নারীর পোশাক

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৫০, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৭, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৯

শান্তনু চৌধুরীনারীর প্রতি অবমাননাকর বা নেতিবাচক চিন্তাগুলো কে যে কোথা দিয়ে সমাজের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে বা কারা কোন ফাঁকফোকর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে সহজেই বোঝা মুশকিল। ‘মুশকিল’ কথাটা এই কারণে বলা হলো, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এত এত নেতিবাচক বা অবদমিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে যে, এরাই হয়তো রাঙা সকালে প্রভাতের রঙিন সূর্যের গল্প শোনাবে আবার রাতের আঁধারে নারীকে ঠিক ভোগ্যপণ্য বানাবে বা নারীর প্রতি যতটা অবমাননাকর বা ঘৃণাক্ত শব্দ উচ্চারিত হতে পারে সেটি প্রয়োগ করবে। এরাই শিশু বা কিশোর মস্তিষ্কে গুঁজে দিতে চেষ্টা করবে নারীর পোশাক-আশাক কেমন হবে বা নারীর কী করা উচিত কী উচিত নয়।
বাংলা ট্রিবিউনসহ বেশ কয়েকটি অনলাইন ও দৈনিকে এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ না হলে হয়তো জানাই হতো না বিষয়টা। নবম-দশম শ্রেণির গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইয়ে ‘পোশাকের শিল্প উপাদান ও শিল্পনীতি’ অধ্যায়ে বলে দেওয়া হচ্ছে মোটা, খাটো, ফরসা, শ্যামলা মেয়েরা কেমন পোশাক পরবে। এবং এই বইটি পড়ানো হচ্ছে ২০১৩ সাল থেকে। আলোচনার সুবিধার্থে বইয়ের অধ্যায়ের কিছু বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা যেতে পারে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের বইটির উক্ত অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেকের পেছনের দিকে ঘাড়ের কাছে মাংস উঁচু হয়ে থাকে। ব্লাউজের গলার ছাঁটটিকে ওই মাংসপিণ্ডের ঠিক মাঝামাঝি স্থান দিয়ে নিলে ঘাড়ের কাছের ত্রুটি এত প্রকট হবে না। অধ্যায়টিতে মোটা, খাটো, ফরসা, শ্যামলা বর্ণের মেয়ে বা নারীরা কেমন পোশাক পরবেন, তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।  বেশি স্ফীত বুক ও প্রশস্ত কোমরের অধিকারীদের জন্য ঢিলেঢালা পোশাক উপযুক্ত।

বলা হয়েছে, ফরসা মেয়েকে যেকোনও রঙের পোশাকেই সুন্দর দেখাবে। গায়ের রঙ শ্যামলা হলে গাঢ় রঙ বর্জন করে হালকা রঙ নির্বাচন করতে হবে, যাতে তার গায়ের রঙ উজ্জ্বল দেখায়। আর যদি কেউ সঠিক পোশাক নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয় তার পরিণতি ভয়াবহভাবে তুলে ধরা হয়েছে সৃজনশীল অংশে। সেখানে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, সাবা ও সানা দুই বোন। উভয়ের গায়ের রঙ ফরসা হলেও দেহের গঠন ও আকৃতিতে দুজন একেবারেই বিপরীত। একদিন বিয়ের অনুষ্ঠানে দুজনই নীল রঙের শাড়ি পরে যায়। অনুষ্ঠানের সবাই পাতলা গড়নের সবার প্রশংসা করলেও সানার প্রতি কেউ তেমন আগ্রহ দেখায়নি। শিক্ষার্থীদের সাবার প্রশংসিত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে এবং সানার পরিধেয় পোশাক তার ব্যক্তিত্বের অন্তরায়, তা বিশ্লেষণ করতে হবে। এ ধরনের নানা ভয়াবহ বর্ণনায় ঠাসা এই বইয়ের অনেক অধ্যায়। আবার ষষ্ঠ শ্রেণির গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইয়ের ‘কৈশোরকালীন পরিবর্তন ও নিজের নিরাপত্তা রক্ষা’ বিষয়ক সপ্তম অধ্যায়ে কিশোরীদের দৈহিক পরিবর্তন নিয়ে সংকোচ দূর করতে উপযুক্ত পোশাক পরিধানের সুপারিশ করা হয়েছে। সেখানেও রয়েছে আপত্তিকর নানা বর্ণনা। সবচেয়ে আতঙ্কের কথা এই যে, এই বিষয়গুলোকে অপরাধ বলে মানতে রাজি নন খোদ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক মনে করেন বইগুলো লেখার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের কেউ কেউ। তার মানে শুরুতে যে কথাগুলো বলেছিলাম আমাদের গোড়াতেই গলদ রয়েছে। ছাগলকে গাছে তোলাসহ বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের পাঠ্যপুস্তক বোর্ড নানা কারণে নতুন বছরের শুরুতে বই দেওয়ার পর থেকে বইয়ের মাধ্যমে নানা বিতর্ক জন্ম দিয়ে থাকে। এর কিছু কিছু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে।

এমনিতে পোশাক মানুষের সুরুচির পরিচয় বহন করে। সেটি ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শেষের কবিতা’য় ফ্যাশন বলতে বুঝিয়েছেন মুখোশকে। যা মুখকে ঢেকে রাখে। সেটি কোনও কোনও সময় হয়তো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু মানুষের গায়ের রঙ, ধরন বা পোশাক নিয়ে কথা বলা এক ধরনের অপরাধই বটে। বিশেষ করে শিশু বা কিশোরকালে সেটি যদি মনের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয় সেই ধারণা নিয়ে বড় হতে থাকা মানুষটি সমাজকেও সেই চোখে দেখবে। আর সেটি হবে এক পিছিয়ে থাকা সমাজ। সেটি আমাদের দেশে একশ্রেণির ধর্মান্ধ বা কূপমণ্ডূক লোক তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে চায়। তারা নারীদের কীভাবে দেখতে চায়, নারীদের কীভাবে দমন করে রাখতে চায়। কাজেই পাঠ্যবইয়ের মোটা, কালো, ফরসা, শ্যামলা এসব বডি শেমিংয়ের বিষয়টা সেই পশ্চাৎপদ চিন্তাধারারই বাহক। বিষয়টি ফ্যাশনের দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দেশে বা দেশের বাইরে ফ্যাশন ম্যাগাজিন, দৈনিক বা অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলোর ফ্যাশন বিষয়ক সংবাদেও এর চেয়ে ভালো বর্ণনা থাকে। কাউকে যদি সৌন্দর্য বা নিজেকে পরিপাটি করার বিষয়ে জ্ঞান দিতে হয়, আমাদের সংবাদপত্রের ফ্যাশন সাময়িকী বরং ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। ফ্যাশন বলতে জনপ্রিয় যেকোনো শৈলী বা রীতিকে বোঝায়। ফ্যাশন মৌলিক ও পরিবর্তনশীল এবং একজন ব্যক্তি অভ্যাসগতভাবে যে শৈলীতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সেটাই তার ফ্যাশন। ফ্যাশনের সঙ্গে দেহের আকৃতি বা রঙের কোনও  যোগসূত্র নেই। আগে বিশেষ করে কোনও মজলিস বা জনসমাগমওয়ালা জায়গায় গেলে দেখা যেতো একশ্রেণির লোক অযাচিতভাবে পরামর্শ দিতো।  সেসব ছিল বাচ্চাকাচ্চা নেওয়া, পারিবারিক সম্পর্ক, মোটা-শুকনা, বিয়ে শাদি ইত্যাদি। এখন এসব বিষয় বইয়ের পাতায় ঢুকে শিক্ষার্থীদের মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে। কারণ, শারীরিক অবয়বের বিষয়টিকে প্রধান করে পাঠ্যবইয়ে এসব পড়ানো অপরাধই। এতে শিক্ষার্থী শিখবে বর্ণবাদ এবং বর্ণবাদ নিয়েই পৃথিবীকে দেখবে সে। সাধারণভাবে বর্ণবাদ বা স্থূলতা এসব নিয়ে কথা বলা ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না। কেউ মোটা বা শ্যামলা হলে তা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি হয়তো প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারেন চিকিৎসার খাতিরে। আর কিছু জিনিস আছে, তা শিশুরা বাড়িতে শিখবে। কিছু কিছু জ্ঞান আছে সেটি পাঠ্যবইতে বলার দরকার নেই। সবকিছুকে পাঠ্যবইতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও উদ্ভট। আর পাঠ্যবইয়ের সেসব শারীরিক ত্রুটির কথা বলা হয়েছে, সেসব যে ত্রুটি তাইবা বলার অধিকার কে দিয়েছে? আবার ‘উপযুক্ত পোশাক’ বিষয়টি এমন সেটি নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকার কারো নেই। পোশাক ব্যক্তি তার নিজের পছন্দমতো রুচি অনুযায়ী পরবে। তিনি চাইলে সেটি তার সামাজিক রীতিনীতি মেনে পরতে পারেন আবার নাও পারেন। সেটি তার শিক্ষার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সেটি পাঠ্যবইয়ে নির্ধারণ করে দেওয়াটা হটকারিতা বটেই। কারণ, বিষয়টা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অধিকার কারো নেই। এভাবে কিশোরীর উপযুক্ত পোশাক নির্ধারণ করে নারীর শরীর যে একটি বাড়তি সমস্যা, তা চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে কিশোরীদের মাথায়ও এটা ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুরনো চিন্তাচেতনা, মনস্তত্ত্বকে নতুনভাবে আরোপ করার চেষ্টা চলছে।

জেন্ডার সংবেদনশীলতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যসূচির বর্ণনায় যে আধুনিক মনমানসিকতা ও যুক্তিবাদী চিন্তা থাকার কথা ছিল, তা এখানে অনুপস্থিত। এর পেছনে কোনো অপশক্তি বা অন্ধশক্তি যারা সমাজকে পিছিয়ে দিতে চায়, তা কাজ করছে কিনা খতিয়ে দেখতে হবে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এ বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশের পাশাপাশি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, পাঠ্যপুস্তকে এসব লেখা কুরুচিপূর্ণ, অগ্রহণযোগ্য, বিদ্বেষ ও বৈষম্যমূলক এবং নারীর প্রতি অবমাননাকর। বইতে কিশোরীর উপযুক্ত পোশাক, আচরণ, নিরাপত্তা রক্ষায় করণীয় এবং বিভিন্ন শারীরিক গড়নের মেয়েদের যেভাবে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত আপত্তিজনক, দৃষ্টিকটু এবং এটি শিক্ষার্থীদের বর্ণবৈষম্যমূলক বার্তা দিচ্ছে বলে আসক মনে করছে। আসলে এখন সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীদের জয়জয়কার। সেটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে শুরু করে শিক্ষাদীক্ষা আর সামাজিক মর্যাদায় কোনো অংশে পিছিয়ে নেই নারীরা। সেটি হয়তো কোনও কোনও সংবেদনশীল অংশের জন্য পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে।

কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললে বোঝা যায়, ‘মেয়েদের দেখলে লালা পড়ে’ বা  ‘মেয়েদের ক্লাস ফোর ফাইভের বেশি পড়ানো উচিত নয়’–এমন তত্ত্বে বিশ্বাস করা লোকের সংখ্যা কম নয়। এরাই চায় মেয়েদের দমিয়ে রাখতে। এরাই চায় মেয়েরা যাতে এগিয়ে যেতে না পারে সে বিষয়ে পেছন থেকে রাশ টেনে ধরতে। এদের প্রশ্রয় দিলে মাথায় উঠবে। তখন মাথা থেকে নামানো কঠিন হয়ে যাবে। কাজেই পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু নির্বাচনে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসব পাঠ্যপুস্তক পড়ে নিজেকে গড়ে তুলবে, দেশ গঠনে কাজ করবে। তাদের শুরুতেই যদি নারীর প্রতি, মানুষের প্রতি অবমাননাকর এমন সব শিক্ষা দেওয়া হয় তা জাতির জন্য বিপর্যয় বয়ে আনবে। সেই বিপর্যয় ঠেকানোর আগে সংশোধন শুরু করতে হবে। কারণ, মগজ ধোলাইয়ের পরিণতি যে ভয়াবহ হয় সেটি ধরা পড়া জঙ্গিদের দেখলেই বোঝা যায়। আর কিশোরকালের মগজ ধোলাইয়ের রেশ থেকে যায় সারা জীবন।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ