স্বদেশ থেকে প্রিয় বিদেশ

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৬:৫৯, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০০, জানুয়ারি ১৩, ২০১৯

শান্তনু চৌধুরীনির্বাচন হলো, সরকার গঠন হলো এবং যথারীতি জীবনযাত্রা স্বাভাবিক এবং আনন্দপূর্ণভাবেই শুরু হলো বলা যায়। সুষ্ঠু ভোট হলো। অবাধ ও নিরপেক্ষ হলো কিনা সেটা নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে একথা ঠিক, ৭ জানুয়ারি শপথের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার নব উদ্যমে যাত্রা শুরু করলো। এ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের বাইরে কাউকে স্থান দেওয়া হয়নি, এসব জানা কথা। কিন্তু বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট যে কী করতে চাচ্ছে এখনও সেটা স্পষ্ট হচ্ছে না। কারণ, সকাল-বিকাল প্রেস কনফারেন্স ডেকে একেক সময় একেক কথা বলে চলছে দলটি। একবার শোনা গিয়েছিল ঐক্যফ্রন্ট শপথ নেবে, আবার বলা হচ্ছে নেবে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বিএনপির বিদেশপ্রীতি কমেনি। স্বদেশ থেকে বিদেশই তাদের কাছে অত্যধিক প্রিয় হয়ে উঠেছে, সেটা নির্বাচনের আগে বা পরে। দলটি সম্পর্কে বাজার চলতি একটি কথা যে প্রচলিত রয়েছে– বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট মনে করে বসেছিল কেউ যেন এসে তাদের মসনদে বসিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এমনকি নির্বাচনের দু-একদিন আগেও তারা হুংকার দিয়ে বলেছিল, ভোটের দিন জনতা জেগে উঠবে। ভোট দেবে ধানের শীষে। কিন্তু জনতা জাগলো ঠিকই আর জয় হলো নৌকার।

বাস্তবতা হলো ভোটের বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই বিএনপি বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়ে চলছে। দফায় দফায় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে গেলো সরকারের বিষয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেছে। কিন্তু যে কাজটি তাদের করা উচিত সেটির দিকে তাদের আগেও মনোযোগ ছিল না বা এখনও নেই বলেই মনে হয়। ভোটের পরে ৬ জানুয়ারি একটি হোটেলে কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। সেখান থেকে বেরিয়ে শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, আরেকটি নির্বাচন দিতে বিদেশিরা গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। চাপ না হলেও যুক্তি দিয়ে সরকারকে বোঝাতে পারে। আরেকটি নির্বাচন দিয়ে তার ফলাফলের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেশে থাকুক সেটাই তারা চায়। দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে, সরকারের জন্যই আরেকটি নির্বাচন দরকার বলে মনে করে ঐক্যফ্রন্ট। এই বৈঠকের আগেও আরও দুটি বৈঠক বিএনপি নেতাদের সঙ্গে করেছেন মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তারা। প্রথমটি বিএনপির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্বাচনের পরপরই এক মার্কিন কূটনৈতিক বৈঠক করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদের সঙ্গে। এই বৈঠকটি ততটা সমালোচনার জন্ম না দিলেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় ৪ জানুয়ারির বৈঠকটি। সেদিন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মিলারের বাসায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিএনপির মহাসচিবের সঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টা হলো রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে যেকোনও দলের শীর্ষ নেতা বা যে কারও বৈঠক হতেই পারে। কিন্তু একটি জাতীয় নির্বাচনের পরপরই এ ধরনের বৈঠক নানা প্রশ্নের উদ্রেক করে বৈকি! বিশেষ করে দলটি যদি হয় বিএনপি। কারণ, এই দলটি বিদেশ থেকে শুরু করে প্রতিনিয়ত এত বেশি নালিশ করে আসছে যে, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ভাষায় সেটি এখন ‘বাংলাদেশ নালিশ পার্টি’তে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট এমন সময় বৈঠকগুলো করছে যখন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে একের পর এক বার্তা আসছে। এমনকি পাকিস্তানও অভিনন্দন জানিয়ে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাহলে বলতেই হয় বিদেশের কাছে বিএনপির এ ধরনের অব্যাহত নালিশ এক ধরনের ঐতিহাসিক ভুল। শপথ না নিয়ে বিএনপি যে ভুল করতে যাচ্ছে সে একই ধরনের ভুল এ ধরনের নালিশের ধারা অব্যাহত রাখা। জনগণের কথা মাথায় না রেখে বিদেশি শক্তিকে নিয়ে মেতে থাকা তাদের কাছে দেন-দরবার করা যে কত বড় ভুল সেটি যুগে যুগে প্রমাণ হয়েছে। কথায় তো বলে, সংসারের ঝামেলায় তৃতীয় পক্ষ মাথা ঘামালেই সেই সংসার নষ্ট হয়ে যায়। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও টিপু সুলতানের সঙ্গে বিবাদ করে যারা মীরজাফরি করেছিল তাদের কারণে ইংরেজরা ভারত শাসন করেছে দুইশ’ বছর। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, মিসর, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা দেশগুলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নাম করে যে হাল করেছে তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। সেসব দেশের মানুষের দুঃখ দুর্দশার গল্প এখন প্রতিদিনের শিরোনাম। পালিয়ে বাঁচছে মানুষ। আমাদের দেশে যেন এমন অবস্থা না হয়। শুধু এই শেষ নয়, বিএনপি যে ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল, নির্বাচনের আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কথা থেকে জানা যায়, বিএনপি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। গেলো বছরের আগস্টে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের সঙ্গে ব্যাংককে একটি বৈঠকের দিন ঠিক করার চেষ্টাও করেছিল বিএনপি। তবে সেটি হয়নি। ভারত কেন আওয়ামী লীগকে এতটা গুরুত্ব দেয় সেটা নিয়েও কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন মির্জা ফখরুল। 

জাতীয় নির্বাচন বা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ভিনদেশি রাষ্ট্রদূতের কাছে নালিশ বা তাদের বাসায় যাওয়া একদিকে যেমন শোভন নয়, তেমনি সেটি হীনমন্যতারও পরিচয় দেয়। কারণ, ভূ-ভারতের রাজনীতিতে পশ্চিমা বিশ্ব নাক গলানোর যে সুযোগ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে সেটি যদি বিএনপির মাধ্যমে আসে তবে সেটি যে দেশের জন্য সুখকর হবে না তা আগেই বলেছি। তাছাড়া আমাদের সমুদ্র সম্পদও তাদের কুনজরে রয়েছে। আরেকটি, বহির্শ্ব সবসময় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরব হলেও একমাত্র বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কিছুটা ব্যতিক্রম। কারণ, বিএনপির সঙ্গে জামায়াত শিবির থেকে শুরু করে অন্য সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর সখ্যের কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে একথা ঠিক, দূতাবাসের কোনও ক্ষমতা নেই যে একটি নির্বাচন বানচাল করা বা পুনর্নিব্‌ানের ব্যবস্থা করার। বিএনপি হয়তো জনগণকে দেখাতে চায় তাদের কর্মপরিকল্পনা বা সরকার যেন বিদেশি সহযোগিতা না পায় সেই চেষ্টা করছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে কেউ পরাজিতের পক্ষে থাকে না। বহির্শ্বও নিজেদের স্বার্থের বাইরে কোনও কিছু চিন্তা করবে না। কূটনীতিকরা খবর নেবেন সেটা দোষের কিছু নয়, কিন্তু আমরা যদি যেচে গিয়ে তাদের কাছে খবর পৌঁছে দিয়ে আসি তাহলে সেটি তো পোয়াবারো।

ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি নির্বাচনের আগে থেকে শুরু করে নির্বাচনে পরে এখন পর্যন্ত যে কাজগুলো করা দরকার তার একটিও করছে বলে মনে হয় না। সেটি ফুটে উঠেছে ৫ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত মতবিনিময় সভায় মির্জা ফখরুলের দেওয়া বক্তব্যে। ভোটের দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনে আমরা বাধা দিতে পারিনি। সে জন্য বারবার ছুটে গেছি বিভিন্ন জায়গায়। বলেছি জেগে উঠুন, আপনার অধিকার আপনারা রক্ষা করুন। আমরা রক্ষা করতে পারিনি। কেন পারিনি? পারিনি এ জন্য যে আমরা সুশৃঙ্খল নই। আমরা মরার আগে মরে যাই।’ মির্জা ফখরুলের এই কথা অনেক না বলা কথা বলে। হয়তো মতবিনিময় সভা বলে তিনি অনেক কথা বলতে পারেননি। সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল তো জানেন, জনগণের সামনে আশা জাগানিয়া কোনও স্বপ্ন তারা দেখাতে পারেননি। দেশের বাইরের চাপ আর দলের তৃণমূল নেতাদের চাপ থাকার পরও তারা জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে পারেনি। যারা নিয়মিত মামলা, হামলা, কারাবরণ, লাঞ্ছনার শিকার হয়ে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, সেসব ত্যাগী নেতাকে মনোনয়ন না দিয়ে ২২ জন জামায়াত নেতাকে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষোভ তো রয়েছেই। এছাড়া বিএনপি জনগণের জন্য কী করবে তার চেয়ে বরং বেশি মনোযোগী ছিল বেগম জিয়ার মুক্তি নিয়ে। নির্বাচনে তাদের প্রচার ছিল পিছিয়ে। অনেক জায়গায় প্রার্থীর পোস্টারও দেখা মিলেনি। এটিই প্রমাণ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে শেষ পর্যন্ত যেন দ্বিধায় ছিল দলটি। এছাড়া মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তো রয়েছেই।

বহিবিশ্বের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ নানা যোগাযোগ থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণই শেষ কথা। একই সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদেরও মূল্যায়ন করতে হবে যথাযথভাবে। দশ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি বিষয়টি হয়তো আমলে নিতে পারেনি। তাই যতই রণহুংকার ছাড়ুক না কেন, ৩০ ডিসেম্বর জনগণ তাদের পক্ষ হয়ে কাজ করেনি। আনেনি ভোট বিপ্লব। বরং উন্নয়নের চলমান গতি ধরে রাখার পক্ষে মত ছিল তাদের। তবে একথা ঠিক ষড়যন্ত্র থামবে না। সেটি দেশের বাইরে হোক বা দেশের ভেতরে হোক।

ক্ষমতায় যেতে মরিয়ার দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকেই যেহেতু বেশি প্রাধান্য দেয় সে কারণে সজাগ থাকতে হবে সরকারকে। থাকতে হবে সচেতন। বিশাল বিজয়ে নিশ্চিত আনন্দে বসে থাকলে চলবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক   

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ