মার্কিনিদের শ্যেনদৃষ্টিতে ভেনেজুয়েলাসহ ‘দস্যুত্রয়ী’

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৪৮, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫০, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীঘরে বাইরে আগুন নিয়ে খেলছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকার একটি তেলসমৃদ্ধ দেশ। যেখানে জ্বালানি তেল সেখানে আমেরিকার লোলুপ দৃষ্টি। আমেরিকার মোট প্রয়োজনের ৩ শতাংশ তেল নিজের কাছে মজুত আছে। অথচ বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ তেল ব্যবহার করে আমেরিকা। দৈনিক ৮০ কোটি ডলারের তেল প্রয়োজন হয় আমেরিকার নিজের প্রয়োজন মেটাতে। তাই সব সময় তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর প্রতি আমেরিকার শ্যেনদৃষ্টি। তেল না হলে আমেরিকার সমাজ অচল হয়ে যাবে।
ভেনেজুয়েলা আমেরিকার হাতের কাছের দেশ। সুতরাং নিকট প্রতিবেশীর তেল সবার আগে প্রয়োজন। কারণ, ভেনেজুয়েলার তেল নিলে পরিবহন খরচ কম। কিন্তু আমেরিকার দুর্ভাগ্য যে ভেনেজুয়েলায় সমাজতন্ত্রী সরকার ক্ষমতায়। ল্যাটিনের দেশ নিকারাগুয়া আর কিউবায়ও সমাজতন্ত্রীরা রাষ্ট্রক্ষমতায়। সম্ভবত ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একের পর এক এই তিন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার।
ভেনেজুয়েলায় হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এসেছেন তার অনুগত সহকর্মী নিকোলাস মাদুরো। প্রথম জীবনে মাদুরো ট্রাক ড্রাইভার ছিলেন। বহু পথ পাড়ি দিয়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। একেবারে জনসমর্থন ছাড়াও নন। ভেনেজুয়েলায় বিরোধী দলও শক্তিশালী। বিরোধী নেতা হলেন জুয়ান গুয়াইদো। পার্লামেন্টে তার আধিপত্য আছে। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ভালো নয়। আমেরিকা সব সময় ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতার সন্ধানে থাকে এবং প্রয়োজনে রসদ সরবরাহ করে।

গত ২২ জানুয়ারি সামরিক বাহিনীর একটা ক্ষুদ্র অংশকে দিয়ে অভ্যুত্থানের প্রয়াস চালানো হয়েছিলো। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা সামরিক বাহিনীকে উসকানি দিয়ে সরকার বদলানোর প্রচেষ্টা আমেরিকার বহুদিনের বদ অভ্যাস। কিন্তু মাদুরোর সঙ্গে ৯০% সামরিক শক্তি থাকায় অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। যদিওবা পার্লামেন্ট অভ্যুত্থানকে সমর্থন দিয়েছিলো। পুলিশ বাহিনীও মাদুরোর বিপক্ষে বিক্ষোভকে ছত্রভঙ্গ করতে বেশি সময় নেয়নি। সামরিক বাহিনী ২৪ জানুয়ারি মাদুরোর প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য প্রকাশ করে এবং অবিচল আস্থা প্রকাশের অঙ্গীকার ঘোষণা করে। তার পরপরই আটজন জেনারেল মাদুরোর প্রতি পুরোপুরি আনুগত্য প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বক্তৃতা করেছেন।

প্রশাসনিক দিক থেকে মাদুরোর অবস্থান খুবই শক্তিশালী। পুলিশ, মিলিটারি আর সিভিল আমলারা তারই পক্ষে। পার্শ্ববর্তী বলিভিয়া ও কিউবাও ভেনেজুয়েলাকে সমর্থন দিচ্ছে। অবশ্য আরেক প্রতিবেশী কলম্বিয়া আছে মার্কিনিদের পক্ষে। ভেনেজুয়েলার সঙ্গে কলম্বিয়ার প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তে সেনা মোতায়েন করতে হলে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। আর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আইভান ডিউক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর তীব্র বিরোধিতা করছেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে। কলম্বিয়া যেহেতু ভেনেজুয়েলার সীমান্তে এবং সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি সামনে আসছে।

আমেরিকা তার অব্যাহত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বিরোধীদলীয় নেতা জুয়ান গুয়াইদোকে। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা ভেনেজুয়েলার ব্যাপারে একই মনোভাব পোষণ করেন। শুধু সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ভিন্ন কথা বলছেন। মাদুরো পুনরায় ৬ বছরের জন্য নতুনভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী দল এ নির্বাচন মানে না। তবে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জোরালো সমর্থন পাওয়ায় মাদুরো আরও শক্তিশালী অবস্থান দেখাতে প্রস্তুত।

বিরোধীদলীয় নেতা জুয়ান গুয়াইদোকে পার্লামেন্টের স্পিকার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন। আবার আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিরোধী দলকে সমর্থন দিয়েছেন। তবে, ২০১৩ সাল থেকেই মাদুরোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল রাশিয়া, চীন ও তুরস্ক। বিরোধী নেতার প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন বেশি আবার মাদুরোর প্রতি মিলেটারি এবং পুলিশ ফোর্সের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। পরিস্থিতি খুবই জটিল।

এদিকে ভেনেজুয়েলার সংকট সমাধানে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে রাশিয়া। তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকেও হুঁশিয়ার করেছে মস্কো। ওদিকে, ১২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে এক ফোনকলে ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সামরিক পদক্ষেপসহ কোনোরকম হস্তক্ষেপ ওয়াশিংটনের এড়িয়ে চলা উচিত।’

দেশটির উপার্জনের সবচেয়ে বড় উৎস তেল, যার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে, ভেনেজুয়েলা যত তেল রফতানি করে তার মধ্যে ৪০ শতাংশ তেলই আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তেলের ওপর জারি করা এই নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন অন্যান্য দেশও ভেনেজুয়েলার তেলের দাম কমিয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলা তেল খাতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের সহায়তা চেয়েছে।

গত সপ্তাহে মাদুরো ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্টে বলেছেন, মার্কিন সাম্রাজ্য ষড়যন্ত্র করছে আমাদের তেল করায়ত্ত করার জন্য। ঠিক যেমনটা করেছে তারা সিরিয়া ও লিবিয়ায়। তিনি বলেছেন, ইরাকের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুতের অভিযোগ তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে অনুরূপ কোনও অভিযোগ তুলতে পারবে না। তাই আগ্রাসনের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর জন্য তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে। মাদুরো সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আগ্রাসন চালায়, তবে ভিয়েতনামের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সমর্থন চেয়েছেন যেন নতুন কোনও ভিয়েতনাম সৃষ্টি না হয়। সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের হাতে ৫ হাজার সেনা রিকুইজিশনের একটা ফাইল দেখা গেছে।

আমরা যারা ভিয়েতনাম যুদ্ধ দেখেছি তারা আমেরিকার অতি উৎসাহী আচরণের পরিণতি দেখেছি। ১৩ লাখ নাফাম বোমা ফেলেও ভিয়েতনামে যুদ্ধ জয় সম্ভব হয়নি। প্রেসিডেন্ট নিক্সন সসম্মানে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে মার্কিন একজন  সেনাও জীবিত ফেরত যেত না ভিয়েতনাম থেকে। অনুরূপ এক ঘটনায় ব্রিটিশের ৮ হাজার সেনার মাঝে শুধু একজন সেনা ফেরত এসেছিলো আফগান থেকে। কলকাতায় জীবন্ত ফেরত আসা সেই সেনার সমাধিসৌধ আছে খ্রিস্টান গোরস্থানে। তার সমাধিফলকে সব কথা লেখা আছে। আমি ওই সমাধিফলক পড়ে এ ইতিহাস জেনেছি। ব্রিটিশেরা ইতিহাস বিকৃত করে কোনও ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করেন না। এই সৎ গুণটুকু ব্রিটিশ জাতির রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ত্রাণ সরবরাহ ও নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তাব করে নিরাপত্তা পরিষদে এক খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। এ প্রস্তাবে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে তার ক্ষমতা ব্যবহারের জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাল্টা আরেকটা প্রস্তাব রাশিয়া পেশ করেছে। তাতে রাশিয়া আলাপ-আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব করেছে। আমেরিকা তার প্রস্তাব পাস করানোর চেষ্টা করলে রাশিয়া সম্ভবত ভেটোশক্তি প্রয়োগ করবে। রাশিয়া তার প্রস্তাবে ভেনেজুয়েলার আঞ্চলিক সংহতি এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট গুয়াইদো গত ৮ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, তিনি মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করার জন্য মার্কিন হস্তক্ষেপের অনুমতিসহ যেকোনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে এবং মানবিক সংকট মোচনে যেকোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধা করবেন না।

তার বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী নেতা গুয়াইদো মার্কিন সেনা আহ্বানের জন্যও মানসিকভাবে প্রস্তুত। অর্থাৎ মার্কিনিরা তাকে প্রস্তুত করে রেখেছে। এখন রাশিয়া ও চীনের বলিষ্ঠ পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার সেনা প্রবেশ করবে কিনা। তবে চীন ও রাশিয়া মাদুরোকে অব্যাহত সমর্থন দিয়ে আসছে।

শুধু ভেনেজুয়েলা মার্কিনিদের টার্গেট নয়, নিকারাগুয়া আর কিউবাকেও টার্গেট করেছে তারা। গত ২০ ডিসেম্বর ট্রাম্প নিকা (নিকারাগুয়ান ইনভেস্টমেন্ট কন্ডিশনালিটি অ্যাক্ট) আইনে সই করেছেন। আইনের জোরে নিকারাগুয়ার সরকারি কর্মকর্তাদের বা সমর্থক ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে তারা। নিকা আইনটা এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যেন নিকারাগুয়ার যেকোনও সরকার হটানোর ব্যাপারে ব্যবহার করা যায়। এসব করা হচ্ছে সুশাসন আর গণতন্ত্রের নামে। আসলে সবকিছু হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনও ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া ও কিউবাকে ‘দস্যুত্রয়ী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ব্রাজিলেও একই কাণ্ড করেছিলো যুক্তরাষ্ট্র। প্রথমে দিলমা রোসেফকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলো, পরে লুলাকে দুর্নীতির মামলায় জেলে পাঠানো হলো। এখন ব্রাজিলের ক্ষমতা চরম এক দক্ষিণপন্থীর হাতে। আসলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শক্তি খর্ব না হওয়া পর্যন্ত ল্যাটিনে এ রাজনৈতিক লীলা বন্ধ হবে না।

জাতিসংঘ মহাসচিব মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমেরিকা যখন পক্ষ অবলম্বন করে তখন জাতিসংঘ আর তার নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে না। সুতরাং মহাসচিবের মধ্যস্থতার প্রস্তাবও ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হচ্ছে না।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ