সাপ খোলস পাল্টালেও বিষ থেকে যায়

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৪:৩৭, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৮, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনজামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ নিয়ে গণমাধ্যম সরগরম। পদত্যাগের উল্লেখিত কারণ দেখে মনে হয়, একাত্তরে নরহত্যা,ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো নারকীয় কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে তার। দ্বিতীয়ত, জামায়াত ইসলামী নামের পরিবর্তনেও তিনি চেষ্টা করেছেন বলেও জানা যায়। তার এই বক্তব্য কি সত্যিই তার মনের নাকি তাদের গুরু মাওলানা মওদুদীর পল্টিখাওয়া কর্মকাণ্ডেরই ধারাবাহিকতা?
প্রথম কথা হচ্ছে– একাত্তরের নারকীয় ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে। তিনি কি সত্যিই এটা উপলব্ধি করেন? কিভাবে বিশ্বাস করা যায়? গণমাধ্যমে প্রকাশিত পদত্যাগপত্রের সংবাদ পড়ে মনে হয় না তিনি এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে বিশ্বাস করেন। যেহেতু তিনি এই দাবিটি করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন এবং তার দল সেই দাবি মানেননি এবং এর প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেছেন তাই খুনি ও অপরাধী দলের হয়ে খুনিদের সহযোগিতা করার জন্য তিনি তো ক্ষমা চাইতে পারতেন। বাস্তবতা হচ্ছে- পদত্যাগপত্র সংশ্লিষ্ট সংবাদে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি, একাত্তরের খুনিদের তেল-পানি দিয়ে তিনি নিজেও অপরাধ করেছেন এবং এর জন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।

যদি তার কথা অনুযায়ী মনে করা হয়, তিনি দলীয় ফোরামে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছিলেন, তাহলে প্রশ্ন আসে এই অপরাধের দায় কাঁধে নিয়ে তিনি এতদিন কিভাবে দলের সেবা করে আসছিলেন?

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে সঙ্গত কারণেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে, তার নিজের বক্তব্যের জন্যই। তিনি উল্লেখ করেছেন, তিনি একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের মামলা পরিচালনায় সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। তার এই কাজটিকে তাই শুধু পেশাগত দায়িত্ব বলার সুযোগ থাকে না এই বক্তব্যের পর। তিনি প্রকারান্তরে নিজেই স্বীকার করলেন, এটা তার রাজনৈতিক দায়িত্ব ছিল এবং সেটি তিনি আন্তরিকভাবে পালন করেছেন। প্রশ্নতো করাই যায়, তিনি যদি একাত্তরের জামায়াতের কর্মকে অপরাধ বলে গণ্য করে থাকেন, তাহলে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সেই অপরাধকে সমর্থন করেন কিভাবে। তাই বলা যায়- তিনি একাত্তরের অপরাধীদের দায়মুক্তির জন্য সহযোগিতা করেছেন। তিনি দেশত্যাগের পর বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ বিরোধী কাজে নিয়োজিত হওয়ার নানা কথা শোনা গেছে। এতে কি মনে করা যায় না, তিনি নিজেও একাত্তরে জামায়াতের অপরাধকে পূণ্য বলে মনে করেন? শুধু তাই নয়, এর দায়ও বহন করেন?

এমন একটা মুহূর্তকে তিনি পদত্যাগের জন্য বেছে নিয়েছেন, যখন জামায়াত ইসলামীর মতো ধর্মীয় উগ্র রাজনৈতিক দলটি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। পদত্যাগের এই সময়টা বেছে নেওয়ার কারণেই নতুন করে চিন্তার সুযোগ তৈরি হয়। তিনি কী এমন মনে করেছেন, এই দল নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগেই সটকে পড়াটাই উত্তম? নাকি ডুবন্ত দলটিকে জাগিয়ে তোলার বিকল্প চেষ্টা হিসেবেই তার এই পদত্যাগ? সেক্ষেত্রে দুটি লাভ হতে পারে। প্রথমত একাত্তরের ভূমিকার জন্য আর ক্ষমা চাইতে হবে না। এখন যেমন বলা হয় নতুন প্রজন্মের জামায়াত নেতা-কর্মীরা নিজেরা রাজাকার আল-বদর ছিল না, তাই তাদের ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। তেমনি সাইনবোর্ড পাল্টে নতুন দল গঠন করে তারা বলবে, এই দল একাত্তরে ছিল না। সুতরাং একাত্তরের অপরাধের দায় এই দল বহন করবে না। যেমনি একাত্তরের ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম পরিবর্তন করে ইসলামী ছাত্র শিবির নাম নিয়ে একাত্তরের অপরাধের দায়মুক্ত বলে দাবি করে। আমার মন বলে, আসলে একাত্তরের দুষ্কর্মের জন্য ক্ষমা না চাওয়ার জন্যই ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ‘ক্ষমা চাওয়ার’ প্রসঙ্গটিকে সামনে এনেছেন।

জামায়াতে ইসলামী এখন বিপর্যস্ত অবস্থায়। তাই সহজে নির্বংশ হয়ে যাবে এমনটা বলার সুযোগ নেই। তাদের দল যদি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়ে যায়ও তাহলেও তাদের অস্তিত্ব বিনাশ হয়ে যাবে না। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদীর রাজনৈতিক কৌশল দেখেও তাই মনে করা যায়। জামায়াতে ইসলামীর জন্ম অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে। মওদুদী বলেছিলেনও ইসলামের খেদমত করার জন্যই এই সংগঠনের জন্ম। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে বদলে যায়। পাকিস্তানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার পরও তিনি ১৯৪৭’র ভারত থেকে পাকিস্তানে গিয়ে স্থায়ী হন। সেখানেও তিনি প্রথম অবস্থায় লাহোরের একটি বস্তিতে গড়ে তোলেন দারুল ইসলাম। সেটিও অরাজনৈতিক সংগঠন। ওখানেও তিনি ভারতীয় প্রচেষ্টাকে কাজে লাগান এবং জামায়াত ইসলামী নামে রাজনৈতিক সংগঠনকে পুনর্জীবন দেন।

বাংলাদেশে সংবিধান মাধ্যমে সব ধর্মাবলম্বী রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধ হলে জামায়াতও নিষিদ্ধ হয়। উপরন্তু সরকারি নির্দেশেও এটি বাতিল হয়ে যায়। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় বাংলাদেশে কোনও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব ছিল না।

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান প্রথম তাদের পুনর্বাসন করে। মাওলানা আব্দুর রহিম পাকিস্তান থেকে ইতিপূর্বে ফিরে এসেছিলেন। তিনিই হাল ধরেন জামায়াত ইসলামীর। তবে পরিস্থিতি তখনও উগ্রবাদী জামায়াতের বিরুদ্ধে থাকায়- তারা ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগ নাম নিয়ে রাজনীতিতে আবির্ভুত হন। সামরিক শাসকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সেই দলে পুনর্বাসন করা হয়। যখন পরিবেশ পরিবর্তন হয়, সামরিক শাসক মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের অবাধ স্বাধীনতাই শুধু নয়, জামায়াতের নেতা গোলাম আজমকেও এদেশে নিয়ে আসা হয়, তখন আইডিএল আসল রূপে ফিরে আসে। তারা জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ নাম ধারণ করে।

খোলস পাল্টানোর এই চরিত্র শুধু জামায়াতের নিজেরই নয়। তার সমগোত্রীয় কিংবা জামায়াতের বিভিন্ন দেশের শাখারও খোলস পাল্টানোর উদাহরণ আছে। জামায়াতে ইসলামীর জন্মস্থান ভারতেই জামায়াত ইসলামীর নাম বদলে যায়। জামায়াত ইসলামী হিন্দ নামের এই সংগঠনটি ‘ওয়েলফেয়ার পার্টি অব ইন্ডিয়া’ নাম ধারণ করে রাজনীতি করছে।

তারা আসলে কৌশল হিসেবে জামায়াত ইসলামী হিন্দ-কে অনুসরণ করতে যাচ্ছে। তারা নাম পরিবর্তন করে নতুন করে মাঠে নামবে। তারা কৌশল হিসেবে ভারতের উগ্রহিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসকেও অনুসরণ করছে। আরএসএস এর রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বিজেপি কাজ করছে। জামায়াতের বর্তমান নড়াচড়া দেখে অনেকেই সন্দেহ করছেন, আসলে বর্তমান জামায়াত ইসলামী স্বনামে কিংবা নতুন নামে আরএসএস এর মতো সংগঠন হিসেবে কাজ করবে। তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশে আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করবে।

সেই পথটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিজেই করে দিয়েছে। জিয়াউর রহমান সাহেব সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদকে পদদলিত করে এই দেশে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক সংগঠন করার সুযোগ করে দিয়েছেন। যে কারণে বাংলাদেশে এখন শুধু জামায়াতই নয় শতাধিক ধর্মাশ্রয়ী সংগঠন প্রকাশ্যে রাজনীতি করে চলেছে। সেক্ষেত্রে জামায়াত যদি খোলস পাল্টে বাংলাদেশে আবার জন্মলাভ করে তাহলে তাদের ঠেকানো এত সহজ হবে কি? চরম সাম্প্রদায়িক সংগঠন হেফাজতে ইসলামী নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিয়েও শাপলা চত্বরে যে রাজনৈতিক কাণ্ড ঘটিয়েছিল তাকে কী হিসেবে গণ্য করা হবে? সুতরাং জামায়াতের খোলস পাল্টানোর উদ্যোগটিকে কোনোভাবেই আশঙ্কামুক্ত ভাবার কারণ নেই। বিষধর সাপ চামড়া পাল্টালেও তার বিষ থেকেই যায়। সুযোগ পেলেই ছোবল মারতে দ্বিধা করবে না, এটাই বিষধর সাপের বৈশিষ্ট্য।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক।

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ