ভোটের হাওয়া, পরের ভাবনা

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:৫২, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৩, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকারএই লেখাটি যখন পাঠক পড়বেন তখন নির্বাচনের আর বেশি সময় বাকি থাকবে না। ভোটের হাওয়া তখন খুব তীব্রবেগে বইবে না। কারণ, ততক্ষণে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ। রাত পোহালেই ভোট। একদিকে উৎসবের আমেজ, অন্যদিকে কিছু সহিংসতা, কিছু শঙ্কা। তবে ৩০ ডিসেম্বর শান্তিপূর্ণ ভোট হবে বলে আমরা মনে করি। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে কিন্তু তাতে সামগ্রিক নির্বাচনি ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশের মানুষ ভোট পাগল অথবা বলা যায় তারা একদিনের ভোট-বাদশাহ। আমাদের সংবিধানে বলা আছে জনগণ দেশের মালিক। জনগণ আর কখনও এটা বুঝতে না পারলেও ভোটের সময় বা ভোটের দিন এটা বোঝেন। কারণ, ভোটপ্রার্থীরা একদিনের জন্য হলেও ভিখারির মতো আচরণ করেন। কাকুতি-মিনতি করে ভোটভিক্ষা করেন এবং ভোটাররা নিজেদের মালিক মালিক ভাবেন।
এবার ভোটের হাওয়া এবং বাজার দুটোই গরম। কারণ, এবার নির্বাচনে নিবন্ধিত ৩৯ দলের সঙ্গে অনিবন্ধিত কিছু দলও জোটের ব্যানারে নির্বাচন করছে অন্য দলের মার্কা নিয়ে। যেমন, জামায়াতে ইসলামী। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। কিন্তু জামায়াত এবার নির্বাচনে আছে প্রকাশ্যে দলের নামে আর কাগজপত্রে বিএনপির ধানের শীষ মার্কা নিয়ে। বিএনপি বলছে জামায়াত বলে এখন কিছু নেই, সব এখন বিএনপি। জামায়াতকে বিএনপি হিসেবে এভাবে গ্রহণ করা বিএনপির জন্য লাভজনক হলো কিনা, সে প্রশ্ন ভিন্ন আলোচনার বিষয়।  বিএনপির মার্কা নিয়ে জামায়াতের কেউ নির্বাচনে জিতলেও পরে তাদের আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে। তবে এটা মনে করা হচ্ছে যে,  আমাদের দেশের ভোটাররা নির্বাচনে সুবুদ্ধির পরিচয় দেবেন। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের ভোট দিয়ে জাতিকে কলঙ্কিত করবেন না।

নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, কথাবার্তা আছে। কোন দল বা কোন জোট জিতবে এবং সরকার গঠন করবে তা নিয়েও আছে পরস্পরবিরোধী মত। নির্বাচনের আগে ঐক্য গঠন এবং দল বদল নিয়ে যে ধরনের নাটকীয়তা হয়েছে, ভোটের ফলাফলে তেমন নাটকীয়তা থাকবে বলে মনে হয় না। আগের দিন দল বদল করে পরের দিন সে দল থেকে প্রার্থী হওয়ার একাধিক নজির এবার স্থাপিত হলেও রাতারাতি জার্সি বদলকারীরা ভোটে জিততে পারবেন কিনা সেটা দেখার বিষয়।

নির্বাচনে যারা জামানত বাজেয়াপ্ত হয় তিনিও মনে করেন তার চেয়ে জনপ্রিয় প্রার্থী আর কেউ নেই। প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই জয়ের আশা নিয়েই মাঠে নামেন। এবার আলোচনা যতটা না ব্যক্তিগতাবে প্রার্থী নিয়ে তারচেয়ে অনেক বেশি দল, জোট বা মার্কা নিয়ে। লড়াই মূলত নৌকা-লাঙল এবং ধানের শীষের মধ্যে। নির্বাচনি প্রচারণায় এগিয়ে নৌকা আর অভিযোগ করতে প্রথম স্থানে আছে ধানের শীষ।

বিএনপি এবং তার সঙ্গীরা এবার নির্বাচন করছে খুবই এলোমেলো এবং দায়সারা গোছের। বিএনপির ভেতরের কোন্দল এবং নির্বাচন নিয়ে মতভিন্নতার কারণে বিএনপি সংহত অবস্থায় দাঁড়াতে পারেনি। বিএনপি এতটাই নেতৃত্বহীন এবং দুর্বল অবস্থানে যে, তাদের কামাল হোসেন, রব, কাদের সিদ্দিকী, মান্নার মতো জনসমর্থনহীন নেতাদের খবরদারি মেনে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করতে হয়েছে। নির্বাচনে জেতা নিয়ে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের নেতারা গলাবাজি করছেন বটে কিন্তু মানুষ তাদের খুব গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হয় না।

যেকোনও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণে এটা স্পষ্ট যে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করবে। কয়েকটি জনমত জরিপের ফল থেকেও মহাজোটের বিজয়বার্তাই পাওয়া যাচ্ছে। শুধু বিএনপি এবং তার সমর্থকরা মনে করছেন ৩০ ডিসেম্বর দেশে ভোট বিপ্লব হবে এবং তারা জিতবে। আওয়ামী লীগ পালাতে দিশা পাবে না।

আমরা দুটো সম্ভাবনা ধরে নিয়েই কিছু আলোচনা করতে পারি আমাদের পরবর্তী আশা-প্রত্যাশা নিয়ে। প্রথমে ধরে নিতে হয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয় সম্ভাবনা। আওয়ামী লীগ এবার জিতলে একটি রেকর্ড তৈরি হবে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড আর কোনও দলের নেই। শেখ হাসিনাও হবেন টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। এটা গৌরবের এবং গর্বের।

আওয়ামী লীগ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য ভোট চেয়েছে। তারা পরবর্তী মেয়াদে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে তাতে কারো কোনও সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নতি হয়, দেশের মানুষ কিছু পায় বলে যে দাবি করা হয় তাতে যারা সন্দেহ প্রকাশ করে তারা বিশ্বক্রিটিক এবং নিন্দুক। তাদের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা অর্থহীন। এরা চোখ থাকতে অন্ধ। আওয়ামী লীগ পরের পাঁচ বছরে দেশকে উন্নয়নের এক ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যাবে তাতে অনেকেরই হয়তো বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।

আওয়ামী লীগ পরের মেয়াদের জন্য ১৯-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার ১৯-দফা নিয়ে খুব আগ্রহ-কৌতূহল নেই। নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের সুনাম আওয়ামী লীগের আছে। আগামীতেও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে আশা করা যায়। তবে ১৯-দফার দুটি দফার ব্যাপারে আমার আগ্রহ বেশি। এই দুটি দফা যদি বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে কিছু মানুষের মনে যে বিরূপতা আছে, সেটা দূর হবে। দফা দুটি হলো: তিন. ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ’ এবং আট . ‘গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করা’।

আওয়ামী লীগ আমলে অনেক উন্নতি যেমন হয়েছে তেমনি কিছু দুর্নীতি হয়নি, সেটা বলা যাবে না। আবার গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ একটু প্রতিবাদী এবং নেতিবাচক রাজনীতিতে উৎসাহী। উপনিবেশ ও সামরিক স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ঐতিহ্যের কারণে বিরোধিতার একটি প্রবণতা আমাদের মধ্যে আছে এবং অনেকের মধ্যে সেটা প্রবলভাবেই আছে। আমরা ‘হ্যাঁ’-এর চেয়ে ‘না’ বলতে বেশি পছন্দ করি। কাজেই কোনও যুক্তিতেই আমাদের এখানে সভা-সমাবেশ করার অধিকার সংকুচিত করা যাবে না। কাজেই উন্নয়নের নামে গণতন্ত্র সীমিত হতে দেখলে আমাদের অনেকের মধ্যে প্রয়োজনাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে।

আমাদের দুর্ভাগ্য এটা যে, দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও ক্রমাগত তারা এক ধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির ধারা অনুসরণ করে আসছে। হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি অগণতান্ত্রিক বিষয়গুলোর চর্চা তারা বন্ধ করতে পারে না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করতেও তারা কুণ্ঠিত হয় না। এই দলকে মোকাবিলা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগকেও কখনও কখনও এমন ব্যবস্থা নিতে হয়, যা আওয়ামী লীগের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যায় না।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কয়েকটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দেশে চালু হয়েছিল তা দূর করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে কোনও দিন সম্ভব হতো না। অতো বড় দুটি কাজ, যা অনেক ঝুঁকি নিয়ে করতে হয়েছে, করার পরও মানুষের মনে কাঙ্ক্ষিত তুষ্টি নেই। কারণ, দেশে বিচারের ক্ষেত্রে এক ধরনের শিথিলতা মানুষ দেখতে পাচ্ছে। ‘আইন সবার জন্য সমান’- এই কথা মুখে উচ্চারিত হলেও বাস্তবে তা ঘটতে দেখা যায় না।  আলোচিত কিছু হত্যাকাণ্ডের কোনও কিনারা না হওয়ায় মানুষ ক্ষুব্ধ। এরমধ্যে সাগর-রুনী হত্যা, নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা এবং কুমিল্লার তনু হত্যার কথা মনে পড়ছে। সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ বড় অন্যায় করলেও আইন তাকে ছুঁতে পায় না। বিরোধী মতের বেলায় আবার আইনের সক্রিয়তা দেখা যায়। দুষ্ট গরু পালন করার চেয়ে ভালো হবে গোয়াল শূন্য রাখা।

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে ঘুষ-দুর্নীতির প্রকোপ বেড়েছে তা অস্বীকার করার রীতি পরিবর্তন করতে হবে। দেশে এমন কোনও খাত ও ক্ষেত্র নেই, যেখানে দুর্নীতি হয় না। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘুষ-দুর্নীতির নানা মুখরোচক গল্প ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া কোনও দুর্নীতি-অনিয়ম হয় না বলে মানুষ বিশ্বাস করে। সে জন্য মানুষের প্রত্যাশা, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসনের বিষয়ে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটুক। আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মীর নামে নানা ধরনের অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে যেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইন যেন কোনোভাবেই মাকড়শার জালে পরিণত না হয়।

কোনও বাস্তব সম্ভাবনা না থাকলেও বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের দাবি মোতাবেক যদি ৩০ ডিসেম্বর দেশে ‘ভোট বিপ্লব’ হয় এবং বিএনপি জোট সরকার গঠন করে তাহলে তাদের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা কী? নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপিও অনেক সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপির অতীত রেকর্ড ভালো না। তারা সরকারে থাকতে মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ প্রশ্রয় পায়। এবারও যদি তারা অতীতের ধারা থেকে বের হয়ে আসতে না পারে তাহলে দেশ ভয়াবহ এক অন্ধকারের মধ্যে পড়বে। কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিএনপির মার্কা নিয়ে নির্বাচন করছে। ঐক্যফ্রন্ট আগের দিন একটি নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার পর দিনই বিএনপি আলাদা একটি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। দুই ইশতেহারে মিলও যেমন আছে, তেমনি বড় অমিলও আছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার কথা বলা হলেও বিএনপির ইশতেহারে তা নেই। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন আসে, ঐক্যফ্রন্ট ভোটে জিতলে কোন ইশতেহার বাস্তবায়ন করবে? কামাল হোসেন যেটা ঘোষণা দিয়েছেন সেটা, নাকি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেটা দিয়েছেন, সেটা?

বিএনপি এখন ঐক্যফ্রন্টেও আছে, জামায়াতেও আছে। বিএনপির ওপর যে জামায়াতের প্রভাব বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নির্বাচনে জিতলে বিএনপি কতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠবে তা নিয়ে অনেকেই আতঙ্কে আছেন। অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়।

বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে তীব্র মতবিরোধ আছে। নির্বাচনে পরাজিত হলে, যেটা হওয়ার সম্ভাবনা সব হিসাবেই বেশি, বিএনপি কি কোনও সহিংস আন্দোলনের পথে যাবে? যে কোনও হঠকারিতা বিএনপির জন্য হবে আত্মঘাতী। বিএনপি ন্যায়সঙ্গত এবং নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে না হাঁটলে দলের জন্যই সমস্যা বাড়বে।

৩০ ডিসেম্বর সারা দিন দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাক, মানুষ নির্বিঘ্নে-নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক এবং ভোটের পরও দেশে শান্তি বজায় থাক, সবার জীবন নিরাপদ হোক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়, আমাদের অর্থনীতি এবং আওয়ার টাইম।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ