কবরের জায়গা বুকিং দিয়েছেন?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:০৬, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৭, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯

আমীন আল রশীদসংসদ ভবনের উত্তর প্রান্তে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর নিয়ে মাঝখানে বিতর্ক উঠেছিল যে, যেহেতু এটি সংসদ ভবনের ডিজাইনার স্থপতি লুই কানের নকশার বাইরে, তাই কবরটি সরিয়ে ফেলা হবে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের কথার লড়াইও চলেছে বেশ কিছুদিন।
সবশেষ কবি আল মাহমুদের কবর কোথায় হবে, বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নাকি অন্য কোথাও সেই আলোচনা উঠলেও শেষমেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পারিবারিক কবরস্থানেই তাকে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়।
জীবনের আনুষাঙ্গিক নানা বিষয়ের মতো মৃত্যুপরবর্তী কবরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সেটি অনেক সময় রাজনীতিরও ইস্যু। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় যারা থাকেন এবং যারা এখানের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চান, তাদের জন্য কবরের আলোচনাটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এই শহরের মাটি ক্রমহ্রাসমান এবং কবরস্থান ও কিছু পার্ক ছাড়া এখন কোথাও মাটি খুঁজে পাওয়ায় মুশকিল। যে কারণে জীবদ্দশায় থাকার জন্য প্লট ও ফ্ল্যাট বুকিংয়ের মতোই এখন কবরের জায়গাও বুকিং দিতে হচ্ছে এই মহানগরীর মানুষকে।

একজন মানুষের মৃত্যু হবে; তারপর ধর্মীয় রীতি মেনে তাকে কবরে শায়িত করা হবে, এটিই স্বাভাবিক এবং এখানে কোনও জটিলতা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট রাজধানী ঢাকায় যেখানে এক ইঞ্চি জায়গার মূল্যও এক টুকরো হিরার চেয়েও বেশি, সেখানে কবরের জায়গা তো পয়সা দিয়েই কিনতে হবে।

১০ ফেব্রুয়ারি বিবিসি বাংলার একটি খবরের শিরোনাম: ‘ঢাকার আবাসন মেলায় কবরের প্লটের আগাম বুকিং’। এর পরদিনই একটি দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম– ‘রিহ্যাব মেলায় বিক্রি হয়েছে ২০০ কবর’। খবরে বলা হয়, আবাসন মেলায় এবারই প্রথম একটি প্রতিষ্ঠান আট হাজার কবরের জায়গা বিক্রির জন্য প্রকল্প প্রদর্শন করে। এমআইএস হোল্ডিংসের স্টলে এই কবরের স্থান বিক্রি হয়েছে। মেলা থেকে প্রতিষ্ঠানটি দুই শতাধিক কবরের জায়গা বিক্রি করেছে। এই প্রকল্পের নাম পূর্বাচল রাওজাতুল জান্নাত; যেখানে ৮০ হাজার কবরের প্লট থাকবে। শুরুতে ২০০ বিঘা জায়গার ওপর আট হাজার কবরের স্থান করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুই হাজার কবর করার মতো জায়গা প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখান থেকে রিহ্যাব মেলায় বিক্রি হয়েছে দুই শতাধিক। সাত ফুট দৈর্ঘ্য ও সাড়ে তিন ফুট প্রস্থের এই জমির মূল্য তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা। এককালীন সার্ভিস চার্জ ১৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তিন লাখ ৪৫ হাজার টাকা। প্রত্যেক ক্রেতা ওই প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যারে তালিকাভুক্ত হবেন। মৃত্যুর পরে তারাই মৃত ব্যক্তির দাফনের ব্যবস্থা করবে।

রাজধানীতে একসময় ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে কবরের জায়গা কেনা যেতো। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের পরে ওই কবরের ওপর অন্য কাউকে দাফন করা হতো। কিন্তু এখন জায়গা সংকটের কারণে এই পদ্ধতিতেও অনেকে কবরের জায়গা কিনতে পারছেন না। বিশেষ করে আজিমপুর ও বনানী কবরস্থানে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আজিমপুরে প্রতি তিন মাস পর প্রতিটি কবরে নতুন মৃতদেহ রাখা হয়। অর্থাৎ যেসব কবরের জায়গা বিক্রিত নয়। এজন্য ট্রাকভর্তি করে মানুষের শরীরের নানা অঙ্গ ও হাড় অন্যখানে নিয়ে ফেলা হয়। আজিমপুরের কবরস্থানে ৩০ হাজারের মতো কবরের জায়গা হয়। আর বনানীতে ২২ হাজার। কিন্তু এ পর্যন্ত সেখানে লাখ লাখ মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে। সুতরাং রিপ্লেস না করলে এট সম্ভব হতো না। আজিমপুর কবরস্থানে গেলে দেখা যাবে, অসংখ্য কবর একটির গায়ে আরেকটি লাগানো। একই কবরের ওপর একাধিক সাইনবোর্ড।

কবরে শায়িত করার পরে মানবদেহ মাটিতে বিলীন হয়ে যাবে, এটিই স্বাভাবিক।  কিন্তু তারপরও স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা মানসিক শান্তির জন্য প্রিয় মানুষের কবরের কাছে গিয়েই মোনাজাত করেন। রাজধানীর কবরস্থানগুলোয় যাদের দাফন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে যাদের কবরের জায়গা কেনা হয়নি, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে সেই কবরের জায়গায় যেহেতু অন্য কারোর দাফন হয়েছে, ফলে এটিও স্বজনদের জন্য একটা মানসিক সমস্যা তৈরি করে। বিশেষ করে আপনি আপনার বাবাকে যেখানে দাফন করে এলেন, বছরখানেক পরে গিয়ে দেখলেন সেখানে আরেকজনকে দাফন করা হয়েছে এবং সেই কবরটি বাঁধাই করা হয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনার মনে হবে যে, বাবার শেষ চিহ্নটুকুও অবশিষ্ট রইল না। যে কারণে স্বচ্ছল মানুষেরা চান তাদের কবরটি স্থায়ী হোক। কিন্তু সবার পক্ষে লাখ টাকা খরচ করে কি কবরের জায়গা কেনা সম্ভব? যাদের পক্ষে সম্ভব তাদের জন্যই কবরের জায়গা বুকিংয়ের এই আয়োজন।

বিষয়টি শুনতে অবাক লাগলেও, এটি একটি যে নির্মম বাস্তবতার মুখোশ আমাদের সামনে উন্মোচিত করে তা হলো—প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ায় তথা পুরো বাংলাদেশটি ঢাকা শহরের গণ্ডর ভেতরে আবদ্ধ করে ফেলায় প্রতিদিনই এই শহরে মানুষ বাড়ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে যে পরিমাণ লোক থাকে, তা ঢাকা শহরের মিরপুর এলাকায় যে লোক থাকে, তার চেয়েও কম। কিন্তু শুধু ঢাকা শহরেই এখন দুই কোটির বেশি লোকের বাস। যে হারে এই মহানগরীতে লোক বেড়েছে এবং বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেমন আবাসন বাড়ছে না, রাস্তাঘাট বাড়ছে না, তেমনি বাড়ছে না কবরস্থানেরও সংখ্যাও। সুতরাং যারা এই মহানগরীর কোনও এলাকাতেই মৃত্যুর পরে শায়িত হতে চান, তাদের প্রতিদিনকার নানাবিধ চাহিদা মেটানোর পরে এখন কবরের জায়গা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে।

তবে মৃত্যুর পরে যারা গ্রাম-উপজেলা-জেলা বা বিভাগীয় শহরে নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত হওয়ার বাসনা রাখেন, তাদের জন্য এই দুশ্চিন্তাটি আপাতত নেই। কারণ ঢাকার বাইরে কবরের সংকট এখনও ওই মাত্রায় তীব্র হয়নি যে, কবরের জায়গা আগাম বুকিং দিতে হবে। তবে জেলা ও বিভাগীয় শহরের কবরস্থানগুলোয় স্থায়ী অবকাঠামো অর্থাৎ কবরস্থান বাঁধাই করতে কর্তৃপক্ষ নিরুৎসাহী করে। কারণ সবাই কবর বাঁধাই করতে থাকলে একটা সময় পরে মফস্বল শহরেও আর কাউকে কবর দেওয়ার জায়গা অবশিষ্ট থাকবে না। যে কারণে জেলা শহরের কবরস্থানেও এখন কবর বাঁধাই করতে গেলে অনেক টাকা দিতে হয়।

এই সমস্যার সমাধান একটাই, তা হলো– আইন করে কবর বাঁধাই বন্ধ করা। কারণ শুধু পয়সাওয়ালা মানুষেরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে কবর বাঁধাই করবেন আর যাদের পয়সা নেই, নির্দিষ্ট সময়ের পরে তারা তাদের স্বজনের কবরের অস্তিত্বই খুঁজে পাবেন না, এটি একধরনের বৈষম্য তৈরি করে। ফলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, অর্থাৎ যাদের কবরে সব সময় শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়োজন হবে, সেরকম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাইরে কারও কবরই বাঁধাই করার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। কেউ তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কবরস্থানে বাঁধাই করলে সেটি নিশ্চয়ই তার অধিকার। কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে যেহেতু আমাদের দেশে জায়গায় খুবই অপ্রতুল, সেই বাস্তবতায় জেলা শহরেও এখন আর কবর বাঁধাইয়ের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। দেশের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম জেলা ঝালকাঠি শহরের নতুন কলেজ রোডে একটি কবরস্থান থাকার পরও ওই সড়কেই বছর কয়েক আগে আরেকটি কবরস্থান নির্মাণ করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ২০ বছর পরে যখন জনসংখ্যা আরও বাড়বে, তখন সেই বিপুল মানুষের চাপ কীভাবে সামলাবে মাত্র দুটি কবরস্থান? ততদিনে হয়তো নতুন কবরস্থান নির্মাণের মতো এক বিঘা জমিও শহরে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

লেখক: সাংবাদিক।

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ