ভোট ভাবনা

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:১৬, ডিসেম্বর ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৯, ডিসেম্বর ১২, ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাগত ১০ বছরে বাংলাদেশে একটি রূপকথা তৈরি হয়েছে, যার নাম শেখ হাসিনা। তিনি যতটা না একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী, তারচেয়েও বেশি পরিচয় তার এখন ‘উন্নয়ন নেত্রী’ হিসেবে। অনেকেই বলছেন, আগামী ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে কী ফল হবে, সেটা মূল প্রশ্ন নয়। শেখ হাসিনা না থাকলে, বাংলার মসনদে অন্য কেউ বসলে দেশ কোন পথে যেতে পারে, সেটাও বোঝা প্রয়োজন।
মানুষের মনোজগতে যে ভাবনা আছে তার সঙ্গে মধ্যবিত্তের তৈরি করা বাজারি ভাবনার মিল খোঁজা বোকামি। এই নাগরিক মধ্যবিত্ত সুশাসনের কথা বলে, আর এসব বলে বলে উন্নয়নকে অস্বীকার করতে চায়। তাদের কাছে গণতন্ত্র শুধুই ভোটের খেলা, যে খেলা খেলতে আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে দেওয়া যায়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এবং নিয়ে চলেছেন। তাঁর আসার আগে যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎহীন অন্ধকার এক দেশ ছিল, এই সময়ে এসে আজ প্রত্যন্ত অঞ্চলও আলোকিত। আর্থিক বৃদ্ধির হার বেড়েছে, মানব উন্নয়ন সূচকে এগিয়েছে, শিক্ষায় প্রসার লাভ করেছে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প নিজ অর্থে বাস্তবায়ন করা, মেট্রোরেল, ডিজিটাল বাংলাদেশ, দারিদ্র্যবিমোচন, চিকিৎসা খাতে উন্নয়ন, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ইন্টারনেট সুবিধা বিস্তৃত হওয়া, কৃষিতে নীরব বিপ্লব, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিনিয়োগের জন্য একশ’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিশুদের বিনামূল্যে বই বিতরণ, নারীর অগ্রগতি, ছিটমহল জয়, সমুদ্র বিজয় সবই হয়েছে এই সময়টায়।

তবে একথাও তো সত্যি, পুরো সময়টিই ছিল চ্যালেঞ্জিং। যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে আরেক একাত্তরের মতো যুদ্ধ মোকাবিলা করে শাসনকার্য পরিচালনা করতে হয়েছে। এবং বাংলাদেশের যে বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি আছে, তার থেকে তিনি এবং তার দলও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পথে থাকতে পারেননি।

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ২০০৯-এর শুরুতে তিনি যখন ক্ষমতা নেন, তখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। আজ  তা নেমে এসেছে ২৫ শতাংশের নিচে। চ্যালেঞ্জটা এখানে যে, এরপরও ১৬ কোটি মানুষের দেশের তিন কোটিরও বেশি মানুষ এখনও দরিদ্র। বিরোধীরা একটা কথা বলে, গড় আয় বেড়েছে, জিডিপি বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। সুফল নিয়েছে দলীয় ধনিক শ্রেণি। অর্থাৎ যারা সামাজিকভাবে যত অনগ্রসর, তাদের কাছে বৃদ্ধির সুফল তত কম পৌঁছেছে। এই বিতর্ক এমন এক বিতর্ক যা আসলে শেষ হওয়ার নয়। শুধু এটুকুই বলার যে, ‘উন্নয়ন হলে ধনিক শ্রেণি সুবিধা পায়, আর অনগ্রসররা বঞ্চিত হয়’–এমন তত্ত্ব বিশ্বাস করলে ক্ষমতায় বসে উন্নয়নের জন্য প্রচেষ্টা না করাই উত্তম। এতেই হয়তো অনগ্রসর শ্রেণি অন্তত নিজেদের আর বঞ্চিত ভাবতে পারবে না।

বাংলাদেশে গত ১০ বছরে উন্নয়নের হাত ধরে একটি নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। এরাই ক্রমে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। নিম্নবিত্ত থেকে একটি শ্রেণি ক্রমে শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত হয়ে উঠছে। এরা এই সময়টায় নিজেদের উন্নয়ন ঘটিয়েছে, আবার এরাই উন্নয়নকে কটাক্ষ করছে। আগের সরকারের শিল্পায়ন ও উন্নয়নের প্রতি অনাগ্রহ ছিল। জঙ্গি লালন আর গ্রেনেড হামলার মতো সন্ত্রাস তাদের শাসনের প্রতীক হয়ে ওঠায় জনমনে প্রভূত অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। অসন্তোষ ছিল কৃষিতেও। দিন বদলের আহ্বানে তাই ২০০৮-এ ব্যাপক সাড়া ছিল মানুষের। 

উন্নয়ন নিয়ে যত সমালোচনা হয় তার বেশিরভাগই করে নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হওয়া গোষ্ঠীটি, যারা এখন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি সেজে নির্বাচনি সমীকরণ করছেন উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে। যে উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারকরা ২০০১ সালে মসনদে বসে দেশব্যাপী হাজার সংখ্যালঘুকে ঘরবাড়ি ছাড়া করেছিল, ধর্ষণ উৎসব করেছে মাসের পর মাস, গ্রেনেড হামলা করে হত্যা করেছে প্রথিতযশা রাজনীতিবিদসহ অংসখ্য মানুষকে, যারা মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয় ছিল, যারা যুদ্ধাপরাধীদের পতাকা দিয়েছিল তাদের সঙ্গে এবার কেন সেসব রাজনীতিক, যারা একসময় এসবের সমালোচনা করতেন? রাজনীতির ভাষা বদলেছে নাকি আদর্শ বদলেছে সেই ভাবনাই এখন সর্বত্র। এরা জানেন ক্ষমতায় এলে ২০০১ সালের পরের সময়টায় রক্তের দাগ যাদের হাতে আছে তাদের সঙ্গেই গলাগলি করতে হবে। তাদের সঙ্গেই পথ চলতে হবে, যারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিশোধ নিতে চাইবে।

গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়। তবে নিশ্চয়ই একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আমাদের সবার চাওয়া। কিন্তু যদি প্রশ্ন ওঠে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের কাজ কী? উত্তর হবে– দেশের মানুষের চাহিদা-আকাঙ্ক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট দাবিতে পরিণত করে তার রূপায়ণের প্রচেষ্টাই দলের কাজ। এটাই গণতন্ত্রের তত্ত্ব।  

রাজনৈতিক ময়দানে নেতারা লড়াই করবেন, এটা অপ্রত্যাশিত নয়, বরং কাঙ্ক্ষিত। জনগণের মত প্রভাবিত করতে, তাদের সমর্থন নিজের প্রতি আকর্ষণ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে, এটাই স্বাভাবিক। পরস্পরবিরোধী নানা দাবির সংঘাতে নতুন নতুন সংকট তৈরি হবে, এটাও গণতন্ত্রে প্রার্থিত। কিন্তু দেশের উন্নয়নের চিন্তা না করে, মানুষের আয় ও ব্যয় সক্ষমতা বাড়ানোর কথা না ভেবে, তাকে বিদ্যুৎহীন অন্ধকার থেকে আলোতে আনার চেষ্টা না করে, নারী প্রগতির কথা না ভেবে, শিক্ষায় অগ্রসর হওয়া পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার না দিয়ে নাগরিকদের শুধু ভোটদাতা হিসেবে বিবেচনাই যদি রাজনীতি হয়, তবে বলতেই হবে বাংলাদেশে আসলে আর কোনও সমস্যাই নেই।

নাগরিক অধিকার প্রয়োজন, জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত হওয়াও অনেক বেশি প্রয়োজন। জনগণ নিজেদের মনে সেই যুদ্ধটাই করুক আর ভাবুক, যুদ্ধে জয়লাভ করবে না কাউকে হারাতে গিয়ে নিজেরাই হারবে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ