আমাদের প্রবীণ মানুষেরা

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ১৫:২৬, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩০, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯

ইকরাম কবীরআলোচনা হলো। তারপর সিদ্ধান্ত হলো যে আমরা দেশের প্রবীণ মানুষদের জীবন মান উন্নয়নে জন্য কিছু (কাজ)করবো কোনও এক প্রবীণ নিবাসে গিয়ে। শুনে অত্যন্ত ভালো লাগলো। মনটা ভরে গেলো। তবে সমস্যা হলো সারা দেশের প্রবীণদের জীবনযাপন সম্পর্কে আমরা আদতে কিছুই জানি না। বয়স্ক মানুষদের মনে করার বা মনে রাখার জন্য একটি আন্তর্জাতিক দিবস আছে। সে দিনে বেশ ক’জন গণমাধ্যমকর্মী প্রবীণ নিবাসে গিয়ে কিছু মন খারাপ করা প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেগুলো আমরা কেউ পড়ি, বেশিরভাগই পড়ি না।
আমি নিজে যেসব প্রবীণ মানুষকে আমার আশে-পাশে দেখেছি তা আমার বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, খালা-মামা, চাচা-চাচী এবং বন্ধুদের বাবা-মা। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এই আশপাশের বয়স্ক মানুষগুলোর জন্য সাধ্যমতো অনেক কিছুই করেন। আমাদের কাছের প্রবীণ মানুষদের জীবনে অনেক কিছুর অভাব থাকতে পারে; থেকেই যায়; কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের দেশের বাস্তবতায় তার অনেকটাই পূরণ করেন তাদের ছেলেমেয়েরা, নাতি-নাতনিরা। কিন্তু যারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে, কিংবা বাড়ির অভাবে দূরে কোনও নিবাসে গিয়ে থাকেন, তাদের সম্পর্কে তো আমাদের জানা নেই। কোনও দিন কোনও নিবাসে যাইনি। তারা সেখানে কেন যান, কী তাদের চাহিদা– এসব কিছুই জানি না। কিছু না জেনে তাদের জন্যে কিছু করা ঠিক হবে না ভেবেই একটি প্রবীণ নিবাসে গিয়ে তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলাম।

শহরে বেশ ক’টি এমন নিবাস আছে। সঠিক জানি না; খবরই রাখি না। তবে আমাদের মনে হলো শহরের বাইরে গিয়ে দেখে আসতে হবে। শহরে হয়তো অনেক চাকচিক্য দিয়ে এই নিবাসগুলো ভরপুর থাকে, কিন্তু শহরের বাইরে তা হওয়ার সম্ভাবনা কম। ঠিক করলাম শহরের আশপাশে কোনও নিবাস থাকলে সেখানে যেতে হবে। পেয়েও গেলাম। গাজীপুরে। যোগাযোগ করে দেখতে যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। তাও পেলাম।

সেখানে গিয়ে আমাদের প্রবীণেরা ভাত-কাপড়ে কেমন আছেন তা পরে বলি। ভাত কাপড়ে কেমন আছেন তার চেয়ে বেশি জানার ইচ্ছে ছিল তারা কেন সেখানে গিয়েছেন। কিছুটা আবছা ধারণা ছিল। একবার অনেক বছর আগে– ১৯৯৯ সালে শহরের ‘প্রবীণ হিতৈশী সংঘ’র ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে কিছুটা জেনেছিলাম। এ অনেক আগের কথা।

শহরের প্রবীণ নিবাস অন্যরকম। সেই সময় যাদের কেউ নেই তাদের সংখ্যা সেখানে ছিল কম। যারা ছিলেন তাদের বেশিরভাগেরই সন্তানেরা ছিলেন দেশের বাইরে– বিলেত-আমেরিকায়। সন্তানেরা কাছে না থাকার অর্থই ছিল একাকিত্ব। অমোঘ একাকিত্ব। এটুকু জানতাম। এর বেশি নয়।

গাজীপুর গিয়ে যা দেখলাম, জানলাম– তা মনকে নাড়া দিল একটু অন্যরকমভাবে।

পৌঁছে দেখি সবাই দুপুরের খাবার খাচ্ছেন একসঙ্গে একটি বড় ডাইনিং হলে বড়-বড় টেবিলে সারি-সারি বসে। খাওয়ায় মগ্ন। কেউ-কেউ তাকিয়ে আমাদের দেখলেন। কিন্তু পরক্ষণেই খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছেন না; সবার চোখ খাদ্যবস্তুগুলোর দিকে। মনে পড়ে গেলো ক্যাডেট কলেজের দিনগুলোর কথা। এমনই সারি-সারি চেয়ার-টেবিলে বসে ডাইনিং হলে খেতে বসতাম। খাওয়ার সময় কোনও দিকে তাকানো নয়; দৃষ্টি শুধুই খাবারের দিকে। তফাৎ শুধু– আমরা ছিলাম ত্বরিৎকর্মা কিশোর-যুবা; এরা সবাই বৃদ্ধ। নড়া-চড়া করতে যাদের কষ্ট হয়, তাকাতেও যাদের কষ্ট হয়, সে কষ্ট কিশোর-যুবা’রা বুঝবেন না।

কিশোর-যুবাদের কথা বাদই দিলাম। বড়রাই কী বোঝেন? এই নিবাসে গিয়ে তাই-ই বুঝলাম।

সেখানে পেলাম প্রায় দু’শ আঠারো জন নারী-পুরুষকে। একদিকে থাকেন পুরুষেরা এবং আরেক দিকে নারীরা। এরা সব শ্রেণির মানুষ। সমাজের সব স্তর থেকে এসেছেন। হত-দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত– সবাই। বিত্তের অধিকার এরা সবাই হারিয়েছেন; বিত্তের শ্রেণিবিন্যাস আর এদের মনকে নাড়া দেয় না। মনকে তো নয়ই।

এদের কেউ নেই। কারো-কারো সন্তানেরা আছেন। তবে তারা থেকেও নেই। এমন অনেকে আছেন যাদের ছেলেমেয়েরা জোর করে নিবাসে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনেকে আছেন যাদের সন্তানেরা বাবাকে বা মাকে নিবাসের কাছাকাছি এসে রাস্তায় ঠেলা দিয়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছেন। এদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা বড়-বড় ব্যাংকে-অফিসে কাজ করতেন, যারা সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন, বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করতেন, সরকারি কোম্পানিতে কাজ করতেন।

তারা আজ একা। কেউ তাদের আজ কাছে চান না। তারা আজ বোঝা– সন্তানদের বোঝা, প্রতিবেশীর বোঝা, সমাজের বোঝা, রাষ্ট্রের বোঝা। তবে এই মানুষগুলোই একসময় সন্তানের সেবা করেছেন, আত্মীয়দের সেবা করেছেন, নিজেদের বাবা-মায়ের সেবা করেছেন, প্রতিবেশীর বিপদের এগিয়ে গেছেন, সমাজের কাজ করেছেন, সরকারের কাজ করেছেন। আজ তারা এই প্রবীণ নিবাসে না গেলে দেখার কেউ নেই। কেউ তাদের দেখতেও চায় না। সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে এতই ব্যস্ত যে এই মানুষগুলো নিজেরা না চাইলেও দূরে চলে যেতে হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক দেশে প্রবীণ মানুষদের জন্যে অনেক রকমের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তাদের জীবন ও সম্পদ সংরক্ষণ, জীবনযাপনের মূল চাহিদা পূরণ, সন্তান কর্তৃক পিতামাতার অবহেলায় শাস্তির বিধান, গণপরিবহনে আসন সংরক্ষণ ও কম ভাড়া নেওয়া, ব্যাংক, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ও হ্রাসকৃত মূল্যে সেবা প্রদান এবং বিভিন্ন স্থানে তাদের জন্য আলাদা হাসপাতাল ও প্রবীণ নিবাস স্থাপন করা তার মধ্যে অন্যতম।

আমরা আমাদের দেশে ১৯৯৮ সাল থেকে অসচ্ছল সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য বয়স্ক ভাতা দিয়ে আসছি। একটি হিসেবে বলা হচ্ছে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৩০-৪০ লাখ প্রবীণ ব্যক্তি মাসে ৫০০ টাকা হারে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। একজন প্রবীণ ব্যক্তি মাসে ৫০০ টাকা দিয়ে আসলে কেমন করে মাস চালাবেন তা ভাবলে হাসি পায়। এমনিতেই এনারা সমাজে নিগৃহীত। তাদের সারা জীবনের জমানো অর্থ নিজেদের কাজে লাগে না; নানাভাবে তাদের নিজেদের অর্থ ছেলেমেয়েদের জন্য খরচ করেন; তারপর তাদের হাতে ছেলেমেয়ের ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। তারপর সেই ছেলেমেয়েই তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে চান না।

আমাদের বেশিরভাগ প্রবীণ মানুষেরাই প্রবীণ নিবাসে গিয়ে বসবাস করতে চান না। তারা তাদের সন্তানদের সঙ্গেই থাকতে চান। তাদেরই কাছে চান। পাছে লোকে যদি কিছু বলে? এ চিন্তা করে তারা যেতে চান না। তারা গেলে যদি প্রতিবেশী তাদের সন্তানদের নিচু চোখে দেখেন? আবার বাংলাদেশে যত সংখ্যক প্রবীণ নিবাস আছে তা আমাদের প্রবীণ জনসংখ্যার জন্য যথেষ্ট নয়।

অনেকেই মনে করেন এসব নিবাসে একা-একা সময় কাটে, কিছুই করার নেই। শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা। আসলে এই নিবাসগুলোতে অনেক কিছু করার আছে। তা আমাদের চিন্তা করে আবিষ্কার করতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি প্রবীণ নিবাস একটি শুভ ধারণা। আমরা সবাই এখনও প্রবীণ নিবাসে বসবাস করা পছন্দ না করতে পারি, তবে এটিই হচ্ছে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতা। প্রতিনিয়ত সমাজ পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে আমাদের যে জীবন কাটানো সম্ভব ছিল, তা আমাদের সন্তানদের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। এই বাস্তবতাটি আমাদের মেনে নেওয়া প্রয়োজন। বলা হচ্ছে ২০৫০ সালে দেশে প্রবীণদের সংখ্যা দাঁড়াবে চার কোটি। তখন ওই মানুষগুলোকে নিয়ে আমরা কী করবো? তাদের কী বলবো? তাদের দেখাশোনা করার জন্য কি আমরা তৈরি? তাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার কথা কি আমরা এখন চিন্তা করছি? এখন যে মানুষটির বয়স ত্রিশ, ২০৫০ সালে তিনিই হবেন প্রবীণ। তখন তিনি কার কাছে, কোথায় থাকবেন তা নিয়ে কেউ কি চিন্তা করছি?

এর উপযুক্ত উত্তর হতে পারে প্রচুর সংখ্যক প্রবীণ নিবাস তৈরির পরিকল্পনা করা। সরকার তো অনেক প্রকল্প হাতে নেয়। আগামী দশ বছরে দেশের সবক’টি জেলায় একটি করে প্রবীণ নিবাস নির্মাণ করার কাজ হাতে নেওয়া সরকারের জন্য এমন কঠিন কিছু নয়। আমাদের দেশে সরকার-চালিত ৮৫টি শিশু পরিবার আছে। সেগুলো খুব সুন্দর করে সরকারের পক্ষে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমি মনে করি আমাদের রাষ্ট্র ৬৪টি জেলায় প্রবীণ নিবাস তৈরি করে সেগুলো চালিয়ে যাওয়ার অর্থেরও আয়োজন করতে পারবে।  

আবার, দেশে বিত্তবানের সংখ্যাও বাড়ছে। দেশে অনেক প্রবীণ ধনী আছেন বা থাকবেন যারা অর্থের বিনিময়ে প্রবীণ নিবাসে শেষ বয়স কাটাতে পারেন। প্রবীণ নিবাস একটি ব্যবসা হিসেবেও ভেবে দেখা যেতে পারে। দেশে বেসরকারি খাতে অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা সামাজিক উন্নয়নে বেশ অবদান রাখছেন; তারা দেশে আরও প্রবীণ নিবাস তৈরির কাজে অর্থায়ন করতে পারেন।

একটি বিষয় অনুমান করতে পারি যে সেই অর্থ ব্যয় বৃথা যাবে না। সর্বোপরি, প্রবীণ নিবাসে গিয়ে বসবাস করার ধারণাটি জনপ্রিয় করতে হবে, তাহলে চাহিদা তৈরি হবে এবং নিবাসের সংখ্যা বাড়বে। আমার এই প্রস্তাব এখন শুনতে খারাপ লাগতে পারে, কিন্তু একটু ভেবে দেখুন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতায় এটিই সম্ভাব্য সমাধান। না হলে ভবিষ্যতেও আমাদের প্রবীণদের জন্য দুঃখের গল্প লিখে পাতা ভরতে হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আমাদের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্যে কিছু করবে বলে বলেছে কিনা আমার জানা নেই। আওয়ামী লীগকে কিছুটা বলতে শুনেছি।

গেলো বছরের পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি চল্লিশ লাখ প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন। এক কোটি চল্লিশ লাখ মানুষ কেমন আছেন, কীভাবে আছেন–তা আমরা কেউ জানি?

লেখক: গল্পকার

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ