উন্নয়ন স্পৃহা

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:৪৩, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৬, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাআগামী ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের পর একটি নতুন বছর, নতুন সরকার। যদি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করে, তবুও এটি হবে একটি নতুন সরকার। আমরা এখনও জানি না, নতুন বছরে পরিচিত কথাবার্তাই হবে, নাকি চমকে দেওয়ার মতো সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে।
তবে আমাদের রাজনীতি বারবার নতুন কিছু শিখিয়েছে। মেরুকরণ, সমীকরণের আড়ালে আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতির নতুন সুবিধালোভী ও সুবিধাভোগীদের চিনতে পারাটা সম্ভবত এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। উন্নয়ন, দুর্নীতি এসব নিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির মুণ্ডুপাত জাতীয় রাজনীতির নিত্যকর্ম। পরপর দুইবার একই সরকার ক্ষমতায়, ফলে তাকে এবং সরকার প্রধানকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা সহজ।
ভোটের ফল বছরের পর বছর দেখলে ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দের ছক পাওয়া যায়। মানুষ শান্তি চায়। নির্বিঘ্ন জীবন চায়। রাজনীতিকরা তাদের আর কিছু না দিক, শান্তি দিক, উন্নয়ন দিক। গত দশ বছরে দেশের সবচেয়ে আলোচিত বা সর্বোচ্চ উচ্চারিত রাজনৈতিক শব্দ উন্নয়ন। সরকার বা সরকার সমর্থকরা যত জোরের সঙ্গে এ কথা বলেন, সরকার বিরোধীরা ততটা জোর দিয়েই এর বিরোধিতা করেন। হ্যাঁ, উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েই তো একটি দল বা জোট ক্ষমতায় আসে। কিন্তু সবাই উন্নয়ন করতে পারে না। গত দশ বছরে দেশ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে বিদ্যুতে। ২০০৮-এর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা এই খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে একের পর এক প্রকল্প হাতে নেন এবং সফল কুইক রেন্টাল প্রকল্প নেওয়ায় অনেকেই সমালোচনা করেছেন, কিন্তু পোশাক খাতসহ শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানেন তাদের বাঁচা-মরার লড়াই ছিল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। আজকে জিডিপি ও রফতানি প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনীতির সব সূচকের ঊর্ধ্বগতির কারণ এই বিদ্যুৎ।

অবকাঠামো খাতে বড় প্রকল্প, বড় স্বপ্নের জায়গায় নিয়ে গেছে দেশকে যেমন করে একাত্তরের বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙালিকে বড় স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন যে, আমরাও স্বাধীন ভূখণ্ডের মালিক হতে পারি। গত দশ বছরের উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা বলা যাবে, কিন্তু আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমার কাছে উন্নয়নের চেয়েও বড় বাস্তবতা মনে হচ্ছে, শেখ হাসিনাই প্রথম মানুষের মনে একটি উন্নয়ন স্পৃহা জাগাতে পেরেছেন, যা আগে কখনও জাগেনি। সবচেয়ে বড় সুফল হলো গরিব মানুষের মর্যাদার বোধ ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি। একেবারে সাধারণ মানুষদের মধ্যে সক্ষমতার ধারণা তৈরি হয়েছে এই উন্নয়ন স্পৃহার কারণে।  

রাজনীতির ভিতটাকেই বদলে দেওয়ার কৌশল দেশের এই উন্নয়ন পথে যাত্রা। শেখ হাসিনা জানেন মানুষের যতটুকু প্রয়োজন তা মিটাবার যোগ্যতা ও সম্পদ তাদেরই আছে। সরকার কেবল সেই পথটা তৈরি করবে। তিনি করেছেন। এরচেয়ে বেশি যেটা করেছেন, তা হলো বড় ব্যয়ের সাহস। আর এর ফলেই বেশি অপচয় বা বেশি দুর্নীতি হয়েছে বলে কথা উঠেছে। এ অভিযোগগুলোর একটা বড় কারণ একটি নিত্য পরিবর্তশীল মধ্যম শ্রেণির নিত্যনতুন লোভ তৈরি হওয়া। যদি ব্যর্থতা মাপতে চাই, তবে আমার কাছে এই মধ্যম শ্রেণির লোভের লাগাম টেনে না ধরতে পারাটাই সরকারের অনিবার্য অক্ষমতা বলে মনে হয়। এটাই বড় ব্যর্থতা।

আর্থিক খাত, পুঁজিবাজারসহ বেশ কিছু দৃষ্টান্ত আসবে, এবং আসাটাই স্বাভাবিক। আবার এ নিয়ে মত-দ্বিমতও আছে। সেই মতপার্থক্য স্থগিত রাখলে এই তথ্যটুকু অস্বীকারের তো কোনও উপায় নেই যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের দেশের উন্নয়ন ঘটেছে দ্রুততম গতিতে। অর্থনীতিতে সাংগঠনিক বদল ঘটেছে, দারিদ্র্য নিশ্চিত কমেছে। কৃষি প্রাধান্য পেয়েছে, গ্রামীণ অর্থনীতির কোনও দিনই এতটা স্বাস্থ্যবান চলৎশক্তি ছিল না, যা গত বছর দশ বছরে ঘটেছে। গ্রামের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতভাবেই গ্রামের অর্থনীতির উন্নতির ফলেই ঘটেছে। জনজীবনের প্রধান ধারা থেকে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতাকে অনেকটা আটকানো হয়েছে এই সময়ের ভেতর। দেশের টেলিকম খাত ও ইন্টারনেটে বিনিয়োগকে আন্তর্জাতিক নিরিখেও বিস্ময়কর বলা হয়, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল অনেক। আমাদের রাজনীতির বড় সমস্যা হলো উন্নয়নকে আর্থিক কেলেঙ্কারির উদাহরণ হিসেবে যতটা দেখা হয়, ততটা আলোচনা হয় না উন্নয়নের প্রভাব নিয়ে। যে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে, তার অবদানও এই সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণের কারণেই।

একথাগুলো বলার অর্থ কখনই এটা নয় যে, মহাজোট সরকারের ব্যর্থতার তালিকা দীর্ঘতর নয়। কিন্তু সেই দীর্ঘতর তালিকাই এসব সাফল্যকে নাকচ করে না। বরং প্রাধান্য দেয়। এই অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে পরিচিত মধ্যম শ্রেণির বদল ঘটেছে এক অকল্পনীয় গতিতে। বলতে পারেন এই নতুন উপ-মধ্যম শ্রেণির তুষ্টির জন্য সমস্ত আয়োজন যেন তৈরি হয়েছে দেশে। এরাই হয়তো শহুরে সংস্কৃতির আদলে সবকিছু ভোগ করে আবার সমালোচনার ডালি খুলে বসে আছে।

একটা কথা বলতেই হবে যে, সরকারের উন্নয়নের ও কর্মসূচির সঙ্গে দলের লোকদের সংশ্রব ততটা গঠনমূলক ছিল না, যতটা প্রত্যাশিত ছিল। শাসক দলকে কেন্দ্র করে একটি সুবিধালোভী ও সুবিধাভোগী মধ্যম শ্রেণি তাদের জাল বহুদূর পর্যন্ত বিস্তারিত করেছে, যাদের আচরণ বারবার সুশাসন ব্যাহত করেছে। সেয়ানা, লোভী, কৌশলী, সুযোগলোভী, সুবিধাভোগী উপ-মধ্যম শ্রেণি এদেশে সামাজিক ভিত্তি পাচ্ছে। রাজনীতির পরিসরে সরাসরি প্রবেশ করেছে উপ-মধ্যম শ্রেণি। এই শ্রেণি মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যায়, চিনে রাখা সম্ভবই নয়। এই উপশ্রেণি অনবরত ভাঙতে থাকে ও জোড়া লাগতে থাকে। আগামী রাজনীতি কি সেই শ্রেণিকে মোকাবিলা করে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে আরও সর্বজনীন করার দিকে এগুবে? দেখার অপেক্ষায়।  

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ