স্মৃতি-বিস্মৃতির রাজনীতিতে জয়নাল-দীপালি-জাফর-কাঞ্চনরা

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৭:১৮, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৯, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনগত দু’দিন ধরেই ফেসবুক খুব জমকালো। সবাই বাহারি রঙের পোশাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে ফালগুনকে। এর সঙ্গে সঙ্গে আবার কিছুটা এগিয়ে থাকছে নিকটে থাকা ভালোবাসা দিবসের প্রস্তুতির খবর। কয়েকজন ভালোবাসা দিবসের অগ্রিম শুভেচ্ছাও পাঠিয়ে রেখেছেন ইনবক্সে। খুব অল্প, হাতেগোনা তিন চারজনের ফেসবুকেই শুধু পেলাম সাদাকালো দুটা ছবি। ছবিগুলোর বয়স ত্রিশের বেশি। ছবিগুলো এক ভুলে যাওয়া ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে যেন।
১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেনটাইন’স ডে হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। খুব বেশি দিন না হলেও এখন বাংলাদেশ খুব ঘটা করে এটি পালন করা হয়। পহেলা ফালগুনের পর ‘ভালোবাসা’ দিবসের বেচা-কিনিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে ক্রেতা বিক্রেতা সবাই। আমরা সবাই এখন পণ্য, আমাদের যাপিত জীবনের বিশেষ দিনগুলোও পণ্য। আরও খোলাসা করে বলতে হয়, আমরাই আসলে হয়ে গেছি বাজারি। অথচ এই ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনটিকে পালন করা হতো ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। অথচ এখন হয়তো আঠারোতে ভর করা নতুন প্রজন্মর অনেকেই জানে না বাংলাদেশে এমন একটি ঐতিহাসিক দিন আছে। আমরা নিজেদের ভাসিয়ে দিই ভালোবাসা দিবসের বাণিজ্যিক জোয়ারে,  অথচ আমাদের করার কথা ছিল অন্য কিছু। আমাদের মনে রাখার কথা জয়নাল, দীপালিকে। একযুগও লাগেনি আমাদের সেই দিনের ইতিহাস মুছে বাণিজ্যিক বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে বুকে টেনে নিতে।

ইতিহাস নিজে বেঁচে থাকে না। একে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। কোনও ঘটনা ইতিহাস হয় আর কোনোটি হয় না সেটিই ইতিহাসের বড় রাজনীতি। আমরা নিজ থেকে কোনও কিছু ভুলি কিংবা নিজ থেকে কোনও কিছু মনে রাখি– বিষয়গুলো আপাতভাবে এতো নিরীহ নয়। কোন ঘটনাকে আমরা মনে রাখবো আর কোনটি আমাদের ভুলিয়ে রাখা হবে সেটাও একটা রাজনীতির অংশ। আমাদের ক্রমশই ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে প্রতিবাদের ইতিহাসকে স্মরণ করা থেকে।

১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক শাসন জারির প্রথম দিন থেকেই বিক্ষাভ শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই বছরেই মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম পোস্টার লাগানো হয় এবং বাম সংগঠনগুলো ২৬ মার্চ স্মৃতিসৌধেই স্লোগান দেয় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, কালক্রমে যা গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল।

সে সময়ের শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান ১৯৮২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর একটি নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেন। সেই শিক্ষানীতিতে প্রথম শ্রেণি থেকেই আরবি ও দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয় মেধা অথবা পঞ্চাশ শতাংশ ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা। তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারের বিতর্কিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই নীতি ঘোষণার পর থেকেই আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা।

এই আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর তৈরি হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তারা ১০ দফা দাবি তোলেম যদিও তাদের মূল দাবি ছিল মজিদ খানের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি বাতিল। এই শিক্ষা নীতি বাতিল, রাজবন্দিদের মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ন্যায্য দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সারা দেশে এর প্রতিবাদে ঝড় ওঠে। শহীদ হয় জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালিসহ অনেকেই। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী সেদিন আন্দোলনে নেমেছিল। শিক্ষকরা সেদিন ছাত্রদের সঙ্গে প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন। ছাত্রদের প্রবল আন্দোলনের দাপটে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল সামরিক শাসক এরশাদ। এটাই ছিল এদেশে স্বৈরাচারবিরোধী প্রথম আন্দোলন। পরে সারা দেশেই এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও ধড়-পাকড় এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশের রাজনীতির নানা জটিল অংকে আজও সেই স্বৈরাচারী এরশাদ কখনও সরকারি দলে, কখনও বিরোধী দলে। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে ক্ষমতা হারালেও তিনি হয়েছেন সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের (২০০৮-২০১৩) ছিলেন সরকারের বিশেষ দূত। ২০১৪ সালে তার দল প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। তাই বারবারই ক্ষমতার অংশীদার হয়েছেন তিনি। তাই যে দেশে একজন স্বৈরশাসক এখনও রাজনীতিতে এতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে দেশে জয়নাল, দীপালি, জাফর, কাঞ্চনরা মানুষের মনে বেঁচে থাকবেন সেটাই বরং কাঙ্ক্ষিত নয়। একথা জোর দিয়ে বলা যায়–  ওরা আমাদের স্মৃতিতে শক্ত খুঁটি হয়ে থাকলে এরশাদ রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারতো না। এরশাদকে হটিয়ে ফিরে পাওয়া গণতন্ত্রে মাত্র দুই বছর আমাদের মনে ছিল ১৯৮৩ সালের ১৪ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারির কথা। এরপরেই এই ১৪ ফেব্রুয়ারিতে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসে গেছে ভালোবাসা দিবস।

এই লেখাটি ভ্যালনটাইন দিবসের বিপক্ষে নয়, কারণ এই দিবসেরও সূচনা হয়েছিল একটি নৃশংস ঘটনার স্মারক হিসেবে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের সময়ে সেন্ট ভ্যালেনটাইনকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২৭০ খ্রি. রাষ্ট্রীয় বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে সম্রাট তার মৃত্যুর আদেশ দেন। সম্রাট খেয়াল করেছিলেন অবিবাহিত যুবকরা বিবাহিত যুবকের চেয়ে যুদ্ধের কঠিনতম মুহূর্তে ধৈর্যের পরিচয় দেয়; তাই বিয়ে প্রথার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সেন্ট ভ্যালেনটাইন সম্রাটের এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন ও গোপনে বিবাহ প্রথা চালু রাখেন। তাকে জেলে দেওয়ার পর সেখানে এক অন্ধ মেয়ের চিকিৎসা করে ভালো করেন। পরে তিনি মেয়েটির প্রেমে পড়েন। মৃত্যুর আগে মেয়েটিকে লেখা এক চিঠির শেষ বাক্য ছিল– ইতি তোমার ভ্যালেনটাইন।

আইন অমান্য করায় সেন্ট ভ্যালেনটাইনকে হত্যা করায় রোমান সম্রাটের বিচার হয়নি ঠিকই, কিন্তু সেই ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ সারা বিশ্ব ওই ঘটনাকে স্মরণে রাখছে। কিন্তু আমরা কেন স্মরণ রাখতে চাই না আমাদের স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের বীর সৈনিকদের। আমরা কেন বলতে পারি না জয়নাল, দীপালি, জাফর, কাঞ্চনরাই আমাদের ভ্যালেনটাইন। এই দিবসে তাদের স্মরণ করাই তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার প্রকাশ। তারাই আমাদের ভ্যালেনটাইন।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল:zobaidanasreen@gmail.com

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ