বইয়ের গন্ধে ঘুম আসে না…

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৮:১৩, জানুয়ারি ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৫, জানুয়ারি ০৫, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনবছর শেষে নির্বাচন আর ফলাফল নিয়ে পায়চারি ৩০’র মধ্যরাত পর্যন্ত। মাঝখানে মোটে কাটলো চোখ বন্ধ করার আধাবেলা। আবার ৩১’র বেলার কিছুটা কৈশোর থেকেই নতুন পরিকল্পনা নতুন বর্ষবরণের রাতকে নিয়ে। বাংলাদেশেও বাসা বাড়িতে এখন বেশ জোরেশোরেই পালন করা হয় থার্টি ফার্স্ট। রাত থেকেই ইনবক্সে জমা হতে থাকে বিভিন্ন বানী, ছবি, ভিডিওতে মোড়া নতুন বছরের শুভেচ্ছা। ফোনে আসে শত শত বার্তা। এক সময়ে বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের কল্যাণে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের জন্মদিনই বছরের প্রথম দিন হওয়ায় ফেসবুকেও লেগে থাকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর হিড়িক। সবই হলো বড়দের নতুন বছরকে গ্রহণের তরিকা।
তবে সব কিছু ছাপিয়ে বছরের প্রথম দিনটিতে আমার চোখ আটকে যায় নতুন বই জড়িয়ে ধরা বাচ্চাদের ছবিতে। নতুন বই আনতে দৌড়াচ্ছে, স্কুলে স্কুলে উৎসব হচ্ছে, কেউ কেউ বই পেয়ে খুশিতে বই জড়িয়ে বাড়ি ফিরছে। নিজের মধ্যেই কেমন যেন আনন্দ লাগে। আচ্ছা ওরা কি নবান্নের মতো নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিচ্ছে? ওরা ঝকঝকে বই নিজেদের বুকেই জড়িয়ে রাখছে, না জানি আবার বইয়ে ময়লা লেগে যেতে পারে! কেউ কেউ আরও এগিয়ে গিয়ে বইটি খুলে পড়া শুরু করেছে। খুব ছোটরা বই খুলে ছবি দেখছে, অপরকে দেখাচ্ছে। বই নিয়ে ছোটদের এই উচ্ছ্বাস আমাকে নাগর দোলার চরকিতে চড়িয়ে নিয়ে যায় আমার শৈশবে। আমি নিশ্চিত বই উৎসবের ছবি দেখে আমার মতো অনেকেরই মনে পড়ে যায় আমাদের ছোটবেলার কথা।

আমাদের সময় এই উৎসব ছিল না, নতুন বই পাওয়াও এতটা সহজ ছিল না। আমরা পাড়ার ওপরের ক্লাসে পড়া বড় ভাই-বোনদের কাছে আগে থেকেই আর্জি পেড়ে আসতাম। সেই অনুরোধের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছিল, কে কার আগে সেই বই নেওয়ার কথা বলে আসবে। সেই পুরনো বই পেয়েই আমরা খুব যত্ন করে গেলো বছরের পুরনো ক্যালন্ডারের পাতা দিয়ে মলাট বেঁধে বইগুলোতে নতুন জামা পরাতাম। তাতে ছেঁড়া মলাট কিংবা মলাটবিহীন বইটি কিছুটা নতুন দেখাতো। কখনও কখনও বাজারের বইয়ের দোকান থেকেও পুরনো বই কেনা হতো। কোনও কোনও পরিবারে সেই পুরনো বইগুলোর যক্ষের ধনের মতো আরও যত্ন করতো, আরও ছোট বয়সী বাচ্চাদের জন্য। মফস্বল শহরগুলোতে তখন ২/৩ টার বেশি বইয়ের দোকানও ছিল না। বাজারে নতুন বই আসতে অনেক দেরিতে। এমনকী মফস্বল শহরগুলাতে সেটি পৌঁছাতো অর্ধ সাময়িক পরীক্ষার কাছাকাছি সময়ে কিংবা আরও পর।

তাই নতুন বর্ষে যতসব ছবি আমার চোখের সামনে ভাসে তারমধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হলো এই নতুন বইয়ের ছবি। শিশুদের নববর্ষের খুশি আসে এই বই পাওয়া নিয়ে। প্রত্যেকেই দৌড়ে স্কুলে যায় বই আনতে। বিশ্বের হয়তো অনেক দেশেই বাংলাদেশ থেকে বই বেশি ছাপায়। জনসংখ্যার বিবেচনায় ভারতেই হয়তো এর চেয়ে বেশি বই ছাপায়। তবে সরকারিভাবে এত বই ছাপিয়ে বাঁধাই করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর হাতে বছরের প্রথম দিনে বিতরণের ইতিহাস বিশ্বের কোথাও নেই। বাংলাদেশের ২০১০ থেকে বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মাঝে বই পৌঁছে দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সফলতার অনন্য রেকর্ড করেছে। সে সময় থেকেই ধারাবাহিকভাবে এ উৎসব উদযাপনের ফলে এটা এখন সর্বজনীন উৎসবের রূপ পেয়েছে। এনসিটিবির তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জন্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ৪ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য মোট ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২টি বই ছাপানো হয়েছে। এ জন্য খরচ পড়ছে প্রায় ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা। দেশজুড়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও দাখিল, ভোকেশনাল ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে। প্রথম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যের নতুন পাঠ্যবই পৌঁছোনা শুরু হয়েছে।

শিক্ষা সুযোগ নয়, এটি মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার, পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা এখন সার্বজনীন, অর্থাৎ বিনাখরচে সব শিশুর জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেজন্য আগে প্রতি বছরের শুরুতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক ক্লাসের ছাত্রদের বিনামূল্যে নতুন একসেট বই বিতরণ করা হতো এবং তার সঙ্গে আছে উপবৃত্তি। কিন্তু এখন তা আরও সম্প্রসারিত করে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়ে থাকে। বছরের শুরুর প্রথম দুই দিন এই উৎসব চালু থাকে। বছরের প্রথম দিন যদি কোনও শিক্ষার্থী বই না পায় তাহলে যেন দ্বিতীয় দিন নিতে পারে এই জন্য এই উৎসবের মেয়াদ দুই দিন রাখা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যদি জানুয়ারি মাসের প্রথম তারিখ কোনও বন্ধের দিন হয়, তারপরও সেদিনই বই উৎসব হবে। বন্ধ থাকলেও সেদিন সব প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে।

এই বছরও বই উৎসব হলো। আমাদের সব স্কুল ঢাকার মতো নয়। অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রাইমারি এবং হাইস্কুল রয়েছে। সেইসব স্কুল বই পৌঁছালো কিনা, সব শিক্ষার্থী বই পেলো কিনা? সব স্কুল একইভাবে এই বই উৎসব করতে পারলো কিনা– এসব বিষয়ে হাল নাগাদ তথ্য আমরা জানি না। আমরা এও জানি না এদেশে কত শিশু এখনও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত আছে। আমরা শুধু জানি প্রাথমিক পাস কত, জিপিও ফাইভ কত, শিক্ষিতের হার কত। আর এই শিক্ষিতের হারও ধরা হয় যাদের অক্ষর জ্ঞান আছে এবং তারা নিজের নাম লিখতে পারে। কেন এখনও স্কুলপড়ুয়া সব শিশু স্কুলে যেতে পারে না সেই বিষয়ে আমাদের কোনও তথ্য নেই, তাগাদাও নেই। উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই উপবৃত্তি দরিদ্র শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা সেটির কোনও মনিটরিং নেই। কত শিশু এখনও প্রাথমিক শিক্ষা বঞ্চিত আছে এবং সেটির কারণসহ প্রকাশ করা এই মুহূর্তে বড় দরকার।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  zobaidanasreen@gmail.com

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ