মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতি ও আফজাল দম্পতি

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:২৪, জানুয়ারি ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, জানুয়ারি ১৬, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাস্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিক্যাল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ বিভাগের কর্মী মো. আফজাল হোসেন এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। তার মাসিক বেতন মাত্র ২৪ হাজার টাকা হলেও তিনি মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিলাসবহুল একটি বাড়ি কিনেছেন। তার স্ত্রী রুবিনা একজন স্টেনোগ্রাফার। ২০ হাজার টাকার মতো মাসিক বেতন পেয়ে রাজধানী ঢাকায় বেশ কয়েকটি ভবনের মালিক। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে এসব বেরিয়ে এসেছে। দুদক বলছে, আফজাল দম্পতির নামে রাজধানীর উত্তরায় ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে তিনটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। বাড়ি নম্বর ৪৭, ৬২ ও ৬৬। ১৬ নম্বর রোডেও আছে পাঁচতলা একটি বাড়ি। বাড়ি নম্বর ১৬। এছাড়া রয়েছে উত্তরার ১১ নম্বর রোডে একটি প্লট (প্লট নম্বর ৪৯)। এছাড়াও ঢাকা ও ফরিদপুরে বিভিন্ন জায়গায় তাদের এরকম আরও বেশ কিছু প্লট ও বাড়ি রয়েছে। দুদকের কাছে জমা দেওয়া সম্পদের বিবরণীতে এই দম্পতি জানিয়েছেন, তাদের ১২ কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে।
মানুষের মনে প্রশ্ন, চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মীর যদি এত অর্থ সম্পদ থাকে তাহলে প্রথম শ্রেণি ওয়ালাদের না জানি কী আছে!

সরকারি দফতর পরিদফতরের এই চেহারাটা সবার জানা। তবু এবারের মন্ত্রিসভায় যারা নতুন এলেন তারা নানা প্রকার আশার কথা শোনাচ্ছেন আমাদের। আবার যারা আগে থেকেই ছিলেন তারাও বলছেন নতুন ভিশনের কথা। পূর্তমন্ত্রী বলছেন, একটি স্থাপনাও আর নিয়ম না মেনে হবে না, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ জানানোর সুবিধার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওয়েবসাইটে ‘অভিযোগ কর্নার’ থাকবে। অর্থমন্ত্রী বলছেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন তিনি। এমন করে প্রায় সব মন্ত্রীই নতুন স্বপ্নের বীজ বুনছেন প্রতিদিন।

কিন্তু আমাদের ক্ষমতা কাঠামোতে যে ধরনের প্রশাসন আছে, সেটা দিয়ে কি সম্ভব জনগণকে প্রকৃত সেবা দেওয়া? যখন যে সেবাটি প্রয়োজন সেটি যথাযথভাবে ‌এবং ঠিক সময়ে দিতে পারলেই বলা যায় প্রশাসন সার্থক। এই দেশে সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এই ‘যথাসময়’ বা ‘যথাযথভাবে’ শব্দগুলো যেন বড় বেমানান। জনগণের করের অর্থে যে সরকারি আইন ও সেবা কাঠামো গড়ে উঠছে, তা পাওয়া জনগণের অধিকার হলেও জনবিচ্ছিন্ন আমলারা তা দিতে নারাজ। জনসেবক না ভেবে তারা হয়ে উঠেছেন জননির্যাতক। এটি একদিনে হয়নি। দল যায় দল আসে, সরকার পরিবর্তিত হয় বা নবরূপ পায়, তাতে প্রশাসন কখনও জনগণের হয়ে ওঠে না।

বাংলাদেশে যে বিষয়টি সবচেয়ে সত্যি তা হলো যোগাযোগ। হাসপাতাল, ভূমি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত, কর কার্যালয়, পৌরসভা, জেলা পরিষদ– যেখানেই কাজ থাকুক না কেন, ক্ষমতা কাঠামোর মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে কোনও সেবা পাওয়া নিশ্চিত নয়। আবার যোগাযোগ থাকলেই চলবে না, অর্থও ব্যয় করতে হবে। নতুন সরকারের মন্ত্রীরা এগুলো জানেন। এই চক্র ভেদ করে জনগণের কাছে প্রশাসনকে নিয়ে যাওয়া কঠিন। অফিসে অফিসে হেঁটে হেঁটে জুতোর শুকতলা খুইয়ে ফেলার পর অনেকেই আবিষ্কার করেন যে, স্পিড মানি তথা ঘুষ না দিলে কোনও জায়গা থেকেই কোনও সাহায্য পাওয়া যায় না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা চান, তার মন্ত্রীদের কথায়ও সেই সুর– তারা কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তন করতে আগ্রহী। কিন্তু অত্যন্ত নিম্নমানের এই কর্মসংস্কৃতির বড় পরিবর্তন সত্যি খুব কঠিন। প্রায় সব সরকারই এই কথাটি বলে, এমনকি অনির্বাচিতরাও এমন আশ্বাস দিয়ে ক্ষমতায় বসেছে বহুবার। কিন্তু সিস্টেম বদলায়নি। সরকারি প্রশাসনকে সবার জন্য করে তোলার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েও তা করা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত দুই মেয়াদে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ সুবিধাদি যেভাবে বাড়িয়েছেন, তাতে তাদের জীবন এমনিতেই অনেক বিলাসী হয়ে উঠেছে। প্রত্যাশা ছিল ঘুষ সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আনবে এই বেতন বৃদ্ধি। কিন্তু আসেনি যে, তার বড় প্রমাণ আফজাল দম্পতি। এই লেখা যখন লিখছি, তখন হাতে এলো শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের ভয়ঙ্কর সব দুর্নীতির কিছু কাগজপত্র।

মন্ত্রীরা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সেগুলোকে গুরুত্ব দিতেই হবে। কতটা তারা পারবেন সেটা পরের কথা। কিন্তু প্রথম কাজ হবে মানুষের অভিযোগ শোনা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়েবসাইটে অভিযোগ কর্নারের আইডিয়াটি ভালো। নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বা নীতিনির্ধারকরা অভিযোগসমূহ দেখে সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করবেন। তবে এখানেও দিনশেষে আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ হবে এবং একসময় এটি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সরকারি লোকজনের ক্ষমতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে তাদের সংশ্রব কমিয়ে আনতে পারলে দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে অনেকখানি। যতটা সম্ভব সরকারি সেবা পরিসেবা পাওয়ার বিষয়সমূহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যেতে পারলে ঘুষের সুযোগ কমবে বলেই আশা করা যায়।  

সমস্যাপীড়িত মানুষরা কথা বলতে চায়। একটা ব্যবস্থা করা দরকার সেই কথা শোনার। মন্ত্রীরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই বলতে চাই, নিম্ন থেকে উচ্চ সরকারি মহল পর্যন্ত সবাইকে কর্মসংস্কৃতি-সচেতন করে তুলতে পারলে কাজ হবে ঠিকই। পুরোটা না হোক, কিছুটা হলেও মানবিক প্রশাসন যদি এই পাঁচ বছরে পাওয়া যায়, তবেই এই মন্ত্রীদের মানুষ মনে রাখবে চিরদিন।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ