‘ডিসি অফিসের পিয়ন হোক আমাদের আদর্শ!’

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:২৯, জানুয়ারি ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, জানুয়ারি ২৮, ২০১৯

চিররঞ্জন সরকারচার বছরে আমানত দ্বিগুণ করে দেওয়ার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাগেরহাট ডিসি (জেলা প্রশাসক) অফিসের সাবেক পিয়ন (এমএলএসএস) আবদুল মান্নান তালুকদারের বিরুদ্ধে। মানুষ ঠকিয়ে আয় করা এই টাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন বেশ কয়েকটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিক্যাল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ বিভাগের কর্মী মো. আবজাল হোসেন দম্পতির শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার কাহিনিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
বাগেরহাট ডিসি অফিসের সাবেক পিয়ন আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবরক্ষকের বিপুল পরিমাণে বিত্তবৈভব অর্জনের কাহিনি পড়ে মনের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, অনিয়ম, প্রতারণা, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে যদি এসব ছোটখাটো কর্মচারীই শত শত হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হতে পারেন, তাহলে বড় বড় ‘স্যার’দের কী অবস্থা? তাদের সম্পত্তির পরিমাণ কত? তাদের সংখ্যাইবা কত? ‘বড়’দের প্রশ্রয়-সান্নিধ্য-অনুমোদন-যোগসাজশ ছাড়া ‘ছোট’রা কখনও এত বিপুল অংকের টাকার মালিক হতে পারে?

আমাদের সমাজে অনিয়ম-দুর্নীতি আর ঘুষের মাধ্যমে একশ্রেণির মানুষ খুব দ্রুতই ফুলেফেঁপে উঠছে। সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে ঘুষ খাওয়া তো এখন পানি পান করার মতো সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। অবশ্য ঘুষ নিয়ে তেমন কিছু বলারও নেই। এটা একেবারেই আমাদের মজ্জায় মিশে গেছে এবং অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যে জিনিসটার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ দরকার সেই গণতন্ত্র এখনও কেবল বুলিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও ঘুষ-দুর্নীতির পুরোপুরি ‘প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ ঘটে গেছে। এর অবশ্য কারণও আছে।

আমাদের সমাজের মানুষের নানা জনে নানা কিছু খায়। কেউ আমিষ খায়। কেউ নিরামিষ। কারও মাছ, ডিম না হলে গলা দিয়ে ভাত ঢোকে না। কেউ শাক পাতা, কচু-ঘেচুতে আনন্দ পায়। কেউ মদ, গাঁজা, ভাং, চরস খেয়ে সেলিব্রেট করে। কারোর আবার পছন্দ পান-জর্দা, গুল, খইনি। কেউ রসগোল্লা-সন্দেশ পেলে দিগ্বিদিক ভুলে যায়। কেউ মিষ্টির নাম শুনলে সাড়ে ছয় হাত ব্যাকফুটে চলে যায়। কেউ চকোলেট, আইসক্রিম, পেস্ট্রি খেয়ে চর্বির ফিক্সড ডিপোজিট বাড়ায়। ফিক্সড নিয়ম কোত্থাও নেই। তোমার যাতে খুব ফ্যাসিনেশন, আমার তাতে চূড়ান্ত অ্যালার্জি থাকতেই পারে। তুমি গদগদে টিভি সিরিয়াল গিলো তো আমার পছন্দ ন্যাশনাল জিওগ্রাফি। তুমি খবরের কাগজ খুলেই ধর্ষণের খবর খুঁজো তো, আমি চোখ রাখি বাইশ গজে। আবার কেউ সাদা ধবধবেতে সাবলীল তো আরেকজন ক্যাটকেটে সবুজ রঙের শার্ট ছাড়া পরতেই পারে না। বলতে গেলে এ লিস্ট জন্মেও ফুরোবে না। কারণ, পছন্দ-অপছন্দের উপপাদ্যটাই সেরিব্রাল লটঘটের ওপর ঠ্যাকনা মেরে আছে। যত মানুষ, তত তার খাওয়ার ভ্যারাইটি।

কিন্তু বিবিধের মাঝে আমি একখানা মহান মিলন আবিষ্কার করেছি। একলা দুপুরে খাটে শুয়ে ঠ্যাংয়ের ওপর ঠ্যাং তুলে, ভিড় বাসে গাদাগাদি করে দেড় পায়ে দাঁড়িয়ে বা নিশ্চিন্ত কমোডে রিলিজিং মুডে বসে সব জায়গাতেই আমি সলিড সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, সব ব্যাটাই ঘুষ খায় এবং গ্যাস খায়! নেতা টু অভিনেতা, সাদা টু কালো, লম্বু টু বাঁটকুল, গদি টু ম্যাডাম।

আমাদের মতো অতি এবং তস্য অতি সাধারণ মানুষের একটা ধারণা ভয়ঙ্করভাবে প্রবল। আইনের পোশাক পরা লোকেরা বেশি ঘুষ খায়­­­­– এ ধরণাও রয়েছে। তাদের নীতিই হলো ফেল কড়ি মাখো তেল! আমার অবশ্য এই লেনদেনকে ভিক্ষে ছাড়া আর কিছুই কস্মিনকালে মনে হয়নি। কেস, বিশেষ করে মার্ডার কেসটেস হলে তো এক পেশার মানুষ আনন্দে বগল বাজায়। তাতে বগল কেটে রক্ত বেরিয়ে পোশাক ভিজে গেলেও তাদের অসুবিধা নেই। শুনেছি পোস্টিং নিয়েও দরকষাকষি ‘মাল ঢালাঢালি’ চলে কিছু বিশেষ পেশার মানুষের মধ্যে। ব্যবসায়ী এলাকায় বা শিল্প এলাকায় পোস্টিং পেতে তারা নাকি তস্য বড় কর্তাদের কাছে ইজ্জত পর্যন্ত বন্ধক রাখে। এতে অবশ্য হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কেউ যদি করে-কম্মে খাওয়ার জন্য, একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-বিলাস-ভূষণের জন্য ঘি ঢালাঢালি করে, তাতে দোষের কি আছে?

দুর্নীতিবাজ-ঘুষখোরদের অনেকের মধ্যে আবার পরকাল ভীতি আছে। তেমন একজনের কাহিনি জানি। ভদ্রলোক প্রচণ্ড রকম আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী। সরকারি রাস্তা বানাতেন তিনি। তাই সেই দফতরের ওপরওলা ইঞ্জিনিয়ার টু এলাকার জনপ্রতিনিধি কাম সমাজসেবী ভাই সবাইকে তুষ্ট রাখতে হতো তাকে। স্বাভাবিকভাবেই রাস্তার কোয়ালিটি চটকে চামচিকে হয়ে যেত দু’দিনেই। আবার টেন্ডার ডাকা হতো। আবার তিনি কাজ পেতেন। এরকমভাবেই চলছিল। কিন্তু ওয়ান ফাইন মর্নিং তার সব কাজের বারোটা বেজে গেলো। কারণ, সরকারেরই লালবাতি জ্বলে গেল। ক’দিন পরে লোকটির চেহারাও পুরো অ্যানিমিয়াটিক হয়ে গেলো। চিন্তায় চিন্তায় সুগার এলো সুড়সুড় করে। হাইপারটেনশন ধরলো হুড়মুড় করে। বেকায়দা পরিস্থিতিতে পড়ে তিনি এক ‘বাবা’র দরবারে কান্নাকাটি করতে বসলেন। কাতরভাবে মানত করলেন, হে বাবা মহারাজ, হারামি ওই অফিসে তিরিশ লাখ টাকার বিল বাকি পড়ে রয়েছে। অন্তত পনেরো লাখ এখনি পাইয়ে দাও বাবা। তা হলে কথা দিয়ে যাচ্ছি, তোমার জন্য আমি অবশ্যই অর্ধেক টাকা মানে পুরো সাড়ে সাত লাখ টাকা দান করে দেবো! এরপর কান্নাকাটি, ধূপ, দীপ ইত্যাদি!

এরপর অলৌকিকভাবে ‘বাবা’র কেরামতিতে দুদিন পরেই কন্ট্রাকটর সাহেবের ডাক পড়লো সেই অফিসে। হেড ক্লার্ক তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন একটি সাড়ে সাত লাখ টাকার চেক।

কন্ট্রাকটর সাহেব বিগলিত হলেন। বহুদিন তিনি এত টাকা চোখে দেখেননি। ‘বাবা’কে তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন। তারপর চেকটি নিয়ে অফিসের বারান্দা থেকে তার প্রতি ভক্তি গদ গদ হয়ে বললেন, হে মহান বাবা, আমার কথা শুনে তুমি সেই টাকাই দিলে, কিন্তু আমাকে একটুও বিশ্বাস করতে পারলে না? নিজের পুরো সাড়ে সাত লাখ টাকা আগেই কেটে রেখে দিলে?

এ যুগে ঘুষ নিয়ে ঘুষোঘুষি করে কোনও লাভ আছে বলে মনে হয় না। কান পাতলে এখন বরং এমন কথা শোনা যায়:

পাত্র কী করে?

: সরকারি চাকুরে।

: তা উপরি কত?

: এ আবার কেমন কথা! সবাই কি ঘুষ খায়?

: কেন খাবে না? আরে ভাই যা দিনকাল পড়ছে, সংসারটা তো চালাতে হবে। মাসের বেতনের টাকা তো মোবাইল বিল দিতেই চলে যায়। তারপর বাসা ভাড়া, ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ, বউয়ের বায়না এসবও তো মেটাতে হবে নাকি?

এবার পাত্রপক্ষ ভাবতে বসেন। কিন্তু মুখ খোলেন না। কারণ, ঘুষই একমাত্র খাদ্য যা মুখ না খুলেই খাওয়া যায়। আসল কথা হলো, নগদ প্রাপ্তিতে সবাই খুশি। পিয়ন থেকে শুরু করে অফিসের বড় কর্তা সবাই তৎপর এই ঘুষের কারণে। তুমি আমাকে ঘুষ দাও আমি তোমাকে ফাইল দেবো। সহজ গাণিতিক সমাধান। ঘুষ না খেলে শুনেছি অনেক কর্মকর্তার হুঁশ থাকে না। ঘুষ পেলে তারা ‘খুশ’ থাকেন। মানুষের দেখাদেখি ‘পূর্ব-মানুষেরা’ও এখন ঘুষ খেতে শিখেছে। চিড়িয়াখানায় বানরের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে যতই ভেংচি কাটেন, বানর কিছুতেই সাড়া দেবে না। ও ঠিক ‘লিভ মি এলোন’ ভাব নিয়ে বসে থাকবে। একটা কলা ছুড়ে দিন। এবার দেখুন বানরের বাঁদরামো। আবার টিউবওয়েলের কথাই ধরুন। সকাল থেকে চাপাচাপি করছেন, পানি বের হচ্ছে না। অথচ যন্ত্রপাতি সব ঠিক আছে। টিউবওয়েলের মধ্যে একটু পানি ঢালুন। এবার চাপতে থাকুন। দেখবেন জোয়ারের মতো পানি বেরিয়ে আসছে। এ আসলে ঘুষের ব্যারাম। মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মতো ঘুষ নিয়ে ঘুষাঘুষিও এখন নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। পার্থক্য শুধু নামে। কেউ একে বলেন উপহার বা উপঢৌকন। কেউ বলেন ডোনেশন আবার কেউ বলেন পার্সেন্টেজ। কেউ কেউ স্পিডমানিও বলেন। এ চলছে, চলবে।

পুনশ্চ: যারা খুব ছোট পদে চাকরি করছেন বলে হীনম্মন্যতায় ভুগছেন, অল্প বেতন পান বলে হা-হুতাশ করেন, তারা বাগেরহাট ডিসি অফিসের সাবেক পিয়ন মান্নান অথবা স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবরক্ষক আফজালের পথ অবলম্বন করতে পারেন।

বড়লোক হওয়ার এমন সহজ সুযোগ বাংলাদেশ ছাড়া দুনিয়ার আর কোথাও পাবেন না!

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ