এ জানা লজ্জার নয়!

Send
ফারহানা মান্নান
প্রকাশিত : ১৫:৫৯, জানুয়ারি ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০০, জানুয়ারি ২৬, ২০১৯

ফারহানা মান্নান‘জাস্ট ফর গার্লস’ এবং ‘জাস্ট ফর বয়েজ’– এই বই দুটো প্রায় মাস খানেক আগে আমার হাতে আসে। বই দুটো বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে ও মেয়েদের নানা শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক পরিবর্তন সম্পর্কে আলোকপাত করেছে এবং সেটা বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে ও মেয়েদের উপযোগী করেই।
‘জাস্ট ফর গার্লস’ বইটিতে ‘বডি টক’ নামক অধ্যায়ে মেয়েদের ব্রেস্ট ডেভেলপমেন্ট, মাসিক, ব্রণ, খাদ্যাভ্যাস, বডি ইমেজ সহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ‘ইওর ইমোশন্স’ অধ্যায়ে আবেগের নানা পরিবর্তন, এ সময়ে আস্থাভাজন যাদের সঙ্গে কথা বলা যায়, নিজের ভেতরের আবেগকে বোঝানো, রোমান্স সহ আরও নানা বিষয়গুলো লেখায় এসেছে। এছাড়াও ‘বয় স্টাফ’ নিয়ে একটি অধ্যায় আছে।
‘জাস্ট ফর বয়েজ’ বইটির প্রথম অধ্যায়টি শুরু হয়েছে ‘কেন আমি? কেন এখন? কী হচ্ছে?’ নিয়ে। এরপর ‘দ্য ফেক্টস এবাউট ইওর বডি’ অধ্যায়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে চুলের আবির্ভাব, শেভিং, পিনিস, ভয়েস চেঞ্জসহ আরও বেশ কিছু বিষয় এসেছে। পরের অধ্যায়গুলো ‘হেলথ এবং ফিটনেস’, ‘মেয়ে, মেয়ে, মেয়ে’, ‘অনুভূতি ও অস্বস্তি’ সহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে লিখেছে।
আসলে বুক রিভিউ এই লেখার উদ্দেশ্য নয় বরং উদ্দেশ্য হলো বয়ঃসন্ধিকালের নানা পরিবর্তনের বিষয়গুলো উল্লেখ করা। বয়ঃসন্ধিকাল এক অদ্ভুত সময়! আমি নিজে মেয়ে হিসেবে সেই সময়গুলোর কথা প্রায় ভাবি। আবছা আবছা ধারণা নিয়ে জানতে পেরেছিলাম মেয়েদের মাসিক হয় তবে কখন হয়, কী হয়, কতদিন স্থায়ী হয়, কিভাবে নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়  এ বিষয়গুলো জানা হয়নি। আর কেউ সেভাবে বলেওনি। আমার মাসিক শুরু হয়েছিল হঠাৎ স্কুল থেকে ফেরার পথে। বাড়ি ফিরে মনে পড়ে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কাপড় পরিষ্কার করতে বসে গিয়েছিলাম। তখন ভাবনায় ছিল যেটুকু রক্ত গিয়েছে এই শেষ। তবে মাসিকের যে সাইকেল থাকে আর সাইকেলের শুরুর দিকেও যে ফ্লো হেবি হয় সেটাও জেনেছি পরে।
শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পরিবর্তন নিয়েও বেশ কৌতূহলে ছিলাম আমি। কেন শরীরের বিভিন্ন অংশে হঠাৎ চুল গজাতে শুরু করে দিল সেটাইতো বুঝতে পারছিলাম না। ব্রেস্ট ডেভেলপমেন্টের সময় একটা আতংক দেখা দিয়েছিলো মনে। আতঙ্কের শুরুটা ছিল গাউছিয়া মার্কেটে। আমার এক গৃহ শিক্ষক এর নামকরণ করেছিলেন ‘গা ছোয়া’। একাধিকবার মনে পড়ে ভীড়ে ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছিলাম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাড়িতে আলাপ করা হয়নি আর করলেও সমাধান ছিল ওড়না ভালো করে জড়ানো, সামনে ব্যাগ বা এই টাইপের কিছু জড়িয়ে ধরা বা হাত দিয়ে আড়াল করে রাখা। একবার ভেবে দেখুন, এ সমাধানগুলো কিন্তু মেরুদণ্ডকে সোজা করে চলার সমাধান নয়।
এ জায়গায় সমাধান হতে পারে বডি শেপ অনুযায়ী উপযুক্ত পোশাক ও ইনারস পরা, হতে পারে বয়ঃসন্ধিকালের স্বাভাবিক পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে জানা, হতে পারে বাবা ও মায়ের সঙ্গে এই পরিবর্তন সম্পর্কে সাধারণ কনভারসেশন।
আরও একটা বিষয় যেটা আমার ভেতরে ছিল না কিন্তু আমি অন্যদের মধ্যে খেয়াল করেছি, বয়ঃসন্ধিকালের সময়ের মানুষেরা বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরির ক্ষেত্রে ঠিক কনফিডেন্ট নয়। একটা কারণ যেটা দেখে, পড়ে ও গবেষণায় বুঝেছি সেটা হলো এরা বিপরীত লিঙ্গের মানুষগুলো সম্পর্কে কৌতূহল রাখে ঠিক কিন্তু ওদের সম্পর্কে একপ্রকার জানেই না। যেটা বন্ধুত্ব তৈরির ক্ষেত্রে একটা দেয়াল তৈরি করে রাখে। যার সঙ্গে বন্ধুত্ব সেই মানুষ সম্পর্কে জানি না। তাহলে, আসলে জানতে হয়। একটা ছেলে ও মেয়ের শারীরিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকে এখন একে অপরের পরিবর্তন সম্পর্কে জানলে নানা ক্ষেত্রে দারুন সহমর্মিতা তৈরি হয়। বিশেষ করে ছেলেরা বা মেয়েরা তখন নিজেদেরকে বিপরীত লিঙ্গের বন্ধুর জায়গায় রেখে ভাবতে পারে। তবে এক্ষেতে তখন তাদের সোর্স অব ইনফরমেশন ভীষণভাবে ভূমিকা রাখে। সোর্স অব ইনফরমেশন অভিভাবক হলেই দারুন হয় তবে সেক্ষেত্রেও অভিভাবকদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক সুন্দর ও স্বাভাবিক রাখতে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো আমাদের সন্তানদের কি আমরা বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন সম্পর্কে জানাই? প্রস্তুত করি? ওপরে তিনটে বিষয় মাত্র উল্লেখ করেছি। এরকম অসংখ্য বিষয় আছে বয়ঃসন্ধিকালের। এগুলো সম্পর্কে বিশেষভাবে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের পড়াশোনা করার অনুরোধ জানাই। অভিভাবককে পড়তেই হবে কারণ তা না হলে সময়ের সঙ্গে সন্তানের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো সামলে চলবেন কী করে? ভালো বন্ধুত্ব বা আস্থা তৈরি হবে কেমন করে? আর শিক্ষক জানবেন এবং জানাবেন কারণ তারা মানুষ গড়ার কারিগর। কারিগর নিজেই যদি অজ্ঞ থাকেন তাহলে জানার পথ তার শিক্ষার্থীদের জন্য সুগম করে দেবেন কেমন করে?
অনেকক্ষেত্রে আমরা মনে করে থাকি, নিজেরাইতো বয়ঃসন্ধিকালের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। তাহলে? সব জানি। কিন্তু তাই কি সত্যি? একবার যাচাই করেই দেখুন না। আসলে সময়টা অতিক্রম করলে অভিজ্ঞতা লাভ হয় ঠিক কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতাকে শাণিত করতে পঠন ও পাঠনের প্রয়োজন আছে। কাজেই বিষয়ভিত্তিক জানা, তার প্রয়োগ সম্পর্কে জ্ঞান ও নিজের অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা অর্জন না হলে চলে না সেটা বয়ঃসন্ধিকালের সময় সম্পর্কে জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রেও একই।
কাজেই মোদ্দা কথা হলো এই বয়সটা, সময়টা আলাদা, ভিন্ন। ছোট্ট শিশুকে যেমন হাত ধরে চলতে শেখাতে হয় ঠিক তেমনি বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের মেরুদণ্ড সোজা করে চলা শেখাতে হয়। আমরা যে মানুষ, মানুষের মেরুদণ্ডইতো মানুষকে অন্য সব কিছুর চাইতে আলাদা করে ফেলে। আর সে মানুষ যদি আতঙ্ক নিয়ে, বন্ধুদের কাজ থেকে ভুল তথ্য পেয়ে, অভিভাবকদের কাছে লুকিয়ে শঙ্কা নিয়ে বড় হয় তাহলে সেটা ভয় ও লজ্জার বিষয়। আর বিশ্বাস করুন এ তথ্য জানতে লজ্জা নাই। কাজেই বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কে জানতে হবে এবং একই সঙ্গে সেক্স এডুকেশনের গুরুত্বকেও অনুধাবন করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালের সময়টাতে কনফিডেন্সের মাত্রা বাড়াতে সেক্স এডুকেশনের অবদান অসীম। বিশ্বাস করুন এ জানায় লজ্জা নেই! সত্যিই লজ্জা নেই।

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ