এ কেমন বিজ্ঞাপন সিনেমা!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১২:৪০, ডিসেম্বর ২১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৯, ডিসেম্বর ২১, ২০১৮

রেজানুর রহমানটেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দুটি যতবারই দেখি ততবারই মনে এক ধরনের খটকা লাগে। নিজেকে প্রশ্ন করি, যাকে দিয়ে যা বলা হচ্ছে তা আদৌ কি ঠিক হচ্ছে? পরক্ষণে নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দাঁড় করাই। একটি পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারমাধ্যমে যাওয়ার আগে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তা যাচাই-বাছাই করে। কাজেই বিজ্ঞাপন দুটি প্রচারমাধ্যমে প্রচারের আগে নিশ্চয়ই চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করেই প্রচারমাধ্যমে প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবু বিজ্ঞাপন দুটি আমার কাছে খটকা লাগছে কেন? যতবারই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি ততবারই বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, বিজ্ঞাপন দুটির সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির একটি বিশেষ দিক জড়িত।

যদিও প্রশ্ন উঠতেই পারে, মাত্র ২০-৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কী এমন ক্ষতির কারণ হতে পারে? এর সহজ-সরল উত্তরটাই আমার কাছে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বিজ্ঞাপনের দৈর্ঘ্য ২০-৩০ সেকেন্ড হলে কী হবে? রাতদিন ২৪ ঘণ্টায় বিজ্ঞাপন দুটি এমনভাবে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে, তাতে কারও পক্ষেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। টিভি খুললেই বিজ্ঞাপন দুটি দেখতে হবে। পাশাপাশি কেউ যদি বিজ্ঞাপন দুটির বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে জীবনের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হয় তাহলে সেটাই হবে শঙ্কার বিষয়!

কী আছে বিজ্ঞাপন দুটিতে? হ্যাঁ, এই প্রশ্নের উত্তর আগে পরিষ্কার হওয়ার জরুরি। একটি বিজ্ঞাপন তৈরি হয়েছে দেশের মোবাইল সেবাদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। অন্যটি একটি টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন। প্রথম বিজ্ঞাপন দুটিতে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী ও নুসরাত ইমরোজ তিশা।
বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায় তিশাকে রাস্তায় দেখে চঞ্চল জিজ্ঞেস করছেন, ‘আরে স্বপ্না! স্বপ্নারূপী তিশা হাসতে হাসতে পাল্টা প্রশ্ন করে– আরে সোহেল ভাই! সোহেলরূপী চঞ্চল এবার স্বপ্নাকে প্রশ্ন করে– কই যাইতেছো? স্বপ্নারূপী তিশা জবাব দেয়– সিনেমা হলে যাইতেছি। স্বপ্নার কথা শুনে সোহেল অবাক হয়ে বলে, সিনেমার লাইগা হলে যাওন লাগে? আমি ডাউনলোড কইর‌্যা দিতেছি।’
দ্বিতীয় বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায়, ‘কয়েকজন শিশু লাড্ডু খাওয়া নিয়ে কথা বলছে। একটি শিশুর মা তাকে লাড্ডু খেতে দেয় না। কারণ, লাড্ডু খেলে দাঁতে ক্যাভেটিস হতে পারে। বিজ্ঞাপনের একপর্যায়ে ওই শিশুকে বলতে শোনা যায়, মনে হচ্ছে আম্মু বদলানো লাগবে! অর্থাৎ আম্মু যেহেতু লাড্ডু খেতে দেয় না কাজেই শিশুটি তার মাকে বদলাতে চাচ্ছে! কী ভয়াবহ কথা!’
এবার প্রথম বিজ্ঞাপনটির কথায় আসি। এমনিতেই আমাদের দেশে সিনেমার দুর্দিন চলছে। হলে গিয়ে সিনেমা দেখার আগ্রহ দিনে-দিনে কমে যাচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় যেখানে আমাদের উচিত সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার ব্যাপারে দর্শকদের মধ্যে একটা জাগরণ সৃষ্টি করা; অথচ তা না করে আমরা সিনেমা হলে না যাওয়ার ব্যাপারেই ক্যাম্পেইন করছি! যারা এই বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করেছেন এক্ষেত্রে তাদের ব্যাখ্যা কী আমি জানি না। বোধকরি দর্শককে সিনেমা হলে যেতে অনুৎসাহিত না করেও বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করা যেত? বিজ্ঞাপনটি যতবার দেখি ততবারই ভাবি, আহারে! এমনিতেই আমাদের সিনেমার করুণ দশা। দেশের অনেক জেলা শহরেও এখন সিনেমা হল নাই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত দর্শককে সিনেমা হলমুখী করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এক্ষেত্রে পজিটিভ ধারণার বিজ্ঞাপন নির্মাণও সময়ের দাবি। অথচ তা না করে আমরা দর্শককে সিনেমা হলে যেতে বারণ করছি!
এবার দ্বিতীয় বিজ্ঞাপনটিতে আসি। এমনিতেই নানা কারণে আমাদের দেশে সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে আস্থা ও সম্প্রীতির বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রচারমাধ্যমগুলোর যে সময়ে পজিটিভ প্রচার-প্রচারণার দরকার সেই সময়েই শিশুর মুখে নেতিবাচক সংলাপ জুড়ে দিচ্ছি। লাড্ডু খেতে মায়ের বারণ আছে। কাজেই একটি শিশু চাচ্ছে তার মাকে বদলে ফেলতে। কী ভয়াবহ কথা? একজন মা কি শিশুর কাছে একটি খেলনার মতোই যে তাকে বদলে ফেলবে? তর্কের খাতিরে অনেকে হয়তো বলতেই পারেন বিষয়টি অনেকটা কৌতুকের ঢঙে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদি তাই হয় তবু প্রশ্ন থেকে যায়, একটি অবুঝ শিশুর মুখ দিয়ে তার মা সম্পর্কে এমন কঠিন কথা বলানোর কোনও যুক্তি নাই। মাকে বদলে ফেললে শিশুটির ভবিষ্যৎ কেমন হবে? লাড্ডু কি তার মায়ের ভূমিকা পালন করবে? যারা এই বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করেছেন জানি না এ ব্যাপারে তাদের যুক্তি কী? বিনীতভাবে তাদের একটা কথা বলতে চাই, মা ও সন্তানের সম্পর্ক নিয়ে কিছু প্রকাশের আগে ভালোমন্দ ভেবে নেবেন প্লিজ। শিশুর মুখে মা বদলানোর সংলাপ বড়ই অশোভন, বিব্রতকরও বটে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের নিয়ে নির্মিত একটি বিজ্ঞাপন দেশের প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে। বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায়, স্কুলে ক্লাসের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিশোর-কিশোরী ছাত্রছাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছে। হঠাৎ তাদের বয়সী কয়েকজন কিশোর ভোটকেন্দ্রে সন্ত্রাসী আচরণ শুরু করে। তারা ভোটদানে বাধা দেয়। তারপর সম্মিলিত প্রতিরোধে তারা পরাস্ত হয়। এই বিজ্ঞাপনটি নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কিশোর-কিশোরীদের মাধ্যমে ভোট প্রদানে সহিংসতা দেখানোর যুক্তি কী? শিশু কিশোরেরা কখনোই সহিংসতা ছড়ায় না। অথচ বিজ্ঞাপনচিত্রে তাদের সেভাবেই দেখানো হয়েছে।
শেষে বিনীতভাবে একটা কথা বলতে চাই। কাউকে বিব্রত করা অথবা কারও কাজের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আমার এই লেখা নয়। এ কথা মানতেই হবে, আমাদের দেশে ‘বিজ্ঞাপন সিনেমার’ মান অনেক উন্নত। ২০-৩০ সেকেন্ডের মধ্যে একটি পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের গুণগতমান বিজ্ঞাপন সিনেমায় সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরা চাট্টিখানি কথা নয়। এজন্য মেধার প্রয়োজন এবং মেধাবী মানুষেরাই তা করে দেখাচ্ছেন। দেশে এমন অনেক পরিবার আছে যারা টিভিতে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখার সুযোগ দিয়ে চঞ্চল প্রকৃতির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়াশুনায় মনোযোগী করেন। এই বাস্তবতায় ‘বিজ্ঞাপন সিনেমা’ নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের বোধকরি আরও একটু সতর্ক হওয়া জরুরি। আশা করি সংশ্লিষ্ট সকলে বিষয়টি ভেবে দেখবেন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো। 

/ওআর/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ