নতুন অর্থমন্ত্রী যিনি হবেন

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:৪৭, জানুয়ারি ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৮, জানুয়ারি ০২, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজানির্বাচন শেষে সরকার গঠিত হবে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। কে হবেন অর্থমন্ত্রী? পরিকল্পনায় এখন আছেন আ হ ম মোস্তফা কামাল, তিনি কি চলে আসবেন অর্থে, নাকি দুটোরই দায়িত্বে থাকবেন? বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন নির্বাচন করবেন শুনে অনেকই ভাবছিলেন তিনিই হবেন অর্থমন্ত্রী যদি দল জেতে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন করেননি, তবে টেকনোক্র্যাট কোটায় হবেন কিনা জানা নেই। সিলেট-১ আসন থেকে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ছোট ভাই ড. এ কে মোমেনও নিশ্চয়ই চাইবেন কিছু একটা। ভাইকে কাজ করতে দেখেছেন এবং নিজেও অর্থনীতিরই মানুষ। ভাবনার মধ্যে এও আছে যে, প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানও একজন দাবিদার এই পদের।
যিনিই দায়িত্ব পান না কেন, এটি হবে খুব হবে চ্যালেঞ্জিং। অর্থবছরের আর পাক্কা ছয় মাস আছে, বাকি আছে অনেক কাজ। তবে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য ভাবতে হলে, বিদায়ী অর্থমন্ত্রীর সময়টা ঘুরে আসা প্রয়োজন। দেশের মানুষ কতটা ভালো থাকবেন, তা জিডিপি’র ওপর নির্ভর করে না। দেশে মাথাপিছু কত টাকা আয়, মানুষের ভালো থাকা নির্ভর করে তার ওপর। গত দশ বছরে জিডিপি বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, বাংলাদেশ অনুন্নত দেশে উন্নয়শীল দেশের পথে যাত্রা করেছে, শিক্ষায় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু তবুও অসংখ্য মানুষ এখনও নিরক্ষর আছে, থাকার মতো বাড়ি নেই তাদের, পানির ব্যবস্থা নেই, শৌচাগার নেই, কাজ নেই, তাই আয় নেই।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৯-এ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাত শতাংশের ওপরেই থাকবে। বাংলাদেশ ২০৭টি দেশে নানা পণ্য রফতানি করে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আয় করেছে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার। আর এসবই সম্ভব হচ্ছে দেশের কর্মক্ষম মানুষের সৃজনশীলতায়। জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের গড় বয়স ৩০-এর নিচে। ধারণা করা হয় বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার ৪৭ শতাংশ। এর অর্থ হলো মানবসম্পদের একটা বড় অংশই কাজের বাইরে থাকছে। প্রতি বছর ২০ লাখের বেশি মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে বেকার সমস্যাকে চলমান রাখছে। নতুন অর্থমন্ত্রী তথা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ এই বিপুল সংখ্যক তরুণের জন্য কাজের ব্যবস্থা করা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে থাকলেও অক্টোবরে খাদ্যপণ্যের দাম কমে যাওয়ায় তা নেমে ৫.৪ শতাংশে নেমে আসে। তবে নতুন বছরের জন্য কিছু আশঙ্কা আছেই। খাদ্যবহির্ভূত জিনিসের দাম বাড়তি আছে অনেক দিন ধরে। আমদানিকৃত গ্যাসের চড়া দাম, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি আর স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় মূল্য হ্রাসের ফলে সেবা ও পরিবহন খাতে দাম বাড়বে, যা এ বছর মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিগত দশটি বছরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও বাংলাদেশের মানুষ সেই সুবিধা পায়নি। এখন বাড়ার কারণে যদি আবার বাড়ানো হয়, তবে তা হবে জুলুমের মতোই।

২০১৭ সালে বন্যার কারণে বড় অংক ব্যয় হয়েছে খাদ্য আমদানিতে, যার প্রভাব পড়েছে আমদানি-রফতানির বাণিজ্য ভারসাম্যে। সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ছিল ৩১.৯ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ৮ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান। অর্থমন্ত্রীর জন্য ভাবনা হবে সঞ্চয়ের স্থিতি ধরে রাখা।

একটি দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর, রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষমতার ওপর। রাজস্ব কীভাবে বণ্টিত হবে, সেটাও জরুরি প্রশ্ন। ভ্যাট নামের পরোক্ষ করের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা যে সাধারণ মানুষের জন্য নিবর্তনমূলক একথা হয়তো অর্থমন্ত্রী মুখে না বললেও স্বীকার করবেন। বহুবার চেষ্টা করেও নতুন ভ্যাট আইন চালু করতে পারেননি তিনি। ব্যবসায়ী সমাজের কাছে তাকে পরাজিত হতে হয়েছে। নতুন বছরে তা পারবেন কী নতুন অর্থমন্ত্রী? দেখার অপেক্ষায়।     

আমাদের সমস্যা হলো, দেশে যাদের সরকারি ভর্তুকি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের মধ্যেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সর্বাধিক। জোর করে জন্মনিয়ন্ত্রণও করা যাচ্ছে না চীনের মতো। আমরা সাধারণভাবে বলার চেষ্টা করি যে, শিক্ষার প্রসার ঘটলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিজে থেকেই কমে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি খুব বেশি ধীর। সেই ভরসায় থাকলে বহু বছর লাগবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে দৃঢ়ভাবে নামতে হবে এখনই। নতুন অর্থমন্ত্রীর ভাবনায় নিশ্চয়ই থাকবে কীভাবে এই কাজে তিনি আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা করবেন অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সমস্যা ছিল অবকাঠামোর অভাব। গাড়ি চলার মতো রাস্তা নেই, যথেষ্ট বিদ্যুৎ নেই। শুধু এই দুটির ব্যবস্থা করা গেলে কোনও বাড়তি সরকারি সাহায্য বা উদ্যোগ ছাড়াই অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসা সম্ভব। শেখ হাসিনা দশটি বছরে সেটিতে সাফল্য পেয়েছেন। কিন্তু তবুও অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশন কমানো যাচ্ছে না। গ্রাম থেকে মানুষ কাজের সুযোগের সন্ধানে শহরে আসছে। এই সমস্যা সামাল দেওয়ার একটাই উপায় গ্রামকেই উন্নত করা। আশার কথা আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনে ইশতেহারের প্রধান দর্শনই করেছে ‘আমাদের গ্রাম, আমাদের শহর’ নাম দিয়ে। দ্রুতগতির গণপরিবহনের ব্যবস্থা বড় পরিবর্তন আনবে অর্থনীতিতে।

মুহিতের দশ বছরে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি, টাকা পাচার এবং কেলেঙ্কারির পর পুঁজি বাজারে ধস নামা। ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেহারা ফিরিয়ে আনতে হলে সংস্কারের দিকে হাঁটতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে সরকারের উচিত হবে যত দ্রুত সম্ভব অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত শাখা বিলুপ্ত করা। এর মাধ্যমেই নগ্নভাবে আর্থিক খাতে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হচ্ছে এবং হলমার্ক বা বেসিক ব্যাংকের মতো বড় কেলেঙ্কারি ঘটেছে।

অবকাঠামো খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ বেশি প্রত্যাশিত। নতুন অর্থমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ সেই কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ গতি ফিরিয়ে আনা, যা কর্মসংস্থানে অবদান রাখবে।    

সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের উন্নয়নের দায়িত্বটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে বাড়তি রাজস্ব জোগাড় করতে হবে। যারা যথেষ্ট আর্থিক সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও করের আওতার বাইরে, তাদের করের আওতায় এনে এই বাড়তি রাজস্বের একটি অংশ জোগাড় করা যায়। আর এসবই সম্ভব হবে অর্থমন্ত্রী যদি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হন, সাহসী সংস্কারের পথে হাঁটেন।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ