ভোটারের ইশতেহার

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:৫৪, ডিসেম্বর ২২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৬, ডিসেম্বর ২২, ২০১৮

তুষার আবদুল্লাহবাড়ির মেঝেতে, অফিসের টেবিলে ইশতেহার গড়াগড়ি খাচ্ছে। পড়ালেখা বাড়িতে বসে যতটুকু করি, মেঝেতে বইয়ের সঙ্গে লুটোপুটি খেতে খেতে পড়া হয়। এখন বইয়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে বিভিন্ন দলের ইশতেহার। আওয়ামী লীগের ইশতেহার এসেছে মলাট বন্দি হয়ে। ৮০ পাতায়  একুশটি বিশেষ অঙ্গীকার রয়েছে এতে। তরুণ সমাজকে উৎপাদনমুখী করা এবং প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটির  ইশতেহারে। ঐক্যফ্রন্ট তাদের ৩৫ দফা ইশতেহারে ১৪ টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার প্রতিশ্রুতি ছাড়াও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার ও বিকেন্দ্রীকরণ, মৌলিক অধিকার রক্ষায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানো, নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছে, পুলিশ ও সামরিক বাহিনী বাদে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য কোনও বয়সসীমা থাকবে না। ভিশন ২০৩০’-এর আলোকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার তৈরি করেছে বিএনপি। তাদের ইশতেহারে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, বিচার বিভাগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ ১৯ দফায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা ১৯ দফার অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, যুব নারী ও শিশু, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, জ্বালানি, তথ্য ও প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, বৈদেশিক ও প্রবাসী কল্যাণ, কৃষি ও শিল্প, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, প্রতিরক্ষা ও পুলিশ, আবাসন, পেনশন ফান্ড ও রেশনিং ফান্ড প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ, পররাষ্ট্র এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। জাতীয় পার্টি ১৮ দফা অঙ্গীকার নিয়ে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে। যেখানে বলা হয়েছে–আগামীতে ক্ষমতায় গেলে দেশের প্রশাসনিক, সরকার পরিচালনা ও নির্বাচনের পদ্ধতি বদলে দেবে তারা। ইশতেহারে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, সন্ত্রাস দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসেছে। ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের দুর্নীতি দূরসহ ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ও কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ইশতেহারের গুরুত্ব রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থীর ইশতেহার জানার জন্যও আমার আগ্রহ থাকে। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর বেশিরভাগই আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য বা ভোটের অলঙ্কার হিসেবে ইশতেহার ঘোষণা করে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের সময় দল ঘোষিত অঙ্গীকারের কথা প্রার্থী ও কর্মীদের অধিকাংশেরই অজানা থাকে। তারা এই বিষয়ে আগ্রহীও হন না খুব একটা। নিজ আসনে কোন কৌশলে ভোটে জিতবেন, সেই ছক কষতেই মনোযোগী থাকেন বেশি। ফলে দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের কাছে, নাগরিকদের জন্য যে ইশতিহার তৈরি করা হলো, তার সঙ্গে তাদের আত্মীক সম্পর্ক থাকে না। থাকে না বলেই ভোট পরবর্তী সময়ে ঘোষিত ইশতেহারের পাতা উল্টে দেখা হয় কমই। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই কতিপয় রাজনৈতিক কৌশল, স্বার্থ আছে। সেই স্বার্থ বাস্তবায়ন করতে যতটুকু দরকার, ইশতেহারের সেই যৎসামান্য অংশটুকুই তারা বাস্তবায়ন করে। এই বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষ দলটির সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক তফাৎকে স্পষ্ট করা।

এর বাইরে যে ইশতেহারের বিশাল ফিরিস্তি সেখানে ধূলো জমে যায়। আড়ালে পড়ে যায় ক্ষমতার অহংবোধে। ভোটে আবার সেই প্রতিশ্রুতিগুলো দফা হিসেবে উঠে আসে। প্রতিবারই ইশতেহারের প্রতিপাদ্য বা শিরোনাম বদল হয়। হয়তো দুই একটি বাক্য জনতার মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। যেমন এবার ঘুরে বেড়াচ্ছে– পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ছাড়া অন্য সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা থাকবে না। বলা যায়, ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির যৌথ ইশতেহার এটি। এই প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাস আর কতটা বিস্ময় থেকে জনমুখে, তা ভোটের বাজারই ভালো জানে।

জনগণ তার ন্যূনতম চাহিদার দেখা পেয়েছে। পথঘাট হয়েছে। বিদ্যুতের দুর্বিষহ দিন ফুরিয়েছে। বেড়েছে ক্রয়ক্ষমতা। সরকারের প্রণোদনায় বেড়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোক্তা। যদিও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার জন্য যে লালন-পালন, সেখানে ঘাটতি রয়ে গেছে অনেকটাই। কারণ সরকারকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে ‘বোয়ালদের’ টাকা জোগান দেওয়ায়। এই বোয়াল পুষতে হয়েছে আগের সরকারগুলোকেও। বোয়ালেরা আরও হৃষ্টপুষ্ট হওয়াতে পুঁটি মাছেদের মধ্যে সঙ্গত কারণেই আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আগামীতে সরকারে দায়িত্ব যারা নেবেন, তাদের উদ্যোগ নিতে হবে বোয়ালদের মেদ ঝরানোর। পুঁটি মাছেদের মনে-চোখে যে ভয়, তা দূর করতে আন্তরিক হতে হবে। সবচেয়ে বড় কাজটি করতে হবে সরকারের নিজেদের স্বার্থেই। তা হলো–তারা যে উন্নয়ন করবেন, সেই উন্নয়ন যেন সাধারণ মানুষ আনন্দে উপভোগ করতে পারেন। সেই জন্য বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি অধিকারের উন্নয়নের প্রতি আগামী সরকারকে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবেই। এটিই ভোটার বা আমজনতার পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নিবেদিত ইশতেহার।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ