রোজা লুক্সেমবুর্গ হত্যার শত বছর

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ২০:৩৩, জানুয়ারি ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩৪, জানুয়ারি ১৫, ২০১৯

দাউদ হায়দারঘোরঘুট্টি অন্ধকার, শীতের রাত। শেষ প্রহর। ১৯১৯ সাল, ১৫ জানুয়ারি। বার্লিন। হত্যা করা হলো জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা রোজা লুক্সেমবুর্গ এবং কার্ল লিবক্রেস্ট-কে।
বহু বছর ধরেই একটি তর্ক, কার্লকে কি রোজার সঙ্গে একই সময় বা একই রাতে হত্যা করা হয়? নাকি আগের রাতে কার্লকে? তর্ক যাই থাক, রোজাকে হত্যা করা হয় মধ্যরাত্রির পরে। দুজনকে একই সঙ্গে, ফেলে দেওয়া হয় (হত্যা করে) বার্লিনের বিখ্যাত আম স্প্রে (আসলে ‘কানাল’, তথা খাল বা সরু নদী)-তে।
ভূগোল এইরকম। বার্লিনে ১৬টি জেলার একটি স্যোইনেব্যার্গ। মূলত উচ্চ-মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের বাস। স্যোইনেব্যার্গেই বহু খ্যাত টিয়ারগার্টেন (চার কি.মি. লম্বা। দৈর্ঘ্যপ্রস্থে তিন কি.মি.)। টিয়ারগার্টেনের মধ্য দিয়েই আম স্প্রে। রোজা লুক্সেমবুর্গকে যেখানে হত্যা করা হয়, পাশেই হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল, সি ডি ইউ (ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রাটিক ইউনিয়ন। ক্ষমতাসীন এখন, এস পি ডি- সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন) অফিস, ছয়টি দেশের দূতাবাস। পাশে বার্লিন ৎসু (চিড়িয়াখানা), চারটি বড়ো রেস্তরাঁ, একটি নাইট ক্লাব, বিপণিবিতান।

রোজাকে নিয়ে এ পর্যন্ত তিনটি ছবি নির্মিত। প্রথম ছবি ষাটের দশকের গোড়ায়। তিনটি ছবিই তৎকালীন কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানিতে। সব ছবিই সাদাকালো। একটি ছবিতে কার্ল লিবক্রেস্টকে কোথায় হত্যা করা হয়, স্পষ্ট বলা হয়নি। কিন্তু গুলির আওয়াজ ভয়ংকর। কার্লের মৃতদেহ কাপড়ে জড়ানো। রোজাকে সটান দাঁড় করিয়ে (চোখ বাঁধা। দুই হাত পেছনে বাঁধা) গুলি। দু’জনকে একই সঙ্গে ফেলা হয় টিয়ারগার্টেনের আম স্প্রে-তে।

ইতিহাসে উল্লেখ, হত্যাকারী ‘রিঅ্যাকশনারি ট্রুপস’। কারা এই ট্রুপসে? রিঅ্যাকশনারি ট্রুপসের আসল চালনাকারীর হোতা কে? দোষী হিসেবে কিছু নাম বলা হয়, তথ্যে গোলমাল। ফলে বিভ্রান্তিও। রাশিয়াকেও দায়ী করেন কেউ-কেউ। যেমন করেছে বহুমান্য সাপ্তাহিক ‘ড্যের স্পিগেল’। করলেও ‘যথাযথ’ প্রমাণের ‘অভাব’। সঠিক কিছু বলা হয়নি।

রোজা লুক্সেমবুর্গকে বাঙালি পাঠককুলে বিশদ পরিচয় করিয়েছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিশেষত, রোজার পত্রগুচ্ছ অনুবাদ করে।

রোজাকে জার্মানরা বলেন ‘রক্তময়ী রোজা’ (ব্লটিগে)। কারণও আছে। জন্ম থেকে না হলেও কিশোরী তথা স্কুল বয়সেই (জন্ম: ৫ মার্চ ১৮৭১। পোল্যান্ডের ৎসামোসচে। পোল্যান্ড তখন রাশিয়া সাম্রাজ্যের অধীনে। ইহুদি বংশে জন্ম। পিতামাতার পাঁচ সন্তানের কনিষ্ঠ) বিপ্লবী, ‘রক্তময়ী বিপ্লবী’।চলে গিয়েছেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। গিয়ে সংগঠক, আরো বেশি তৎপর, বিপ্লব আরাধ্য, কমিউনিজম প্রতিষ্ঠাই ব্রত।

এই প্রতিবেদনে বিস্তারিত লেখার সুযোগ নেই (সংবাদপত্রে শব্দ, লাইন নিয়ন্ত্রিত), স্বল্প বয়ানে রোজার জীবনী, আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বেরিয়েই জেলে। ছাড়া পেয়ে সুইৎজারল্যান্ডের ৎসুরিখে (জুরিখ) আস্তানা (১৮৯৮)। এখানে আইন এবং ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’ পড়েন। মাস্টার্স ডিগ্রি। ডক্টরেটও করেন। হয়ে যান ‘ডক্টর রোজা লুক্সেমবুর্গ।’ হলে কী হবে। অস্থিমজ্জায় বিপ্লব, কমিউনিস্ট। ৎসুরিখে থাকাকালীনই ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট আন্দোলনে প্রবল সক্রিয়, সঙ্গে গিয়র্গে ভালেনটিনোভিচ এবং পাভেল আলেক্সরোড, দুই কমরেড। দুই কমরেড রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক আন্দোলনেও ‘জঙ্গি’, যোদ্ধা। দুই যোদ্ধার সঙ্গে বিরোধও। লেনিনের ‘সমাজ ও বিপ্লবী তত্ত্ব-আন্দোলন’ নিয়ে। এমনকি লেনিনের সঙ্গেও। চ্যালেঞ্জ করেন রাশিয়ান এবং পোলিশ সোশ্যালিস্ট পার্টিকেও (উল্লেখ্য, পোলিশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক-এর (পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা)। যা, পরে পোলিশ কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে খ্যাত।

ৎসুরিখে থাকাকালীনই সহপাঠী লিও ইয়োগিসের সঙ্গে বন্ধুতা, বছর কয়েক একত্রে বাস, পরে বিয়ে করেন জার্মান গুস্তাফ্‌ ল্যুইবেককে। হয়ে যান জার্মান নাগরিক।

বলা প্রয়োজন, রোজা লুক্সেমবুর্গই স্পার্টাকাস লিগের মূল প্রতিষ্ঠাতা, যদিও বলা হয় কার্ল লিবক্রেস্ট সঙ্গী।

রোজার বিপ্লবী মতবাদে একসময়ের কমরেড (বন্ধু) ছিলেন এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন, তাঁর সঙ্গে তীব্র ঝামেলা (এডুয়ার্ডের থিয়োরি ছিল, ‘মার্ক্স আউটডেটেড’)। রোজা মানতে নারাজ। কেন, লেখেন (পরে) ছোট্ট পুস্তিকা (Die krise der Sozialdemokratie-The Crisis in the Germen Social Democracy), লেখেন য়্যুনিয়ুস (JUNIUS)ছদ্মনামে।-প্রসঙ্গত স্মরণীয়, বলশেভিকের প্রভাব, প্রতাপের গাড্ডা থেকে বেরিয়ে রোজা ও কার্ল জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সূচনা করেন।

পূর্ব ইউরোপের নানা দেশে দেখেছি (রাশিয়ার মস্কোয়, সেন্ট পিটার্সবুর্গেও) রোজা লুক্সেমবুর্গের নামে সড়ক, স্কুল। রোজার জীবনীপাঠ্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে (পূর্ব ইউরোপে এখনও আছে কি-না, অজানা)। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়ারভানে দেখি রোজা (লুক্সেমবুর্গ) পার্ক। পার্কে বিশাল মূর্তি। য়্যুক্রেনের রাজধানী কিয়েভেও রাস্তা ও পার্ক (এখনও আছে কি-না, অজানা)।

জার্মানির নানা শহরে (বিশেষত তৎকালীন পূর্ব জার্মানি) রোজার নামে পার্ক, রাস্তা, স্কুল। বার্লিনে রাস্তা, পার্ক, মেট্রো স্টেশন।

রোজা-হত্যার শত বছর স্মরণে বার্লিনসহ জার্মানির প্রায়-প্রতিটি শহরে হরেক অনুষ্ঠান। সপ্তাহব্যাপী। ডজনখানেক বইও প্রকাশিত। একটি বইয়ের শিরোনাম: ‘রোজা, ডু বিস্ট ইন মাইনে হারৎস্‌’ (রোজা, তুমি আমার হৃদয়ে)।

রোজা ফেমিনিস্টদের (নারীবাদী) মনমননে কত বড় বিপ্লবী, দেখি বার্লিনের বিশাল সড়ক কুদামে (ক্যুরফুরস্টেনডাম), দুই হাজার বা তিন হাজার নারীর মিছিল, প্রত্যেকের হাতে রোজার ছবি, বুকে রোজার ছবি।

-জার্মান নারীবাদীর তিনিই প্রতীক এখন। তিনিই ‘ব্লাডি’ (ব্লুটিগে) নারী। পুরুষকুলের কুর্নিশ।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ