‘চরণে দলে গেলো মরণ শঙ্কারে’

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:২৫, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২২, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকার১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির জন্য বেদনাবিধুর একটি দিন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিন পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনী বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রায়েরবাজার এবং মিরপুরের বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। বাঙালি জাতি নয় মাসের অসম সাহসী এক যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিল। পাকিস্তানিরা পরাজয় নিশ্চিত জেনেই বাঙালির ওপর চরম প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য, বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে নিঃস্ব করার জন্যই বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে বধ করা হয়েছিল। স্বাধীন হলেও বাঙালি যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, মেধা ও মনন চর্চায় এগিয়ে যেতে না পারে, সেটাই ছিল পাকিস্তানিদের লক্ষ্য।
পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের শাসন-শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির ধারাবাহিক যে রাজনৈতিক আন্দোলন তার পেছনে প্রেরণাদায়ী ভূমিকা ছিল বুদ্ধিজীবীদের। রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বুদ্ধিজীবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরির উপাদন-উপকরণ সংগ্রহ-সরবরাহ করতেন অর্থনীতিবিদ,শিক্ষাবিদসহ সমাজের চিন্তাশীল মানুষেরা। গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক-অগণতান্ত্রিক শাসকদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ আন্দোলন সংঘটনে বড় ভূমিকা পালন করেছেন শিক্ষাবিদ এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন, পহেলা বৈশাখ পালন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক একটি জাতি-মানস গঠনের প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছিলো। রাজনৈতিক আন্দোলনের সহায়ক এবং পরিপূরক হিসেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা পালন করায় পাকিস্তানি শাসকদের রাগ-ক্ষোভ ছিল বুদ্ধিজীবীদের ওপর। তাই মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন পাকিস্তানিদের টার্গেট।
আমরা আমাদের শত্রু-মিত্র চিনতে অনেক সময় ভুল করি। শত্রুদের প্রতি দরদ দেখাই। নানা সম্পর্কসূত্র আমাদের দুর্বল করে। আমরা ভুল করি এবং চরম খেসারত দিয়ে তারপর অনুশোচনা করি। কিন্তু আমাদের শত্রুপক্ষ ভুল করে না। পাকিস্তানিরা ঠিকই তাদের শত্রু চিহ্নিত করেছিল এবং তাদের নিষ্ঠুরভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় করেছিল। ওরা কারো বয়স, শিক্ষা, মর্যাদা, সম্মান, খ্যাতি, দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি কিছুই বিবেচনা করেনি। নারী-পুরুষ সবকিছু তুচ্ছ বিবেচনা করে বাড়ি থেকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে এবং নির্দয় যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করেছে। শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, দার্শনিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ক্রীড়াবিদসহ বাছাই করে সব কৃতী মানুষকে নিষ্ঠুর অত্যাচারের মাধ্যমে হত্যা করে তারা পৈশাচিক উল্লাস করেছে। তাদের প্রতিহিংসাপরায়ণতার শিকার হয়েছেন পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাবক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মানবসেবায় ব্রতী কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহ। বাদ যাননি অজাতশত্রু আত্মভোলা দার্শনিক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব। নয় মাস ধরেই একদিকে যেমন গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং বেপরোয়া ধর্ষণ চলেছে, অন্যদিকে তেমনি চলেছে বেছে বেছে কৃতবিদ্য মানুষদের হত্যা। পরাজয়ের আগ-মুহূর্তে তারা দলে দলে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গেছে বধ্যভূমিতে।
কতজন বুদ্ধিজীবীকে তারা হত্যা করেছিল তার সংখ্যাটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সংখ্যাটা শতাধিক কিংবা সহস্রাধিক যাই হোক না কেন, তারচেয়ে বড় বিষয় হলো পাকিস্তানিদের মনোভঙ্গি। তারা বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে চেয়েছে, বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্যও পঙ্গু করতে চেয়েছে।
অনেক চেষ্টা করেও তারা যখন পরাজয় এড়ানো অসম্ভব মনে করেছে তখন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বুদ্ধিজীবীদের পাইকারিভাবে হত্যা করেছে। যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের অনেকেরই সরাসরি কোনও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না, কেউ কেউ অত্যন্ত নিরূপদ্রব জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু বাঙালি হওয়ার অপরাধেই তাদের হত্যা করা হয়েছে।
তারা বেঁচে থাকলে তাদের মেধা ও কর্ম দিয়ে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করতে পারেন- এই আশঙ্কা থেকেই তাদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
আমরা এটা জানি যে একটি জাতির মনন গড়ে ওঠে তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের বেঁধে দেওয়া ছাচে। সব লড়াকু মানুষের লড়াইয়ের পথ ও কৌশল এক হয় না। কেউ লড়াই করেন অস্ত্র হাতে, কেউ গান করে, কেউ কবিতা লিখে, কেউ ছবি এঁকে, কেউবা খেলার মাঠে নৈপুণ্য দেখিয়ে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার যোগফল সফলতা তথা যুদ্ধ জয়। সবার রক্তের সিঁড়ি বেয়েই আমরা উড়াতে পারছি স্বাধীনতার পতাকা।
কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জা ও অপমানের বিষয় এটাই যে, আমরা একাত্তরের পরাজিত শক্তির কাছে হার মানছি বারবার। আমরা বিজয়-আনন্দে মত্ত হলে তারা ঘাপটি মেরে থাকে, আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা আবার ফণা তোলে। দেশে আজ যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত অবস্থা, এটা কি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মদানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? তারা জীবন দিয়েছিলেন এমন একটি মুক্ত স্বদেশের জন্য, যেখানে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানোর সুযোগ কারো পাওয়ার কথা নয়। অথচ আজ দেশের উল্টো যাত্রা আমরা মেনে নিচ্ছি নানা কুযুক্তিতে। আমরা পুনর্বাসিত করছি আমাদের শত্রুদের। ক্রমাগত পিছু হটছি নিজেরা। অনেক বিলম্বে হলেও বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ঘাতক-দালালদের কয়েকজনকে চরম দণ্ড দিতে সক্ষম হলেও এখন পর্যন্ত তাদের আস্ফালন বন্ধ হয়নি। তাদের কয়েকজন দেশের বাইরে পালিয়ে আছে। দেশের মধ্যেও আছে কারো কারো অবাধ বিচরণ। ক্ষমতার রাজনীতির সংকীর্ণ নানা হিসাব-নিকাশে, সমীকরণে এখনও কেউ কেউ পাচ্ছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমরা আবেগপ্রবণ হই, আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করি। কিন্তু আত্মদানকারী শহীদদের কাছ থেকে আমরা কী সাহসী হওয়ার প্রেরণা পাই। যারা অকুতোভয়ে মরণ শঙ্কারে চরণে দলে গেছেন তাদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে তখনই, যখন আমরা প্রিয় স্বদেশকে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক-সমতাভিত্তিক একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবো।
শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: কলামিস্ট

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ