ডাকসু: রাজনীতির আলো জ্বলবেই

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:১৮, জানুয়ারি ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২০, জানুয়ারি ২৬, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহভোট আসছে। যে  ভোটের প্রত্যাশায় ছিলাম আমি। যে ভোটের দাবিতে কথা বলে আসছি বছরের পর বছর। বাংলা ট্রিবিউনের এই মঞ্চ এবং টেলিভিশনেও নানা প্রসঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অনিবার্যতা। গত মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ডাকসু নির্বাচন দেওয়ার অনুরোধও রেখেছিলাম। ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল গত মেয়াদেই, ডাকসু’র নির্বাচন দেওয়া হবে। তালাবদ্ধ ডাকসু এবং হল সংসদগুলোর দুয়ার খুলে যাবে। শুধু কি কোনও ভবন বা কক্ষের দুয়ারই খুলছে? মোটেও না। আসলে মার্চের বসন্ত দিনে নেতৃত্ব তৈরির দখিন দুয়ার খুলে যাচ্ছে। সর্বশেষ ডাকসু এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা এখন নিজ নিজ দলে প্রবীন নেতার কোটায় পৌঁছে গেছেন। জাতীয় সংসদেও সেই সময়কার নেতাদের উপস্থিতি প্রায় নিঃশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হওয়ার ফলে রাজনীতিতে যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার বড় প্রমাণ এখন টেলিভিশন টকশো। রাজনীতি, বক্তৃতা মাঠ-ময়দান থেকে চারকোনা বাকসোতে বন্দি এখন। দিনে-রাতে সেখানে যারা বক্তব্য রাখছেন রাজনৈতিক নেতার পরিচয়ে, তাদের বক্তব্য পুষ্টিকর নয়। খনিজের ঘাটতি আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ এদের বেশিরভাগই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রাজনীতিতে যুক্ত হননি। নানা পেশা থেকে এসে রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়েছেন। ১৯৯০ পরবর্তীতে যারা রাজনীতিতে এসেছেন, তারা নির্দিষ্ট কোনও নেতার হাত ধরে বা আশির্বাদ নিয়ে একের পর এক সিঁড়ি টপকে এসেছেন। ছাত্র রাজনীতি নেই বলে নেতা তুষ্টকরণ রাজনীতির অভিজ্ঞতাই তাদের।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা হল সংসদ কেন্দ্রীক রাজনীতি যারা করেছেন, তারা সাধারণ ছাত্রমুখি ছিলেন। তাদের জবাবদিহিতা ছিল সাধারণ ছাত্রদের কাছে। সেই সময়েও যে ছাত্রনেতা-কর্মীরা মূল দল বা বড় নেতাদের দ্বারা প্রভাবিত বা ব্যবহৃত হতেন না, এমন দাবি করছি না একচ্ছত্রভাবে। তবে তাদের বক্তৃতা  ও নেতা সুলভ গুণের বিনিময়েই সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মন ও নজর কাড়তে হতো। মূল দল ও বড় নেতারাও তখন মেধাবী ও বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী ছাত্র, কর্মী বা নেতাকে বেছে নিতেন দলের বড় পরিসরের জন্য। অস্ত্রের ব্যবহার সেই সময়েও হয়েছে। হল দখল, ক্যাম্পাস দখলে রাখার শক্তি পরীক্ষার জন্য। কিন্তু একাজে শিক্ষার্থীদের দায়ী করার সুযোগ নেই। বড়রা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে ছাত্রদের হাতে অস্ত্র এবং টাকা তুলে দিয়েছিল। যার উত্তাপে রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিল একের পর এক ক্যাম্পাস। বড়দের মর্জির খেলনায় পরিণত হওয়ার পরেও, ক্যাম্পাসে-হলে সাহিত্য,সংস্কৃতি ও খেলাধুলার অনুশীলন হতো। সন্ত্রাসের দেয়াল টপকে নেতাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সহিষ্ণুতা ছিল। এখন এই গুণগুলোও ছাত্র রাজনীতিতে অনুপস্থিত।

ভোট পূর্ব এখনকার পরিস্থিতি হলো– ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত। বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। সরকারে যে দল যখন ছিল তখন তার আধিপত্য ছিল, থাকবেই। আর দীর্ঘদিন সরকারে না থাকায় ছাত্রদল ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক ভাবেই কোণঠাসা। জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি’র অবস্থানের প্রভাব তার ছাত্র সংগঠনের ওপর পড়বেই। বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর শ্লোগান– সমাবেশ ক্যাম্পাস কখনও কখনও মুখরিত করে। তাদেরও ডাকসু নির্বাচনের দাবি ছিল। তারা নিশ্চয়ই এই নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নেবে। তবে ডাকসু’র একটি সফল নির্বাচনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে ছাত্রলীগকে। অন্যান্য দলকে ক্যাম্পাস ও হলে অবস্থান করা বা নেওয়ার সহিষ্ণুতা দেখাতে হবে তাদের। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এমন একটা আশাবাদের কথা শোনা গেছে। কিন্তু বাস্তবে তার কতটুকু তারা প্রদর্শন করতে পারে, সেটি  ভোটের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলবে। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যসহ সব মতের শিক্ষকদের হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে সম্মিলিত ভাবে কাজ করা দরকার। এই তাড়না ছাত্রদের মধ্যেও থাকা উচিত। কারণ নতুন নেতৃত্ব তৈরির আঁতুড় ঘর বন্ধ রাখার ষড়যন্ত্র যারা করেছিলো, তারা আবারও সুযোগ নিতে পারে। তাই নিজেদের স্বার্থে ছাড় দিয়ে হলেও বন্ধ দুয়ার খুলতে হবে। ডাকসু’র দুয়ার খুলে গেলে একের পর এক দেশের সব ছাত্র সংসদের দুয়ার খুলবে। যার ফলে রাজনীতি থেকে নিপাত হবে মৌসুমী ও উচ্চফলনশীল জাতের প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ