়াতের সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে, ক্রমশ কমতে থাকে বিএনপির কর্মীসংখ্যা। ২০১৪-১৫ সালের পর থেকে রাস্তায় বিএনপির কর্মীসংখ্যা কমতে থাকে,শেষমেষ যেন তারা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় নয়া পল্টনের পার্টি অফিসের সামনে। যদিও বিএনপির দাবি–হেনস্তা ও দমনপীড়নের জন্য সরকারের দায়ের করা উদ্দেশ্যমূলক মামলা এবং এলাকায় টিকতে না দেওয়ার কারণে বিএনপিকর্মীরা ঠিকমতো রাস্তায় নামতে পারেননি। ধরে নেওয়া যাক, বিএনপি অংশ নিলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় আসতো যেকোনও উপায়ে। তাহলেও বিএনপি থাকতো প্রধান বিরোধী দল এবং যে কয়টি আসন পেতো, সে কয়টি এবং পার্শ্ববর্তী আসনে বিএনপির আন্দোলনে চাঙ্গা ভাব থাকতো। দলগতভাবে সারাদেশে বিএনপি নেতারা ক্রমশ কর্মীহারা হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীরও নিবন্ধন নেই এবারে। তারপরও ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে বিশের অধিক আসন দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে, জামায়াতের নেতারা বিএনপি তথা ধানের শীষ প্রতীক নিয়েই ভোট করবেন।
সরকারের দমন পীড়নের কারণে হোক আর সংগঠনের দুর্বলতার কারণে হোক অথবা প্রভাবিত করার মতো কোনও বিদেশি শক্তির কারণেই হোক ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে বিএনপি। বিএনপির দলগত অহমিকা কি চূর্ণ হয়নি তাতে? দীর্ঘদিনের সঙ্গী জামায়াতের সঙ্গে আসন ঠিক হলেও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও আসনসংখ্যা এখনও চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপি। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট জিতলে কার অবস্থান কী হবে? প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? খালেদা জিয়া, তারেক রহমান নাকি ড. কামাল হোসেন? মান্না ও রবের পদ তাহলে কী হবে? এত অনিশ্চয়তার পরও কেন বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার কথা বারবার বলছে? যে কারণ ও কথামালা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সেগুলো এমন:

এক. বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনেকেই মনে করেন নির্বাচন হবে না শেষমেষ। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। এখনকার অবস্থা সেই ঝড়ের পূর্বাভাস। বিএনপি তাই বারবার নির্বাচনের কথা বলছে। আর যদি নির্বাচন হয়, বিএনপির অনেক নেতা মনে করছেন আরেকটা ১৯৯১-এর বাস্তবতা ফিরে আসবে। সাধারণ মানুষের ভেতর অনেকেরই ধারণা, যেকোনও উপায়ে জিতবে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এক্যফ্রন্ট ও বিএপির নেতারা মনে করেন ভোটের মাধ্যমে ‘নীরব বিপ্লব’ হবে। বিশাল ব্যবধানে জিতবে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট!

দুই. বিএনপির নেতা ও সমর্থকদের অনেকের ধারণা ড. কামাল হোসেন ও মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে ‘বিদেশের’যোগাযোগ ভালো। ‘আর্ন্তজাতিক’ মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে। আওয়ামী লীগ সরকার এই ‘আর্ন্তজাতিক’দের বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে ২০১৪-এর মতো এবার আর ‘অগ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন করতে পারবে না। মানুষ ভোট দিতে সমর্থ হলে বিএনপির বিজয় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।

তিন. বিএনপির নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান এবার নির্বাচন না করতে পারলেও কামাল হোসেন ও মান্নারা তাদের ফিরিয়ে আনতে পারবেন রাজনীতিতে। প্রয়োজনে আইনি সাহায্য দিয়ে তারা খালেদাকে মুক্ত করতে পারবেন, ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবেন তারেক রহমানকেও। মধ্যবর্তী কোনও সময়ে নির্বাচিত করে আনা যাবে খালেদা ও তারেককে।

চার. ঐক্যজোটকে নিয়ে বিএনপির সংশয় কম ছিল না, এখনও আছে। তারা ডা. বি. চৌধুরী ও কামাল হোসেনকে প্রথম থেকেই সন্দেহ করে আসছিলেন। অনেকে আড়ালে আবডালে বলে থাকেন তারা ‘আওয়ামী এজেন্ডা’ বাস্তবায়ন করতে মাঠে নেমেছেন। বি. চৌধুরী তাই শেষমেষ ঐক্যফ্রন্টে থাকতে পারেননি। জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ দাবি করার পরেও বি. চৌধুরীর দল নৌকা মার্কা নিয়ে ভোট করতে সক্ষম হবে! কামাল হোসেন সম্পর্কে অনেকের ধারণা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে তিনি এক বা দুই বছরের জন্য আওয়ামী লীগকে ‘সেইফ এক্সিট’ (ক্ষমতা থেকে নিরাপদে প্রস্থান) দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। বিএনপির এই অংশ প্রবলভাবে বিশ্বাস করে যে-সাবেক সেনা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনকে ‘সেইফ এক্সিট’ দেবার প্রতিশ্রুতির বিনিময়েই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল! আওয়ামী লীগ নির্বাচনে হেরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলে বিএনপি প্রতিশোধ স্পৃহায় মেতে উঠতে পারে। কামাল হোসেনই তখন দিতে পারেন তাদের ‘সেইফ এক্সিট’।

পাঁচ. বিএনপির বেশিরভাগ নেতা-কর্মীরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ এতদিন প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে রেখেছে, এবারের নির্বাচনের আগে তাদের পক্ষে তেমন করে রাখা আর সম্ভব হবে না। প্রশাসনে ‘চুপচাপ থাকা সুবিধা না পাওয়া’র দল ভেতরে ভেতরে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টকে ‘ছাড়’ দেবে। আর এটা সিটি করপোরেশন বা বিভাগ ওয়ারি একটি মাত্র পদের মেয়র নির্বাচন না যে আওয়ামী লীগ সবকিছু করেও পার পেয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের অধীন প্রশাসন তাদের অবস্থা লেজে গোবরে করে তুলবে। আন্তর্জাতিক মহলে যারপরনাই বিতর্কিত হবে আওয়ামী লীগ! নির্বাচনেও হারবে যদি প্রসাশন ‘সামান্য নিরপেক্ষতার’ আবরণ রেখে কাজ করে!

আশা নিয়ে নির্বাচনের দিন গুনছে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট। এখনও নির্বাচনের কথাই বলছে আওয়ামী লীগ। দেখা যাক ডিসেম্বরের শেষে কী আছে দেশ তথা জনগণের কপালে।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ