বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করলে বাংলাদেশের বন্ধু হবেন কীভাবে?

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ২০:৩৯, জানুয়ারি ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৪, জানুয়ারি ১১, ২০১৯



মো. জাকির হোসেনআমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। করার সুযোগও ছিল না। একাত্তরে আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর তিন মাস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যখন ময়মনসিংহ এসেছিলেন তখন তাঁকে একনজর দেখার পরম সৌভাগ্য হয়েছিলো। আমার ছোট চাচার কোলে বা কাঁধে চড়ে দেখেছিলাম। সালটা ঠিক মনে পড়ছে না। তবে এটুকু মনে আছে, সে সময় ময়মনসিংহের বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহ ছায়াবাণী হলে রাজ্জাক-কবরীর ‘রং বাজ’ সিনেমা চলছিলো। সে হিসাবে এটি ১৯৭৩ সাল হওয়ার কথা। সেই একনজর দেখা থেকে বঙ্গবন্ধুর পাগল ভক্ত আমি। বঙ্গবন্ধুকে কেউ অবজ্ঞা-অবমাননা করলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ অনুভব করি।

গত ৮ জানুয়ারি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলন করে ঐক্যফ্রন্ট তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বিষয়ে একটি লিখিত বিবৃতি দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের বিবৃতিটি পাঠ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিবৃতির প্রথম বাক্যটি ছিল এরকম– ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করেছে।’ কিন্তু বিবৃতিটি পাঠ করার সময় বঙ্গবন্ধুর নাম এড়িয়ে যান বিএনপি মহাসচিব এবং ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিবৃতি পাঠ করার সময় প্রথম বাক্যের কিছু অংশ পড়ার পর বঙ্গবন্ধুর নাম থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম ইচ্ছাকৃতভাবেই তা বাদ দিয়ে পরের অংশ থেকে পড়া শুরু করেন। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখতে ও শুনতে পাওয়া যায় মির্জা ফখরুল ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশের জনগণ’ এটুকু পাঠ করার পর বঙ্গবন্ধুর নাম দেখে একটু থমকে যান এবং বঙ্গবন্ধুর নাম এড়িয়ে বাক্যের পরের অংশ পাঠ করেন। ফলে প্রথম বাক্যটি এরকম দাঁড়ায় ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশের জনগণ নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করেছে’। মির্জা ফখরুলের কাছে সবিনয়ে জানতে চাই, আপনি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, সচেতনভাবে বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিলেন, তাহলে কার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে তা তো বললেন না? ‘জনগণ নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে’– এটি তো অসম্পূর্ণ তথ্য। কী অপরাধে বঙ্গবন্ধু আপনার কাছে, আপনার দলের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে গেলেন যে, তাঁর নামটা পর্যন্ত উচ্চারণ করা যাবে না? যে দিন বঙ্গবন্ধুকে ঘাতকরা হত্যা করে সেদিন বিবিসির সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠানে ভাষ্যকার মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাংলাদেশে যা কিছুই ঘটুক না কেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সেই মানুষটি না হলে যে বাংলাদেশের জন্মই হতো না’। ১৯৭১-এর পাঁচ এপ্রিল আমেরিকার বিখ্যাত সাময়িকী নিউজউইকের প্রচ্ছদে বঙ্গবন্ধুর ছবি ছেপে ২৬ মার্চ শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করে তাঁকে রাজনীতির কবি (পোয়েট অব পলিটিকস) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে তাঁর নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করতে পারলেন না, এরচেয়ে বড় রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব কী হতে পারে? বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে না পারলে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে রাজনীতি করবেন কোন মুখে? নির্বাচনের কয়েক দিন আগে আপনি ভিডিও ক্লিপ তৈরি করে নিজেকে ফলাও করে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করলেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে থমকে যায়, হোঁচট খায়, ভয় পায়, লজ্জা পায়, তাহলে কেমন মুক্তিযোদ্ধা আপনি? কথায় আছে ‘ভূত ভগবানের নাম নিতে পারে না’। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধের প্রাণভোমরার নাম নিতে পারলেন না? মুক্তিযুদ্ধের সময় এ স্লোগান শুনেননি– ‘তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব’, ‘মুজিব না ভুট্টো? মুজিব মুজিব’, ‘মুজিব না ইয়াহিয়া? মুজিব মুজিব’, ‘জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো’, ‘শেখ মুজিবের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। ৭২-এর ১০ জানুয়ারি জাতির জনককে ফিরে পেয়ে লক্ষ-কোটি বাঙালির নজিরবিহীন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখেননি?

৭১-এর ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা ছাড়া ৫২, ৫৪, ৬৬, ৬৯, ৭০-এর নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের কোনও সম্পৃক্ততা ছিল কি বা কেউ জিয়াউর রহমানের নামে স্লোগান দিয়েছে, এমন কথা কেউ শুনেছে কখনও? পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুজিব প্রদেশে সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে ডি ফ্যাক্টো শাসকে পরিণত হন। মুজিব তাঁর শাসনকে সংহত করার জন্য একের পর এক নির্দেশ (মোট সংখ্যা ৩১) জারি করেন’। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনকে ডি ফ্যাক্টো প্রেসিডেন্ট ভবন হিসেবে উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার সালিক লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার জন্য মুজিব ইতিমধ্যে তাঁর সশস্ত্র সংগঠন তৈরি করে ফেলেছেন। কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী কার্যত মুজিবের কমান্ডার-ইন-চিফ। তাঁর প্রাইভেট বাহিনী গড়ে উঠল আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে।’ আওয়ামী লীগের সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে যেসব সামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, তাঁরা হলেন- ব্রিগেডিয়ার মজুমদার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদুল হাসান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াসিন, মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার) মুশাররফ, মেজর জলিল ও মেজর মঈন। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও অন্যরা তাঁদের লেখনী ও বক্তব্যে ওসমানীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় নিশ্চিত করেছেন। এখানেও জিয়ার কোনও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় না। তারপরও আপনি কত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া। আর যিনি বাংলার স্বাধীনতার জন্য ৪৬৭৫ দিন জেল খাটলেন, দুইবার মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি দাঁড়ালেন, তাঁর নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করতে পারলেন না। এ লজ্জা রাখি কোথায়? স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক সিরিলডন টাইম ম্যাগাজিনে লিখেছেন, ‘মাতৃভূমিকে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতার জন্য বর্তমানের চমকপ্রদ নাটকীয় যুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে আসার ঘটনা শেখ মুজিবের একদিনের ইতিহাস নয়, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি তাঁর লক্ষ্য ছিল।’ বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে জাতিকে সংগঠিত না করে থাকলে কে করেছে তা বলুন? আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন করতে গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চেষ্টা করেও আপনার তা সংগঠিত করতে পারছেন না। পুলিশ-র‌্যাবের দোহাই দিচ্ছেন। তাহলে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি জাতিকে সংগঠিত করা কতখানি দুরূহ, দুঃসাধ্য, দুঃসাহসিক ও কঠিন কাজ ছিল তা বোধ করি অনুধাবন করতে পারেন। সেই ৪৮ সাল থেকে জীবন বাজি রেখে নিজের ও পরিবারের স্বপ্নকে কুরবানি করে ধাপে ধাপে যিনি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করলেন, তাকে অস্বীকার করলেন। এত বড় অবিচার বিধাতা সইবেন না। প্রকৃতির বিচার শুরু হয়ে গিয়েছে, অনুধাবন করতে পারছেন না?

ভারতের গুপ্তচর মোহনলাল ভাস্কর পাকিস্তানি পুলিশের হাতে বন্দি হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। মুক্তিলাভের পর তিনি তাঁর কারাজীবন নিয়ে ‘An Indian Spy In Pakistan’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। মিয়ানওয়ালি কারাগারে আটক থাকার স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘একরাতে আমাদের কারাগারে শেখ মুজিবকে লায়লাপুর কারাগার থেকে আনা হয়েছে। আমরা শুনেছি, লায়লাপুর কারাগারে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু বন্দি সৈনিক শেখ মুজিবকে মুক্ত করার জন্য একটি সুড়ঙ্গ কেটেছিল; কিন্তু তারা ধরা পড়ে যায়। সে কারণেই শেখ মুজিবকে এই কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। জেল সুপার ছিলেন চৌধুরী নিসার। তিনি এসে জানান, শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য আনা হয়েছে। একদিন ডেপুটি সুপার ফাজালদাদ আমাকে ও অন্য সাতজন ভারতীয় বন্দিকে বললেন, আট ফুট লম্বা আর চার ফুট চওড়া একটি গর্ত খুঁড়তে। সেই রাতে শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হবে। এরপর তাঁকে এই গর্তে কবর দেওয়া হবে। সকাল ৯টা নাগাদ কবর খোঁড়া হয়ে গেলো। আমরা রাতভর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সকালে খবর পেলাম, সেই রাতে মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি। পরে শুনেছি, ফাঁসির প্রস্তুতি যখন চলছিল, ভুট্টো ইয়াহিয়ার সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন এবং তাঁকে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি সৈনিক কর্মরত আছে। মুজিবের ফাঁসির খবর সেখানে পৌঁছলে বাঙালিরা তাদের একজনকেও জীবিত রাখবে না’।

জনাব মির্জা ফখরুল, শেখ মুজিবের কী অপরাধে পাকিস্তান তাকে ফাঁসি দিতে চেয়েছিলো? চুরি, ডাকাতি, হত্যা, রাহাজানি? নাকি বাংলাদেশ সৃষ্টির অপরাধে? বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করলে মহাসচিব পদ কেড়ে নেওয়া হতো কিংবা বড়জোর বহিষ্কার হতেন। কিন্তু বিবেকের কাছে অপরাধী হতেন না। বিবেক বিক্রি হয়ে গেলে কি আর রাজনীতির অধিকার থাকে?

স্বাধীনতার পরও বঙ্গবন্ধুর প্রতি পাকিস্তানের শত্রুতা থেমে থাকেনি। স্ট্যানলি উলপার্টের জুলফিকার ভুট্টো অব পাকিস্তান বইয়ে উল্লেখ আছে ‘দুই বছর যাবৎ ভুট্টো কয়েকটি মুজিববিরোধী দলকে তার গোপন স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে অর্থসাহায্য অব্যাহত রাখেন এবং এর বিনিময়ে ফল লাভ করেছিলেন’। ২০০০ সালে স্ট্যানলি উলপার্টের ঢাকা সফরের সময় লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক আবদুল মতিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘বিনিময়ে ফল লাভ বলতে আপনি কী বুঝিয়েছেন? মুজিব হত্যায় কি পাকিস্তান জড়িত ছিল?’ উলপার্টের উত্তর, ‘হ্যাঁ, আপনি তা বলতে পারেন’। (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: কয়েকটি ঐতিহাসিক দলিল, র‌্যাডিকেল এশিয়া পাবলিকেশন্স, লন্ডন, ২০০৮)। বঙ্গবন্ধুর অপরাধ ছিল তিনি পাকিস্তান ভেঙে তার ভালোবাসার বাংলাদেশ তৈরি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের শত্রু। পাকিস্তান হলো বিএনপির বন্ধু। আবার বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ বিএনপিতে নিষিদ্ধ। তাহলে যে সমীকরণটা দাঁড়ায় তাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিএনপির অবস্থান বিষয়ে আমার একটা মজার জোকস মনে পড়ছে। শিক্ষক যুক্তিবিদ্যার ক্লাসে পড়াচ্ছেন ‘এ’-র মান সমান ‘বি’। ‘বি’-র মান সমান ‘সি’। তাহলে আমরা সহজেই বলতে পারি ‘এ’ সমান ‘সি’। এবার শিক্ষক ছাত্রকে একটি সৃজনশীল উদাহরণ দিতে বলেন। ছাত্রটি জবাব দেয়, ‘আই লাভ ইউ’। ‘ইউ লাভ ইউর ডটার’। কাজেই একথা সহজেই বলা যায়, ‘আই লাভ ইউর ডটার’। ছাত্রটি শিক্ষকের কন্যার প্রতি তার ভালোবাসা যেমন কৌশলে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলো, তেমনি পাকিস্তান ও বিএনপির কমন শত্রু বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ না করে পাকিস্তানের প্রতি বিএনপির অটুট ভালোবাসারও জানান দেওয়া হলো।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমদ দাবি করেছেন, ‘জয় বাংলা স্লোগান, বঙ্গবন্ধু ও মুজিব কোট একক কোনও দলের নয়। কারও ব্যক্তিগত সম্পদও নয়। একটি রাজনৈতিক দল দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য সেগুলো ব্যবহার করে থাকে’। তিনি আরও বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। ওনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধান যদি কেউ মানেন তবে এই সত্যগুলোকে অস্বীকার করতে পারবেন না। তিনি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। যেমনটি ভারতের মহাত্মা গান্ধী ও চীনের মাও সেতুং-কে সেই দেশের মানুষ বিবেচনা করে’। ফ্রন্টের  মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করা দূরে থাক, বঙ্গবন্ধুর নামই উচ্চারণ করলেন না।

বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ড. কামাল হোসেন, সুলতান মুহাম্মদ মনসুর ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পুত্রের দাবিদার কাদের সিদ্দিকী এ ঘটনার কি ব্যাখ্যা দেন তা জানার অপেক্ষায় থাকলাম।  

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। সাংবিধানিকভাবে হত্যার বিচার নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। বাংলাদেশ ও বাঙালির হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুকে নির্বাসনের সব আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বিভীষিকাময় সময়ে বিবিসি টেলিভিশনের সংবাদদাতা ব্রায়ান বারন ঢাকায় এসে অন্যান্য বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তিনদিন আটক থাকার পর দেশত্যাগে বাধ্য হন। ১৯৭৫-এর ২৮ আগস্ট ব্রায়ান বারন এক সংবাদ বিবরণীতে লেখেন, ‘শেখ মুজিব সরকারিভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস ও জনসাধারণের হৃদয়ে উচ্চতম আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেন। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। এটা যখন ঘটবে, তখন নিঃসন্দেহে তাঁর বুলেট-বিক্ষত বাসগৃহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারকচিহ্ন এবং কবরস্থান পুণ্যতীর্থে পরিণত হবে।’

ব্রায়ানের বিচক্ষণ বিবরণী কি বাংলাদেশে ফলে যায়নি? ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাপী বিবিসির মতামত জরিপে বঙ্গবন্ধু কি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বিবেচিত হননি? তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর অন্তভুর্ক্ত হয়নি? জাতিসংঘের স্বীকৃতির মাধ্যমে এটি বিশ্ব ঐতিহ্য তথা মানবজাতির অভিন্ন সম্পদে পরিণত হয়নি? লোকান্তরিত মুজিব আরও উজ্জ্বল, আরও শক্তিশালী হননি?

বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, বাঙালি যতদিন থাকবে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা যতদিন প্রবাহিত থাকবে, বাঙালির হৃদয়ে আবেগ-অনুভূতি ও উত্তাপ যতদিন থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন। বঙ্গবন্ধুকে ভালো না বেসে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্নভাবে ভালোবাসা যায় না। বঙ্গবন্ধুর অবদানকে যে অস্বীকার করে, সে অকৃতজ্ঞ। আর বঙ্গবন্ধুকে যে অসম্মানিত করে, সে কৃতঘ্ন। বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে বিএনপি বাংলাদেশের বন্ধু হবে কীভাবে?

লেখক:  অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain@justice.com

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ