একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপদ!

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:২৯, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩১, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯

চিররঞ্জন সরকারগণতন্ত্র নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য হলো, ‘বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না’। করাচিতে খাজা নাজিমউদ্দীনের (লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হন) সঙ্গে দেখা করে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী পার্টি। তাকে কাজ করতে সুযোগ দেওয়া উচিত’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২১৪) তাঁর এই উক্তির আলোকে যদি বাংলাদেশের গত ৪৮ বছরের রাজনীতি বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে আমরা কী দেখি? আমরা দেখি যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন, তখন তারা নিজেদের সর্বেসর্বা মনে করেন। এটি অনেকটা ফরাসি রাজা ষষ্ঠ লুইয়ের সেই উক্তির মতো, ‘আমিই রাষ্ট্র’। অনির্বাচিত স্বৈরশাসকেরা এ ধরনের আচরণ করতে পারেন। কেননা, জনগণের প্রতি তাদের কোনও দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু যারা নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করেন, তারা কেন সেই পথে হাঁটবেন?
যেভাবে, যে পরিস্থিতিতেই হোক, আওয়ামী লীগ একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে– এটাই এখন বাস্তবতা। কিন্তু যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে, তাতে উদ্বেগের বড় কারণ আছে। এতে বিরোধী দল বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। কাগজে-কলমে জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হিসেবে সংসদে ভূমিকা পালন করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে বটে, কিন্তু সেটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শোচনীয় দুর্দশা মোচনের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্য গড়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। বিগত সরকারের আমলে তারা মন্ত্রিসভায়ও ছিল। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাদের আলাদা করে চেনাটা সত্যিই কঠিন। এ অবস্থায় তারা বিরোধী দল হিসেবে নাম লেখালেও সেটা হবে অনেকটাই ‘পাতানো’।

এই ‘পাতানো’ পরিস্থিতি থেকে বিরোধী দলকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবেন, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। শক্তিশালী বিরোধী দলই সরকারের বন্ধু হতে পারে, অনুগত বা বশংবদ বিরোধী দল নয়। সরকারি দলের সব কার্যক্রম-নীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমালোচনা ক্ষমতাসীনদের সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে, স্তুতি নয়। এই সরল সত্যটি অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের বুঝতে হবে। বিরোধী পক্ষ ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমেই গণতন্ত্র পূর্ণতা পায়। সবাই যদি ‘জি হুজুর’ করে তাহলে সেটা গণতন্ত্র হয়ে ওঠে না, সেটা হয় বড় জোর ‘জি-হুজুর’তন্ত্র। গণতন্ত্র মানে কেবল শাসকের অভিপ্রায় নয়, বিরোধীদেরও তাতে পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ দরকার। তারা সমালোচনা করবে, শাস কদলের অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে– এটাই স্বীকৃত এবং কাঙ্ক্ষিত।

বিপুল-ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপদ অনেক। যে সরকারের যত লোকবল, তার পদস্খলনের সম্ভাবনাও তত বেশি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যারাই ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় গেছেন, সংখ্যার দাপটে তারা গণতন্ত্রের শর্তগুলোকে অবজ্ঞা করে বসেছেন। তারা হয়তো মনে করেন, যে কোনও বিরুদ্ধ মতের ওপরই রোডরোলার চালিয়ে দেওয়া যায়। এই প্রবণতা সর্বনাশ ডেকে আনে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ‘বর্বর জয়ের উল্লাসে’ নিজের ঘরে মৃত্যু ডেকে আনা এক প্রাচীন ব্যাধি।

আত্মবিশ্বাস একটি গুণ, একটি ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগে অমৃতও যদি বিষবৎ হয়ে উঠতে পারে, তা হলে আত্মবিশ্বাসও তার গুণাবলি হারিয়ে ত্রুটিতে রূপান্তরিত হতে পারে। ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত প্রত্যয় ত্রুটিকে চিহ্নিত হতে দেয় না। ফলে আত্মবিশ্লেষণের অবকাশই তৈরি হয় না, ত্রুটির সংশোধনও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আত্মবিশ্বাস যতই প্রবল হোক, ক্ষণে ক্ষণে আত্মবিশ্লেষণটাও জরুরি। দুর্বলতম সরকার হোক বা সবলতম শাসক—প্রতিটা দিনের শেষে একবার আয়নার সামনে দাঁড়ানো প্রত্যেকের জন্যই জরুরি। আত্মতুষ্টি এবং অতি-প্রত্যয়ে আক্রান্ত সরকারের কাছে কিন্তু সেই আয়নাটা নেই। যারা এই আয়না হয়ে উঠতে পারতেন তাদের কোনও রকম সুযোগও দেওয়া হয়নি।

আরেকটি কথা। বিরোধীদের অবশ্যই কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। তারা যদি নির্বাচনকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানাতে চায় এবং নতুন করে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তদারকিতে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামে, তবে তা নিষিদ্ধ করা ও নেতাদের গ্রেফতার করা গণতন্ত্রসম্মত হবে না। বিএনপি ও তার জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর যৌথ আন্দোলন সহজেই হিংসাত্মক হয়, তা সত্য। কিন্তু অতিরিক্ত দমন নীতি জনসাধারণের এক বৃহৎ অংশের ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাইরে আসার পথটিই রুদ্ধ করতে পারে, স্বাভাবিক নিষ্ক্রমণের পথ না পেয়ে এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ অন্তর্ঘাতেই বিস্ফোরণের পথ খুঁজবে। দলই হোক আর ব্যক্তিই হোক, ক্ষমতার প্রতাপ যদি একচ্ছত্র হয়, তার বিরোধিতা একদিন না একদিন মাথা তুলে উঠবেই। একমাত্র গণতন্ত্রেরই সেই ক্ষমতা আছে, নৈরাজ্য বা সঙ্কটের মতো চরম দশার মুখোমুখি না করে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে সংবিধানসম্মত পথে চালিত করতে।

ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারের বৈধতার প্রশ্নটি যেমন জরুরি, সরকার প্রতিষ্ঠা তথা গণতন্ত্র-পদ্ধতির প্রতি স্পষ্টত অসহযোগ দেখাবার জন্য বিএনপি-জামায়াতের গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও সমধিক জরুরি। শেখ হাসিনারও যেমন সরকার চালনার জন্য আরও ‘বৈধ’ জনভিত্তি দরকার, বিরোধী পক্ষেরও উচিত নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। কেবল ষড়যন্ত্রের পথ না খুঁজে গণমানুষের দাবিগুলো নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করলে সাধারণ মানুষই একসময় তাদের কাঁধে তুলে নেবে। এ জন্য তাদের সবার আগে দরকার জামায়াতকে ত্যাগ করা। বিএনপির মাধ্যমে কট্টরপন্থী রাজনীতি বাংলাদেশের সমাজে জনপ্রিয়তা পাবে, তা নিশ্চিত। কিন্তু বিএনপি-কে ধারাবাহিকভাবে অবৈধ ও অস্বীকৃত রাখলে কট্টরপন্থী রাজনীতি দেশের সমাজকে কোনও না কোনও দিন ফুঁড়ে দেবে, এটা আরও বেশি নিশ্চিত। মিসর থেকে সিরিয়া, কিংবা তুরস্ক, প্রমাণ নানাদিকে ছড়িয়ে আছে। তাই, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ সাংবিধানিক পথে পরস্পরের মোকাবিলা করুক, এটাই বাঞ্ছনীয়।

বিএনপিকে এখন অনেক বেশি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারকে ‘ওয়াক ওভার’ দিয়ে নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিক পথে থেকে নিজেদের রাজনীতির নৈতিক জোর প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য সাহস দেখাতে হবে। সবার আগে হিংসার রাজনীতির কারবারিদের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে, যুদ্ধাপরাধ বিচারের গুরুতর প্রশ্নটির মোকাবিলায় সেই কারবারিদের কায়েমি স্বার্থের বশীভূত থাকলে চলবে না। মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে কোনও দোদুল্যমানতাকে সমর্থন করে না। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, জামায়াত নয়, তারাই দেশের প্রধান বিরোধী দল। শাসক দলের রাজনৈতিক বিরোধিতা অবশ্যই জরুরি, তার যথেষ্ট কারণও আছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দলতন্ত্র ও নানাবিধ অভিযোগ বিপুল। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকেও অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও এই সরকার ব্যবস্থারই সমর্থক। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনর্বাসনের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এসব প্রশ্নে যথার্থ গণতান্ত্রিক বিরোধিতার স্বার্থেই বিএনপির উচিত নেতিবাচক ও তাড়াহুড়োর রাজনীতি ছেড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলস্রোতে ফিরে আসা। তাতে বিএনপির রাজনৈতিক শক্তি ও মর্যাদা বাড়বে বৈ কমবে না।

বিরোধী পক্ষকে দমন করা নয়, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। গণতন্ত্রের স্বার্থেই নমনীয় হওয়া দরকার। আর শাসক পক্ষের দিক থেকেই নমনীয়তা অধিক জরুরি। নতুবা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বার আশঙ্কা প্রবল, মৌলবাদীরা তার সুযোগ নিতে পারে। তার পরিণাম কেবল দেশের উদীয়মান ও সংকটদীর্ অর্থনীতি নয়, দেশের শাসক দলের পক্ষেও শেষ বিচারে বিপজ্জনক।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ