নির্বাচনি ইশতেহার নিয়ে বিস্তারিত ভাবনা

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৬:১১, ডিসেম্বর ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৫, ডিসেম্বর ০২, ২০১৮

মো. জাকির হোসেনরাজনীতিতে না চাইতেই বিনে পয়সায়, ঝক্কিঝামেলাহীন যেসব জিনিস পাবেন তার অন্যতম হলো নির্বাচনি ইশতেহার। নির্বাচনি ইশতেহার হচ্ছে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রপরিচালনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নিজ দলের আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা এবং ভোটারদের তথা জনগণের প্রতি তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। বাংলাদেশে সাধারণত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলো প্রথাগতভাবে নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করে। এখন অবধি ইশতেহার প্রকাশিত না হলেও ইশতেহার প্রণয়নে পুরোদমে কাজ চলছে মহাজোট আর ঐক্যফ্রন্টে। পত্রিকান্তরে জেনেছি বিএনপির ভিশন-২০৩০-কে সামনে রেখেই ফ্রন্টের নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি হচ্ছে। এর আগে নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিএনপির থিংকট্যাংক ও সিনিয়র নেতারা একটি খসড়া ইশতেহার তৈরি করেছিলেন। এখন ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেই ওই নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফ্রন্টের ইশতেহারের শেষ মুহূর্তের ঘষা-মাজা চলছে। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নির্বাচনি ইশতেহারের কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এটি হতে পারে একমেয়াদি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের জন্য নির্বাচিত হলে ৫ বছরে যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, এই প্রতিশ্রুতির ওপর নাকি জোর দেবে ঐক্যফ্রন্ট। প্রাথমিক একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে— যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার বিভাগ, বাকস্বাধীনতা, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে খাতভিত্তিক চমক রয়েছে।

আমাদের দেশে ইশতেহারগুলোতে মিষ্টি মিষ্টি অনেক কথা থাকে, থাকে অনেক প্রতিশ্রুতি। ইশতেহারে এমন তীব্র মিষ্টি কথা থাকে যে, ইশতেহারের সংস্পর্শে দীর্ঘ সময় থাকলে ডায়াবেটিস হয়ে যেতে পারে বোধ করি। পৃথিবীর কোনও কিছুতেই একসঙ্গে এত স্বপ্নের জোগান থাকে না, যেমনটি থাকে নির্বাচনি ইশতেহারে। সে হিসাবে নির্বাচনি ইশতেহারকে স্বপ্নভাণ্ডার বললেও অত্যুক্তি হবে না বোধ করি। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে অনেক স্বপ্ন আর মিষ্টি কথা থাকলেও নির্বাচনের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বপ্নদের ‘স’-এর বফলা হারিয়ে স্বপ্নগুলো ফিকে যায়। আর মিষ্টি কথাগুলো কবি হেলাল হাফিজের কবিতার মতো ‘লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট/পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট’তে পরিণতি লাভ করে। এটি একবার, দুবার নয়, বারবার হয়েছে। ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা থাকলেও আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হিসাবে হ্যাট্রিক নয়, পাঁচবার শীর্ষস্থান দখল করেছি। দুর্নীতি অতীতে লজ্জা-শরমের বিষয় ছিল। যৌনকর্মের চেয়েও সঙ্গোপনে, আড়ালে-আবডালে দুর্নীতির কর্মটি সম্পাদিত হতো। দুর্নীতির সম্পদ গোপন রাখা হতো। কিন্তু দুর্নীতি আমাদের দেশে আর লজ্জা-শরম বা আড়ালে-আবডালের বিষয় নয়। প্রকাশ্য দিবালোকে, এমনকি কখনওবা জনসমক্ষে ঘুষ আদান-প্রদান হয়। দুর্নীতির টাকায় বাড়ি-গাড়ি হয়। বেতনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ সন্তানের পড়াশোনার পেছনে ব্যয় হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ এখন দৃশ্যমান। দেশ-বিদেশের প্লট, ফ্ল্যাট, শপিং মল, নতুন শিল্প-কারখানার মালিকানা, পুঁজিবাজার, উচ্চ বেতনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বজনদের অধ্যয়নের ব্যয়, সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর এমপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে দেদার অর্থ ব্যয় এসব জায়গায় খুঁজলেই দুর্নীতিবাজদের দেখা মিলবে। তাহলে ইশতেহারে দুর্নীতিরোধের গল্পটি রূপকথার চেয়েও মিথ্যা, ফাঁকা বুলি।

আওয়ামী লীগের ইশতেহারের বিষয়ে এখনও তেমন কিছু জানা না গেলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের কিছুটা ট্রেইলর প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনি ইশতেহারে সরকার, সংসদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, পররাষ্ট্রনীতিসহ সরকারের প্রতিটি বিভাগে নতুন ধারার রাজনীতির আলোকে পরিকল্পনা সন্নিবেশিত করা হবে বলে খবর বেরিয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতিকে কঠোর হাতে দমন করার অঙ্গীকার ফ্রন্টের ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে এমনটি আভাস পাওয়া গেছে। প্রশ্ন হলো, বিএনপি দুর্নীতি বিষয়ে তার পূর্বের অবস্থান পাল্টেছে কিনা। বিএনপির একজন নেতার দুর্নীতির অভিযোগ বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের আদালতে প্রমাণ হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের ড্রাগ ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (UNODC)-র যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত Asset Recovery Handbook-এর একাধিক জায়গায় বিএনপির সে নেতা কর্তৃক সিমেন্স কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ এবং ঘুষের অর্থ সিঙ্গাপুরে পাচার এবং আমেরিকা ও সিঙ্গাপুরের আদালতে তা প্রমাণিত হওয়ার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। তিন দফায় দুর্নীতির ২০ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার টাকার সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত আনার পরও বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে একে ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা নাইকো দুর্নীতি মামলায় কানাডার রয়্যাল মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি)ও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড ও কানাডা থেকে সংগৃহীত নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায় নাইকো দুর্নীতিতে খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সহজেই অনুমান করতে পারি বিএনপির দুর্নীতির তথ্য উল্লেখের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের তথ্য উল্লেখ না করায় অনেকে আমাকে গালাগাল করতেও কসুর করবেন না। বিদেশের কোনও আদালতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা তার কোনও সন্তানের দুর্নীতির বিচার কিংবা দুর্নীতির পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা হয়েছে কিনা এমন কোনও তথ্য আমার জানা নেই। কারও জানা থাকলে আমাকে তথ্য দিন, আমি অবশ্যই আমার কলামে উল্লেখ করবো। দুর্নীতি নিয়ে আমাদের অন্তহীন দুশ্চিন্তার পাশাপাশি দুর্বল একটি আশার কথা সম্প্রতি প্রকাশিত ফোর্বসের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়। ফোর্বসের প্রতিবেদনে প্রকাশ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) দেড় বছর ধরে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১৬টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ২০ হাজার মানুষের ওপর জরিপ চালিয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাতে দুর্নীতিতে শীর্ষ পাঁচে ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের নাম থাকলেও নেই বাংলাদেশ।

বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের কথা বারবার ইশতেহারে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ দূরে থাক, বরং তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে সব সরকারের আমলেই। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি ‘স্বৈরচারী একনায়কতান্ত্রিক’ শাসনের জন্ম দেওয়ায়, ফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে বিদ্যমান অবস্থার অবসানকল্পে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে। খুবই প্রশংসনীয় অঙ্গীকার। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’ (আগে ঘর, তবে তো পর)। ফ্রন্টের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির গঠনতন্ত্রে সব ক্ষমতা চেয়ারপারসনের হাতে কুক্ষিগত আছে। এমনকি ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হলেও বিএনপির সদস্য তথা চেয়ারপারসন থাকতে বাধা নেই বলে আইন করা হয়েছে। বিএনপি নিজ গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ক্ষমতার ভারসাম্য আনলে ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধান সংশোধন করবে এ আশ্বাসে জনগণ ভরসা পেতো। কথায় বলে, ‘Example is better than precept’ উপদেশ অপেক্ষা দৃষ্টান্তে ভালো শিক্ষা হয়। ফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে সংসদ ভেঙে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে বলে ফ্রন্ট নেতারা জানিয়েছেন। নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বেশ কয়েক বছর ধরে শুনছি। কিন্তু জাতির সামনে না তার রূপ না তার রেখা অদ্যাবধি প্রকাশিত হয়েছে। এক ফ্রন্ট নেতার বরাতে জানা গেছে তারা যে নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়ন করছেন, তাতে নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি রাখা হচ্ছে। সংবিধান মেনেও পরবর্তী ৯০ দিনে নির্বাচন করা সম্ভব। ১২৩ (৩)(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙে দিতে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেবেন। এরপর রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে পরবর্তী সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত রুটিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেবেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে ছোট আকারের মন্ত্রিসভা গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। সংসদ ভেঙে দিলে সব দল ও প্রার্থীর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে’র শর্ত পূরণ হবে বলে জানান তিনি। কোন দল থেকে কতজন নেওয়া হবে, কোন দলের নিয়ন্ত্রণে কোন মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থাকবে তা সুস্পষ্টভাবে ইশতেহারে উল্লেখ না থাকলে নির্বাচনকালীন সরকারের বিতর্কের অবসান হবে বলে প্রতীয়মান হয় না।

হানাহানি, বিভক্তি ও বিভাজনের রাজনীতির অবসান বিষয়ে বারবার ইশতেহারে উল্লেখ করা হলেও জাতি প্রত্যক্ষ করেছে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে মামলার পাশাপাশি গ্রেনেড হামলায় নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টাও করা হয়েছে। পত্রিকান্তরে জেনেছি, বিরোধী দলকে সত্যিকার অর্থেই বিকল্প সরকারের মর্যাদা দেওয়ার কথা থাকবে ফ্রন্টের ইশতেহারে। প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা নয়, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়েই ঐক্যফ্রন্ট আগামী দিনের রাজনীতি করতে চায়। ইশতেহারে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকবে। ইশতেহারে প্রতিহিংসা নয়, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে নতুন ধারার রাজনীতির। কিন্তু ফ্রন্ট নেতারা বর্তমান সরকারকে এমনকি বিচারকদেরও হুমকি দিচ্ছেন নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘একবার সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগকে দেখে নেবো’, ‘ক্ষমতা ছাড়তে হবে, দেশও ছাড়তে হবে’, ‘দেশ ছেড়ে পালাবার পথ পাবে না’, ‘পিঠের চামড়া থাকবে না’, ‘যে শাস্তি আপনারা পাবেন, তা কল্পনাও করতে পারবেন না’, ‘যে বিচারক খালেদার জেল দিয়েছেন, তাঁরও একদিন বিচার হবে’। ইশতেহারের অঙ্গীকার আর নির্বাচনি বক্তৃতার মধ্যে বিস্তর ফারাক। মহান মুক্তিসংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যমান স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থার অবসান করে সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক, শোষণমুক্ত ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করার কথা ফ্রন্টের ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে। প্রশ্ন হচ্ছে, মহান মুক্তিসংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান কী হবে? মুক্তিসংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশে বিএনপি জামায়াতের সম্পর্ক কী হবে? ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অবস্থান কী হবে?

জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যমত গঠনের কথা ইশতেহারে উল্লেখ করা হলেও রাষ্ট্রীয় মদদে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বেপরোয়া উত্থান, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার ব্যাপক তৎপরতা, যুদ্ধে ব্যবহৃত গ্রেনেড দিয়ে প্রতিপক্ষকে হত্যা, একই সঙ্গে বহু জায়গায় পরিকল্পিত বোমা বিস্ফোরণ, ভয়াবহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে অস্ত্রের চালান প্রেরণ, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রখ্যাত রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড জাতি সচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছে। ইশতেহারে বারবার সুশাসনের অঙ্গীকার করা হলেও আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসনের আগে ‘সু’ আজও  জায়গা করে নিতে পারেনি। সরকারি চাকরিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির কথা ইশতেহারে থাকলেও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সমর্থক এ অভিযোগের ভিত্তিতে বাধ্যতামূলক অবসর, ওএসডি এসব সহনীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে বহু আগে থেকেই।

অতীত ভুলে ‘পাথরচাপা সাদা কষ্ট’ বুকে চেপে আমরা চাই আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে ইশতেহার প্রণীত হবে তা কথার ফুলঝুরি না হয়ে বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য হোক। অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি যে বিষয়গুলো আমরা ইশতেহারে আবশ্যিকভাবে উল্লেখ ও তা বাস্তবায়নের দাবি করছি তা হলো– এক. ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) হিসাব মতে, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ জনসংখ্যার বোনাসকাল (ডিভিডেন্ড) উপভোগ করছে, যা ২০৪০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। জনমিতির পরিভাষায় ডিভিডেন্ড বলতে বোঝায় ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষের আধিক্য। এ বয়সসীমার মানুষই সবচেয়ে কর্মক্ষম, যারা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। এ সময়ে দেশের জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি থাকে ১৫ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে মধ্যবর্তী বয়সী। এই মানুষরা উপার্জন করতে পারে, ফলে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমে। এতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি হয়। বিশ্বের যেকোনও দেশ এ সুযোগ একবারই পেয়ে থাকে। দুই. শিক্ষার মান ও চাকরি প্রত্যাশীদের দক্ষতা বৃদ্ধি। শিক্ষার মানের চরম অবনতি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার নামে যে বেকার তৈরি হচ্ছে তা ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি প্রবাসী বছরে রেমিট্যান্স পাঠায় ১৬ বিলিয়ন ডলার, আর শিক্ষার মানের ঘাটতির কারণে দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশের কোটি মানুষের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে যাচ্ছে কয়েক লাখ বিদেশি কর্মী। তিন. রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে কেবল লোক দেখানো, ভোট পটানো অঙ্গীকার নয়, দরকার কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন। রাজনৈতিক সহিংসতা গিলে খাচ্ছে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা। বিশ্বব্যাংক হিসাব কষে দেখেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ১৪০ কোটি ডলার বা প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। কেবল নির্বাচন এলেই তা নিয়ে সংলাপ নয়, বরং যে বিরোধগুলো ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে, প্রতিহিংসার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সেসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। চার. পুঁজির পলায়ন বাংলাদেশের সম্ভাবনার পথে আরেক মারাত্মক সমস্যা। পলাতক পুঁজি (capital flight) সম্পর্কে গবেষণা পরিচালনাকারী সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) জানাচ্ছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৯ বিলিয়ন মানে ৯০০ কোটি ডলারেরও বেশি পুঁজি বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এভাবে যদি পুঁজি পাচার না হতো, তাহলে এরই মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত বলে গবেষকরা মনে করেন। দুর্নীতি বন্ধে ‘মাহাথির পদ্ধতি’ প্রয়োগ হলেও দুর্নীতি কমে আসবে। দুর্নীতি বন্ধে পক্ষপাতহীনভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে, যাতে বিরোধীপক্ষ দণ্ডিত হলেও কোনও প্রশ্ন উত্থাপন করতে না পারে। পাঁচ. বিচার বিভাগের সংস্কার করে মামলাজট নিরসন ও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা তৈরি। ছয়. ব্লু ইকোনমির সুযোগ নিতে ও আমাদের সমুদ্রের অপার সম্পদ আহরণে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব জনবল ও অবকাঠামো প্রস্তুত করার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সাত. পানি, জলবায়ু, পরিবেশ ও ভূমির টেকসই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পরিকল্পনা প্রণয়ন। আট. দারিদ্র্য বিমোচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি হতদরিদ্র মানুষের জন্য বছরব্যাপী নামমাত্র মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের কার্যকর পরকল্পনা গ্রহণ।

এবারের নির্বাচনি ইশতেহারের মূল প্রতিপাদ্য হোক ‘আর নয় অঙ্গীকার, বাস্তবায়নই হোক অগ্রাধিকার’। ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, হানাহানির দিন শেষ’। বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। যারাই নির্বাচিত হবেন এ অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখবেন এটি আমজনতার প্রত্যাশা। ইশতেহারে শান্তির কথা বলে, হানাহানি, বিভক্তি ও বিভাজনের রাজনীতির অবসানের কথা বলে নির্বাচনের পর প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা-হিংস্রতায় যারা মত্ত হবে তারা জনতার কাঠগড়ায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ধ্বংসের জন্য বিশ্বাসঘাতক হিসেবে এবং বাংলাদেশ ও বাঙালির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হবে।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain@justice.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ