লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিতর্ক

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ২০:২১, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪০, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮

সালেক উদ্দিনএবারের সংসদ নির্বাচন নিয়ে যেসব বিষয় মাঠ গরম রেখেছে, এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে— ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। বলতে দ্বিধা নেই, এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিষয়টি হঠাৎ করেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুরো ফিল্ড দখল করে ফেলতে চাইছে। কেউ বলছেন, বর্তমানে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে, কেউ বলছেন এর ছায়াটিও নেই।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিষয়টি  নতুন নয়। যখনই নির্বাচন আসে তখনই এ বিষয়টি জীবন লাভ করে। শুধু জীবন লাভই করে না, তরতর করে বেড়ে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও  বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল। তখন দশম সংসদের পঞ্চম অধিবেশনে (গত এপ্রিলে) সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দাবি প্রসঙ্গে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে বিএনপি যে কী বোঝাতে চাচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। নির্বাচনে আসার পর তারা  যদি পিছু হটার ছুঁতো খুঁজে লেভেল প্লেইং ফিল্ডের সুর তুলছে। এ সুরের পেছনে কোনও বেসুর বাজে সেটা বলা মুশকিল।

তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট-সমর্থিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রার্থীরা বলেছিলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সম্পূর্ণই ধাপ্পা।

এবারের সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও  জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে একই ধরনের অভিযোগ আসছে। ড. কামাল হোসেনসহ ঐক্যফ্রন্ট নেতারা ইসির কাছে বারবার অভিযোগ নিয়ে যাচ্ছেন। মিটিং করছেন। বলছেন, ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সারাদেশে তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। বিভিন্ন সভাসমাবেশে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তল্লাশির নামে তাদের বসতবাড়িতে তাণ্ডব চালাচ্ছে ও ক্ষমতাসীনদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে। ঢাকার অধিকাংশ এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মীদের নির্বাচনের মাঠে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। পোস্টার লাগাতে দেওয়া হচ্ছে না। লাগালেও তা ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। নির্বাচনি মিছিল থেকেও তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে পুলিশ। গায়েবি মামলায়ও জড়িয়ে দিচ্ছে।

এই ‘অনাচার’ বন্ধ করে নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবি প্রতিনিয়তই করে আসছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ।

শুধু আমাদের দেশে নয়। জাতীয় নির্বাচনের সময় সারা বিশ্বেই কাদা ছোড়াছুড়ি হয়। অতএব, নির্বাচনের সময়ে রাজনীতিকরা একজন আরেকজনের বিপক্ষে বলতেই পারেন। বলেও থাকেন। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সরকারি পক্ষ বলবে আছে, বিরোধী পক্ষ বলবে নেই। এটাই নিয়ম। এই নিয়মের ব্যতিক্রম ইতোপূর্বের বিএনপি সরকারের সময়ও হয়নি এখনও হচ্ছে না। কিন্তু যদি নির্বাচন কমিশনাররা এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে একজন আরেকজনের প্রতি আঙুল তোলেন, সেটা জাতির জন্য অকল্যাণকর হবেই বলতে হবে। সম্প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন,  ‘আমি মনে করি না নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু আছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটা এখন অর্থহীন কথায় পর্যবসিত হয়েছে।’ তার এই মন্তব্য ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য ব্যক্তিগত এবং এটি সত্য নয়।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে বর্তমানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে।’

এখানেই শেষ নয়। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কথার কঠোর প্রতিবাদ করে বলেন, তাকে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’ মর্মে মিথ্যাচার করার যে অপবাদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার দিয়েছেন, তাতে তিনি একজন নির্বাচন কমিশনারের অস্তিত্বে আঘাত করেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সব নির্বাচন কমিশনারই সমান। ইতোপূর্বেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন কটূক্তি করেছেন কিন্তু তিনি তার প্রতিবাদ করেননি। তবে তাকে নিয়ে মিথ্যাচার করার বিষয়ের প্রতিবাদ না করে পারলেন না। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে কিনা, তা সাংবাদিকরাই ভালো জানেন।

নির্বাচন কমিশনারদের এই ‘প্রকাশ্য মতবিরোধ’ মোটেই কাম্য নয়। দেশের মানুষ এমনটি আশা করে না। এই বিভক্তি আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটা উপকরণ হিসেবে কাজ করলেও করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে ২১ ডিসেম্বর সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনের অভিমত প্রকাশিত হয়। এতে তিনি বলেন, ‘ইসির ভেতরের বিতর্ক মানুষের আস্থা  কমায়।’ সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার উল্লেখ করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকায় তিনি আশান্বিত হতে পারছেন না। তিনিও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলেই মন্তব্য করেছেন। তবে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কতটা আছে, তা নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা ও নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের মধ্যে যে বিতর্ক হলো, সেটা এড়ানো উচিত ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেন, এসব বাদ-প্রতিবাদের কারণে নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা কমে আসতে পারে।

 নির্বাচনের আর অল্প কিছুদিন বাকি। দেশের মানুষ একটি সুষ্ঠু ও সর্বজনীন নির্বাচনের আশায় তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে আছে। তারা নির্বাচনি সংঘাতের অবসান চায়। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন চায়। নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে চায়। তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চায়। কারও কারণে তা যদি না হয়, এই নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে জনগণ তাকে কোনও দিন ক্ষমা করবে না, সে যে-ই হোক আর যে কারণেই হোক। নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্বের কারণেই হোক বা অন্য যেকোনও কারণেই হোক।

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটি বড় শর্ত হলো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবরই এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছেন। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে ভেতরে ও বাইরে থেকে তিনি বিতর্কে জড়িয়ে গেলেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন বারবার। 

আমরা তার এই দৃঢ়চিত্তের প্রত্যয়কে সাধুবাদ জানাই। দেশের মানুষ এর বাস্তবরূপ চায়। মানুষ চায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে আর বিতর্ক না করে তা নিশ্চিত করার জন্যে যা যা প্রয়োজন সেই সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তারা দেখতে চায় নির্বাচন কমিশন এমন সব স্বচ্ছ নিরপেক্ষ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে যেন ঠিক সময়ে শান্তিতে নির্বিঘ্নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে পারে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ