প্রতিশ্রুতির খেলা

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:২৫, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৬, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আছে ঐক্যফ্রন্ট, সেখানে সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী দল বিএনপি। ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের মধ্যে আছে জামায়াতের ২২ নেতা। ঐক্যফ্রন্ট একটি নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে, আবার বিএনপিও আলাদাভাবে করেছে। একইভাবে মহাজোটে আছে যারা তারা আলাদা নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। আওয়ামী লীগ করেছে, নৌকায় নির্বাচন করেও রাশেদ খান মেনন বা হাসানুল হক ইনুর দলও নির্বাচনি ইশতেহার দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো একই প্রতীকে নির্বাচন করে, একই আদর্শকে গ্রহণ করে আলাদা ইশতেহার কেন? ইশতেহার দেখে জনগণ ভোট দেয় কিনা সে এক বড় আলোচনা। তবে ইশতেহার মানে হলো প্রতিশ্রুতির ঝকমারি। নির্বাচনি গণতন্ত্রে প্রতিশ্রুতি হলো সাময়িক যুদ্ধাস্ত্র। ভোট-তরণী পার হওয়ার জন্য রাজনীতিতে এবং রাজনৈতিক সমাজে প্রতিশ্রুতি দিতে হয় এবং কাজ ফুরোলেই তার কথা ভুলে যাওয়ার চল কোনও একক দলের নয়, বলতে গেলে দলে দলে সকল রাজনীতিরই মজ্জাগত। এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়টি তুলে ধরে বিরোধী দলের নানা খেলা খেলবার অভ্যাসটিও সব রাজনীতির সাধারণ কু-অভ্যাস। তারা কিছু করেনি, আমরা ক্ষমতা পেলেই করবো— এই মহাশ্বাসবাণী সবাই দিয়ে থাকেন, এবারও দিচ্ছেন। তবে তারা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারা নিজেদের দেওয়া ইশতেহারের পাশ দিয়েও হাঁটেনি, সেটাও আবার মানুষের দেখা।

প্রতিশ্রুতি একটি সমস্যা ঠিকই। তবে তা একমাত্র সমস্যা নয়। প্রতিশ্রুতির রূপ যে কত বড় সমস্যা তৈরি করে, শেখ হাসিনা তা টের পেয়েছেন। তার প্রতিশ্রুতি ছিল ক্ষমতায় গেলে তিনি ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করবেন। তিনি সেই যুদ্ধাপরাধের বিচার করেছেন এবং এখনও তা অব্যাহত রেখেছেন। তবে এটি করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন সমাজের গভীরে কত ষড়যন্ত্র লুকানো। মানুষের দাবির কারণে তিনি সাহস করে করেছেন, তবে মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি। দিনের পর দিন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধকে মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। এবং এখনও তার প্রতিপক্ষ আসলে দিনশেষে যুদ্ধাপরাধের বিচার-বিরোধীরাই। এরপরও সমাজের সর্বাঙ্গীণ সংস্কারের ওপর ভর করেছেন, প্রাথমিক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো মৌলিক ক্ষেত্রে নজর দিয়েছেন। বড় বড় সব অবকাঠামোগত প্রকল্প হাতে নিয়ে দেশকে বড় স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

তার ঝুঁকি ছিল এবং ঝুঁকি মোকাবিলা করেছেন। রাস্তার রাজনীতির আগুন আক্রমণের পাশাপাশি তাকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকে খতম করতে হয়েছে। সাধারণ ভোট-কারবারি রাজনীতিকদের মধ্যে সংকীর্ণতম, স্বার্থপরতম রাজনীতি করার সুযোগ তার হয়নি। তবে তার দল আওয়ামী লীগ সর্বক্ষেত্রে তার গতির সঙ্গে বা তার নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে চলতে পেরেছে সেটা বলা যাবে না। আর পারেনি বলেই অনেক কাজ করেও এই সময়টিতে সুশাসনের অভাব ছিল বলে অনেক কথা আজ উচ্চারিত।

‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’–শিরোনামে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ২১টি বিশেষ অঙ্গীকার আছে, যেগুলোর অনেকগুলোই ইতোমধ্যে অর্জিত। কিন্তু কিছু বিষয়ে দলটি যে প্রতিজ্ঞা করেছে তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন আছে। তিন নম্বর প্রতিশ্রুতি হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। গত দশটি বছরে দেশ এগিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অগ্রগতি রোল মডেলের মতো। কিন্তু জনসমাজে একথাও উচ্চারিত যে, সরকার দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে লাগামহীন দুর্নীতি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বা আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণের প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে। কিন্তু ১০ বছরে ব্যাংকিং ও শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি সবচেয়ে উচ্চারিত অভিযোগ এই সরকারের বিরুদ্ধে।

আট নম্বর বলা হয়েছে, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন দৃঢ় করা হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য এই সুশাসনই বড় চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ ছিল যেখানে দলটি কাঙ্ক্ষিত জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম খুনের অভিযোগ নিরসনে করণীয় কিছুও স্পষ্ট করা হয়নি।      

জনমোহিনী ঘোষণা, ভর্তুকির রাজনীতিতে লাগাতার ছাড়ের বন্যা দেশের অর্থনীতিকে যে কোনোভাবেই সাহায্য করতে পারবে না, সেটা হয়তো বেশিরভাগ রাজনীতিক বুঝেও বোঝেন না। বিএনপি এমন প্রতিশ্রুতি আগেও দিয়েছিল, কিন্তু সরকারে এসে দেখা গেলো এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়নি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত, কিংবা মানুষ দেখল সারের জন্য কৃষকের জীবন বিপন্ন। অর্থনীতিতে এসব জনমোহিনী ঘোষণার যৌক্তিকতা নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠতে পারে। ঐক্যফ্রন্ট যখন বলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না তখন প্রশ্ন উঠতে পারে যারা বিদ্যুৎ উৎপাদনই করতে পারেনি, তারা মূল্য ছাড় দেবে কোথা থেকে?

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গত দুই মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতে বড় সাফল্য আছে। সারা দেশে শতভাগ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিতে বিদ্যুৎ খাতে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। আওয়ামী লীগ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য পূরণের আর বেশি দেরিও নেই বলে মনে করে মন্ত্রণালয়। আমি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই, যৌক্তিক দামে চাই, বিনামূল্যে নয়। সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) কর্তৃপক্ষ প্রত্যন্ত গ্রামগুলো আলোকিত করার কাজ করে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন আগামী বছরই দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করতে পারবে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণের আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযোজিত হয়। এমনকি ২০০৯ সালের আগে দেশে উৎপাদিত হতো সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। যদিও গ্রীষ্মকালে সে সময় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল। কিন্তু এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ৩ হাজার ২১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য বেশি হওয়ায় তখন সারা দেশে ব্যাপক পরিমাণ লোডশেডিং হতো। এতে ব্যাহত হতো শিল্প ও কৃষির উৎপাদন।  

জিনিসপত্রের দাম কম কমানোর প্রতিশ্রুতির চেয়ে মানুষের আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫১ ডলারে পৌঁছেছে। বিবেচনায় রাখা দরকার যে, মানুষের আয় সক্ষমতা বাড়লে ব্যয় সক্ষমতাও বাড়ে। আর এ কারণেই দেশটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় যেতে পেরেছে।

বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের সবচেয়ে বড় দল। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচার চলমান থাকবে বলা হলেও নিজস্ব ইশতেহারে বিএনপি বিষয়টি উল্লেখ করেনি। এর মাধ্যমে বিএনপি আসলে একটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে ড. কামাল হোসেনদের, আর সেটি হলো ‘তোমরা আমাদের সাথে আছো, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে বিএনপির রাজনীতিই তোমাদের রাজনীতি, এসব যুদ্ধাপরাধ বা মুক্তিযুদ্ধের কোনও বয়ান গ্রহণ করা হবে না’।

পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের জনগণের সংযোগ সহজতর করা হবে। এই প্রদেশগুলো ভারতের, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। সংযোগ হবে ভারতে সঙ্গে, অথচ সেই দেশের নামটি পর্যন্ত নেই ইশতেহারের এই অংশে। ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু নিজেদের শাসনামলে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। আর এমন একটা প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যা পর্যন্ত নেই।

বিএনপির ইশতেহারে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান এবং তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের অঙ্গীকার প্রণিধানযোগ্য। তার চেয়েও বেশি ভালো প্রস্তাবনা মনে হয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং শাখা বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতিটিকে। এই একটি কাজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা অনেকাংশে বাড়াবে, সরকারি ব্যাংকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনবে।      

বিএনপি বলেছে, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি তারা করবে না। কিন্তু ২০০১-এর পরের অবস্থা ভিন্ন কিছু বলে। নির্বাচনে জেতার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, লুট করা, ধর্ষণের উৎসব করা, গ্রেনেড হামলার উৎসব করা মানুষ দেখেছে। এবার যুদ্ধাপরাধের বিচার করায় বিএনপির ওপর প্রভাব বিস্তারকারী জামায়াতে ইসলামী প্রতিশোধপরায়ণ হবে না, বিএনপি কোনোভাবেই সেই নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবু ইশতেহারে এই প্রতিশ্রুতির একটা আলাদা মূল্য আছে। নির্বাচনে যেই জিতুক, সে যেন সবকিছুর মালিক বনে না যায়, ইশতেহারে ঘোষিত এই চেতনা যেন বাস্তবেও থাকে, সেটা প্রত্যাশা। তবে আমাদের সমস্যা হলো নীতিগত জোট না হয়ে ক্ষণস্থায়ী ও সুবিধাবাদী জোট হলে অস্থিরতা ও উচ্ছৃঙ্খলতার আশঙ্কা, আইনের শাসন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা বাস্তবেই থেকে যায়।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা  

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ