ত্রিশ সেট অলংকার এখন ‘সংরক্ষিত পঞ্চাশ’?

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৬:৫১, জানুয়ারি ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪২, জানুয়ারি ২০, ২০১৯

আহসান কবিরজ্যামে আটকানো সিএনজি। হকারের কাছ থেকে একটা দৈনিক পত্রিকা কিনে পড়া শুরু করলো ড্রাইভার। পুঁথি পাঠের মতো খানিকটা সুর করে সে পত্রিকা পড়ে। দৈনিকের একটা শিরোনাম সুর করে পড়ার পর সেটা আমার কানে বাজতে থাকলো অনেকটা সুরের তালে তালে—‘সব নায়িকাই এমপি হতে চান! এফডিসি ও ঢাকার নাটকপাড়া এখন শূন্য!’
ভয়াবহ জ্যামে সিএনজির ভেতর সুর করা খবর শুনতে শুনতে কবি মোহাম্মাদ রফিকের কথাই প্রথম মনে পড়লো। স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর কবি লিখেছিলেন– ‘সব শালা কবি হবে/পিপীলিকা গো ধরেছে উড়বেই! বন থেকে দাঁতাল শূয়োর রাজাসনে বসবেই!’ জীবনানন্দ অবশ্য আগেই লিখে গিয়েছিলেন– সবাই কবি না,কেউ কেউ কবি। তবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও এরশাদের কথাও মনে পড়ে যাবে এ কারণে যে তাদের আমলে ত্রিশজন মহিলা এমপিকে সংরক্ষিত আসনে নেওয়ার ট্রেন্ড শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-এর নির্বাচনের সময় সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ছিল ১৫। নারীর শিক্ষা, উন্নয়ন, নিজ উপার্জনের সুবিধাসহ তাদের অগ্রগতিতে সে সময়কার উদ্যোগ সঠিক ছিল, যদিও এই ১৫ জন নারী পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হতেন। তখনকার সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের নিয়ে তেমন আলোচনাই হয়নি। কিন্তু এরশাদ আমলে অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে ত্রিশজন নারী সাংসদের মনোনয়ন নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছিল। সে সময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ শিরোনাম দেওয়া হয়েছিল– ‘সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার!’ এরশাদ পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করেন। যায়যায়দিন তার আমলে দুইবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার-এর সংখ্যায় কার্টুননির্ভর যায়যায়দিনের প্রচ্ছদ একেঁছিলেন বিখ্যাত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা এখন বেড়েছে। সেটা বলার আগে ‘সব নায়িকাই এমপি হতে চান’ সংবাদের কথা খানিকটা বলি। ওই দৈনিকে শিরোনামের পর লেখা হয়েছে– ‘নায়িকাদের দৌড়ঝাঁপ এখন সবখানে। যেকোনও অনুষ্ঠান থেকে নেতাদের বাড়ির দরোজা খুললেই নায়িকারা মেকআপ দেওয়া সাজগোজ করা হাসিমুখ নিয়ে হাজির।... এমনকি বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে যারা ছিলেন জিসাস (জিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠন) বা জাসাসে (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা) সক্রিয়, ছিলেন হাওয়া ভবনের মুখ, এমনকি গিয়াসউদ্দীন আল মামুনের বান্ধবী সেই নায়িকারাও এখন রাতারাতি জার্সি বদলে আওয়ামী লীগ হয়ে দলের মহিলা এমপি হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন!’ পত্রিকার রিপোর্টের মতো ফেসবুকে কেউ কেউ স্ট্যাটাস দিয়েছেন এমন–এফডিসি চলে যাচ্ছে সংসদে! কেউ দিয়েছেন—এবার সংসদে বসবে নায়িকাদের মিলনমেলা। সংরক্ষিত ৫০ আসনের ৪২ আওয়ামী লীগের, বাকিদের আট।

সে যা-ই হোক, এবার ইতিহাসের দিকে একটু মুখ ফেরাই। অষ্টম সংসদে সংবিধানের দশম সংশোধনী পাস হয় এবং এই সংসদেই চতুর্দশ সংশোধনী গৃহীত হয়। এই সংশোধনী অনুসারে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। এরপর ২০১১ সালের জুন মাসে পঞ্চদশ সংশোধনী গৃহীত হয় এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা সাংসদদের যা সুবিধা প্রাপ্য, সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদদেরও তা-ই। বেতন ভাতা,বাসস্থান সুবিধা, শুল্কমুক্ত গাড়ি, প্লট পাওয়ার সুবিধা, ব্যবসা করার সহজতা অর্থাৎ ক্ষমতার হালুয়া-রুটির হাতছানিই আসল।

পৃথিবীজুড়ে নারী আন্দোলনের মূল চেতনার সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক এই সংরক্ষিত নারী আসনের কোটা। সারাদেশে যখন কোটা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল তখন সরকার সেটা ভালো চোখে দেখেনি। যারা কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছিল তারা চেয়েছিল মেধার ভিত্তিতে সবকিছু করা হোক, অর্থাৎ সরকারি চাকরি হোক। তারা মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী বা অনগ্রসর মানুষের কোটা একবারে বন্ধ করে দেওয়া হোক সেটা চায়নি। যদিও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের অনেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো নিয়ে কখনও কোনও আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। বরং নারী আসন যখন ১৫ থেকে ৩০-এ বাড়ানো হয়, তখন এটা নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছিল। এ কারণে পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিল– ‘সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার’। সেই অর্থে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদদের বলা  যায় ‘নির্বাচিত পঞ্চাশ অলংকার!’

দেশের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলে নারী নেতৃত্বের কারিশমা সারা পৃথিবীতে আলোচিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও রওশন এরশাদ রাজনীতিতে তুমুল আলোচিত তিন নারী। বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী একজন নারী। সাজেদা চৌধুরী, জোহরা তাজউদ্দীন, সেলিমা আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, আইভী রহমান, সেলিনা হায়াৎ আইভীসহ আরও অনেক নারীনেত্রী স্বমহিমায় উজ্জ্বল। এই উজ্জ্বল নারীরা কারও অনুগ্রহে আসেননি রাজনীতিতে, সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে জিতে সংসদে গিয়েছেন, বারবার প্রমাণ করেছেন তারা পুরুষের চেয়ে কম নন, তারা যোগ্য এবং কারো অনুগ্রহের পাত্র নন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে অর্থাৎ একাদশ সংসদ নির্বাচনে ২০ জন নারী সরাসরি ভোটে জিতে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, যার ভেতরে আওয়ামী লীগ থেকে জিতেছেন ১৮ জন।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সমালোচিত সাংসদ শামীম ওসমান ও তার সহোদরদের বিপক্ষস্রোতে রাজনীতি করতে এসেছিলেন বাংলা ছবির ‘মিষ্টিমেয়ে’ খ্যাত কবরী। তিনি একদা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি এবার সংরক্ষিত নারী আসনের ফরম কিনেছেন। এই তালিকায় আছেন সুজাতা, আনোয়ারা, অঞ্জনা, দিলারা, মৌসুমী, শাহনুর ও পূর্ণিমার নাম। আরও আছেন সুবর্ণা মুস্তাফা, শমী কায়সার, তারিন, তানভীন সুইটি, জ্যোতিকা জ্যোতি ও চয়নিকা চৌধুরী। সম্ভবত ২০৪৪ সাল পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

কেউ না চাইলেও সংসদে আইন করে সংরক্ষিত নারী সাংসদদের সংরক্ষণের বছর ক্রমশ বাড়ানো হয়েছে। ১৯৭৩ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ছিল ১০ বছর। সর্বশেষ ২৫ বছর মেয়াদ করা হয়েছে অর্থাৎ ২০৪৪ সাল পর্যন্ত এই সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ থাকবে। সংরক্ষিত নারী আসনের কোনও এমপির জন্য কোনও আসন বা এলাকা সংরক্ষিত থাকে না। হয়তো কখনও-সখনও প্রধানমন্ত্রী কাউকে কোনও বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। বরং নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে সংরক্ষিত আসনের এমপিদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের খবর পত্রিকায় দেখা যায়। খবরে দেখা মেলে কোনও সংরক্ষিত নারী এমপির স্বামী বা ছেলের কেলেঙ্কারি। কারো ছেলে হয়তো নেশাতুর হয়ে গুলি করে জোড়া খুন করে। কারো ছেলে হয়তো গাড়ির তলে মানুষ পিষে মারে। কোনও সংরক্ষিত এমপির ছেলে হয়তো ফেন্সিডিল বা নারীসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।

আওয়ামী লীগের কেউ কেউ অবশ্য বলার চেষ্টা করেছেন যারা দলের জন্য বিগত সময় অনেক স্যাক্রিফাইস করেছেন, সংরক্ষিত আসনে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নির্বাচনে জোট করার কারণে অথবা অন্য যেকোনও কারণেই হোক, পরীক্ষিত নেতাদের মধ্যে যারা গেলো নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি তাদের স্ত্রী বা কন্যাকে মনোনয়ন দেওয়ার কথাও বিবেচনায় রয়েছে! এই বিবেচনা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের একাদশ নির্বাচনেও অন্তত দুই আসনে করা হয়েছিল।

সারা পৃথিবীতে অভিনেতা অভিনেত্রীদের রাজনীতিতে আসার প্রবণতা আছে। আমেরিকায় আরনল্ড সোয়ার্জিনেগার কিংবা রোনাল্ড রিগ্যানরা যেমন অভিনয় জীবন ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন, ভারতে অমিতাভ বচ্চন, জয়া বচ্চন, জয় ললিতা, হেমা মালিনীরাও একসময় রাজনীতিতে এসেছিলেন। বিখ্যাত এই মানুষেরা কেউ কারো অনুগ্রহের ওপর ভর করে আসেননি। শেখ হাসিনার চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তি পালন করবে। স্বাধীনতার এত বছর পরও নারীদের কেউ কেউ লাইনে দাঁড়াবেন ক্ষমতার হালুয়া-রুটির স্বাদ পেতে সরকারি অনুগ্রহ বা কৃপা লাভের জন্য! তিনশত আসনে নির্বাচিত এমপিদের ন্যূনতম হলেও কমিটমেন্ট থাকে। কারণ, তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্দিষ্ট আসন বা এলাকা না থাকা এবং সংরক্ষিতরা ক্ষমতাসীন সরকারের অনুগ্রহে পদ পান বলে তাদের কোনও কমিটমেন্ট থাকে না।

একাদশ সংসদে যে ২০ নারী জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে জিতেছেন তাদের স্যালুট। ‘সংরক্ষিত’ আসন যদি রাখতেই হয় তাহলে সেই আসনেও নির্বাচনের বিধান থাকা উচিত।

লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ