চিনে নিন ধর্ষক মন

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ২০:১১, জানুয়ারি ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৯, জানুয়ারি ১৪, ২০১৯

হারুন উর রশীদনারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। দেশে দেশে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার বিবেকবান মানুষ। আর দাবিও উঠছে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর আইনের। কিন্তু বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোনও কোনও গোষ্ঠী বা ব্যক্তি ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রকারান্তরে ঘটনার শিকার নারীকেই এর জন্য দায়ী করেন। আর এ থেকেই চেনা যায় ধর্ষক মন এবং ধর্ষণ সংস্কৃতির সমাজ।
প্রধানত ধর্ষণের শিকার নারীকে দায়ী করার প্রবণতার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় ধর্ষক মন এবং সমাজ। একবার দেখে নিই সেগুলো কেমন। কোনও নারী ধর্ষণের শিকার হলে যে প্রশ্নগুলো তোলা হয়–
১. অত রাতে সে বাইরে কেন গিয়েছিল? 

২. তার পোশাক যৌন উত্তেজক।
৩. তার চলাফেরা ভালো না। 

৪. একা কেন বাইরে গেলো?


৫. এত সাজগোজ করে কেন বাইরে গেলো।

৬. তার চোখের বা শরীরি ভাষা ইঙ্গিতপূর্ণ।
৭. তার গায়ে পড়া স্বভাব আছে।
৮. সে যৌনকর্মী অথবা হেবিচুয়েটেড।

এরকম আরও অনেক প্রশ্ন ওঠে। খেয়াল করবেন এই প্রত্যেকটি প্রশ্নই কিন্তু ধর্ষকের পক্ষে যায়। এই প্রশ্নগুলো বলে দেয় যে ধর্ষক তো ধর্ষণ করবেই। তুমি নারী, তুমিই নানাভাবে ধর্ষককে আহ্বান করো। ধর্ষকের কোনও অপরাধ নেই। তার তো এটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি!

এই ধর্ষণ প্রতিরোধে আবার কিছু লোক নানা উপায় বাতলে দেন। আর সেটা প্রধানত দেওয়া হয় ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের আবরণে। সেগুলো একবার দেখে নিই।

১. নারীদের সহশিক্ষা বন্ধ করতে হবে।
২. পারলে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিতে হবে।
৩. বোরকা পরতে হবে বা চোখ ছাড়া পুরো শরীর আবৃত করে বাইরে যেতে হবে।
৪. শালীন পোশাক পরতে হবে (শালীনতার সংজ্ঞা কী?)।
৫. গলার স্বর কর্কশ রাখতে হবে।
৬. পর পুরুষের সঙ্গে কথা বলা যাবে না।
৭. পুরুষের মাঝে কাজ করতে হয় এমন পেশা বেছে নেওয়া যাবে না।
৮. নারী হচ্ছে ফুলের বাগান, তাই তাকে বেড়া দিয়ে রাখতে হবে।
৯. নারী হচ্ছে তেঁতুলের মতো, দেখলেই পুরুষের জিভে জল আসে। তাই ঢেকে রাখতে হবে।

আরও নানা বিধিনিষেধের কথা আছে। তবে এই কয়টি থেকেই স্পষ্ট যে নারীকে এই বিধিনিষেধ দিয়ে ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানে ওই নারী পণ্য, সুতরাং ধর্ষক পুরুষ ভোগ করতে চাইবেই। পুরুষের কোনও দোষ নেই। দোষ নারীর। এখানেও ধর্ষণকে বৈধতা দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট।
এরকম যদি হয় ব্যক্তিচিন্তা এবং সমাজের ভাবনা, তাহলে সেই ব্যক্তি ধর্ষক মনের অধিকারী। আর ওই সমাজে বিদ্যমান রয়েছে ধর্ষণ সংস্কৃতি। আর এটাও স্পষ্ট যে তারা নারীকে কোনোভাবেই মানুষ হিসেবে ভাবতে পারেন না। কখনও ফুলের বাগান, কখনও তেঁতুল, আবার কখনও শস্যক্ষেত্র ভাবেন।

একটি উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হবে। কাউকে রাস্তায় হত্যা করা হলে কোনও পুরুষ বা কাউকে প্রশ্ন করতে শুনেছেন যে, তিনি কেন রাস্তায় বের হলেন? সেটা কেউ করেন না। কিন্তু ধর্ষণের শিকার হলে নারীকে এই প্রশ্ন করা হয় সবার আগে। আর সেটা করেন পুরুষ।
ধর্ষণ তো আসলে লিঙ্গ সন্ত্রাস। আর ধর্ষক মন জানে না যে স্ত্রীর সম্মতির বাইরে হলে সেটাও ধর্ষণ। তাহলে তাদের এসব ছবক আর পরামর্শ ধর্ষণ ঠেকাবে কীভাবে? আর কোনও যৌনকর্মীও যদি ‘না’ বলেন সেটা ‘না’ হিসেবেই ধরে নিতে হবে। সেটা জোরজবরদস্তি হলে কোনোভাবেই ‘হ্যাঁ’ হয় না। এটাও ধর্ষণ।

এবার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাই–

১. ছেলেরাও তো বলাৎকারের (পুরুষ ধর্ষণ) শিকার হয়। তাহলে তাকেও কি বোরকা পরে বাইরে বের হতে হবে?
২. তিন-চার বছরের শিশু তো দূরের কথা, ১২ মাস বয়সী শিশুও তো ধর্ষণের শিকার হয়। ওই শিশুদের চলাফেরাও কি খারাপ?
৩. কুমিল্লার তনু তো হিজাব পরতেন, পর্দা করতেন। তাহলে তার কী সমস্যা ছিল?
৪. মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্বর পাক সেনারা যে দুই লাখ মা-বোনকে যৌন নিপীড়ন করেছে, তার কারণ কী? তাদেরও কি বোরকা না পরার কারণে যৌন নির্যাতন করা হয়?

আমার এক বন্ধু(!) আমাকে প্রশ্ন করেন, যদি সারা রাত কোনও যুবক নীল ছবি দেখে সকালে কোনও নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে দোষ কার? তার প্রশ্নের মধ্যেই নারীকে দায়ী করার প্রবণতা আছে। এটাই ধর্ষক মন। তার কথা হলো– পুরুষের লিঙ্গ যেহেতু আছে তাই তার ব্যবহারও যেভাবেই হোক করতে হবে। আমার কথা হলো, এটা যদি মেনে নিতে হয় তাহলে বলতে হবে সন্ত্রাসীর হাতে যেহেতু অস্ত্র আছে সে-তো হত্যা করবেই। সন্ত্রাসীর কী দায়?

আরেকজন এক প্রেমিক জুটির পার্কে প্রেমের একটি ফটোগ্রাফ পাঠিয়ে বলেছেন,‘এর জন্যই ধর্ষণ হয়’। আসলে এটা ধর্ষকদের যুক্তি। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চার সন্তানের জননী কি পার্কে বসে প্রেম করছিলেন?
মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে। এখানে রাত-দিন আর নারী-পুরুষ বলে কিছু নেই। অপরাধের পক্ষে কোনও যুক্তি দেখানোর মানে হলো তাকে অপরাধে আরও উৎসাহিত করা। আর অপরাধের শিকার কাউকে, সে নারী বা পুরুষ যেই হোন না কেন, তাকে দায়ী করার প্রবণতাও অপরাধীকে বাঁচানোর প্রবণতা।

আর এই দুই প্রবণতা নিয়ে যারা ধর্ষণের বিষয় দেখেন তাদের মনকে আমি বলি ধর্ষক মন। আর যে সমাজে এই সংস্কৃতি বিদ্যমান সেই সমাজকে বলি ধর্ষণ সংস্কৃতির সমাজ।

এবার আমরা নিজেরা নিজেদের মনকে প্রশ্ন করে নিজের অবস্থানকে একবার মিলিয়ে নিতে পারি।

অপরাধ ধর্ষকের। তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিন। সমস্যা ধর্ষক মনের। প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে যান। এটা না হলে ধর্ষক সংস্কৃতি আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।

লেখক: সাংবাদিক
ইমেইল:swapansg@yahoo.com

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ