জামায়াতের খোলস বদল: বাংলাদেশে তুরস্ক মডেল

Send
আরিফ জেবতিক
প্রকাশিত : ১৯:০৬, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৮, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৯

আরিফ জেবতিকব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ, শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুর বহিষ্কার সব মিলিয়ে জামায়াত বহুদিন পরে এ সপ্তাহে আবার আলোচনায় ওঠে এসেছে। হাবভাবে এটা পরিষ্কার যে জামায়াত ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প নিয়েছে। সাম্প্রতিক এই পদত্যাগ ও বহিষ্কারের ঘটনা সেই ঘুরে দাঁড়ানোরই সূচনা পদক্ষেপ। অনুমান করছি বেশ কিছুদিন ধরে তারা এই চিন্তাভাবনা করছিল আর অপেক্ষা করছিল জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল দেখা পর্যন্ত। এবার তারা কাজ শুরু করবে।
এ প্রসঙ্গে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ এবং ধারণা লিখে রাখা প্রয়োজন মনে করছি। 

যা ঘটতে পারে: 

আমার ধারণা জামায়াত তুর্কি মডেলে এগুবে। তুরস্কের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সেখানকার ধর্মীয় রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের মিল আছে। জামায়াত-শিবিরের তরুণ নেতারা বিভিন্ন সময়ে তুরস্কের দোহাই দেন। ২০০৭ সালে মীর কাশেম আলীর নেতৃত্বে যে তরুণ অংশটি জামায়াতের জন্য নতুন কৌশলপত্র প্রস্তাব করে, সেখানেও তুরস্ক মডেলকে ফলো করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে জামায়াত-শিবিরের তরুণ অংশটি তুরস্কের গুলেন মডেলে বাংলাদেশে অভ্যুত্থান সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে অভিযোগ করা হয়। এসময় জামায়াত শিবিরের ১৩ জন নেতা একসঙ্গে বিদেশে অবস্থান করে এই বিষয়ে কাজ করছেন বলে জানা যায়। এরা হচ্ছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, ব্যারিস্টার ফুয়াদ, ব্যারিস্টার জুবায়ের, মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাহিদুর রহমান, অ্যাডভোকেট শিশির মনির, রেজাউল করিম, ডা. লকিয়াত উল্লাহ, আলম শরীফ, আহসান হাবিব ইমরোজ, ড. আবু ইউসুফ, ড. মিনার, ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন, সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান ও ড. মিয়া মো. আইয়ুব। লক্ষণীয় এই ১৩ জনেরই দুইজন–আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেছেন এবং মঞ্জু বহিষ্কার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হচ্ছে যে জামায়াত নিজেদের দল বিলুপ্ত করে সামাজিক কার্যক্রমে নিয়োজিত হবে। এটি হুবহু গুলেন মডেলের অনুসরণ।

এই পর্যায়ে যেসব পাঠকরা গুলেন মুভমেন্ট সম্পর্কে ওয়াকবিহাল নন, তাঁদের কাছে এই কনসেপ্টটি সংক্ষেপে বলি। গুলেন মুভমেন্ট হচ্ছে তুরস্কের সবচাইতে বড় সামাজিক সংগঠন, যারা সরাসরি পলিটিক্যাল পার্টি হিসেবে দাবি করে না, কিন্তু তাদের কার্যক্রম রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি। মুসলিম ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারীরা এই সদস্য। যদিও দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন, তবু ধারণা করা হয় যে তুরস্ক সরকারের বাইরে সরকারের পর ফেতুল্লাহ গুলেন হচ্ছেন সবচাইতে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। গুলেন মুভমেন্ট দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প হিসেবে তুরস্কে এবং তুরস্কের বাইরে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। তাদের মোট স্কুলের সংখ্যা ১ হাজারেরও বেশি, যেখান থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার ছাত্র বেরিয়ে আসছে। কৌশলে এসব ছাত্রদের অধিকাংশকেই তুরস্কের সরকারি বিভিন্ন পদে ঢুকিয়ে দেয় তারা। দীর্ঘসময় ধরে এই কাজ করতে করতে তারা এখন তুরস্কের সবচাইতে প্রভাবশালী ‘সামাজিক গোষ্ঠী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। 

খেয়াল করে দেখবেন যে বাংলাদেশেও জামায়াতে ইসলামীর লোকজন প্রচুর স্কুল-কলেজ-কিন্ডারগার্টেন-মাদ্রাসা পরিচালনা করে থাকে এবং তাদের নিজস্ব কোচিং সেন্টারগুলো আছে। বিশেষ করে বিসিএস, সামরিক বাহিনী কোচিং নিয়ে নব্বই দশকে তারা প্রচুর কাজ করেছে। গত কয়দিন ধরে জামায়াত সম্পর্কে ‘দল বিলুপ্ত করে সামাজিক কাজে আত্মনিয়োগ করার অভিপ্রায়’ নামে অনেকগুলো খবর প্রকাশিত হয়েছে। জামায়াতের মধ্যে এই বিষয়টি আলাপ হচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যম আমাদেরকে জানাচ্ছে। এটা জামায়াতের গুলেন মুভমেন্টের ধারণায় যাওয়ার একটা চেষ্টা বলেই ধারণা করছি।

বাংলাদেশে পলিটিক্যাল ইসলামের বিকাশের সম্ভাবনা: তুরস্কের অভিজ্ঞতা 

অটোম্যান সাম্রাজ্য উচ্ছেদ করে মোস্তফা কামাল পাশা আতাতুর্ক ১৯২৩ সালে তুরস্ককে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রে পরিণত করেন। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এ কথা স্বপ্নেও কেউ ভাবেনি যে বিপ্লবের একশত বছর পরে তুরস্কে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দল (একেপি) একচ্ছত্র ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার করবে। সুতরাং আজকে যারা বাংলাদেশের রাজধানী শহরে বসে চিন্তা করেন যে এই দেশ ধীরে ধীরে অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত হবে, তাদেরকে তুরস্কের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনটি ভালো ভাবে অনুধাবণ করতে হবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে তুরস্কের ইতিহাসের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার প্রচুর মিল রয়েছে, সুতরাং এই চূড়ান্ত ফল ভবিষ্যতে একই হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

বিপ্লবের প্রথম দশকে কামাল আতাতুর্ক তুরস্কে প্রচুর সংস্কার শুরু করেন যার মূল উদ্দেশ্য ছিল তুরস্ক থেকে খেলাফতের সকল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে মুছে ফেলে তুরস্ককে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছাকাছি সংস্কৃতিতে নিয়ে আসা। আরবি বর্ণমালার পরিবর্তে ল্যাটিন বর্ণমালার প্রবর্তন হয়, ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে অথবা নজরদারিতে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই পরিবর্তনগুলো করার সময় জনসাধারণকে তেমন ভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি। বড় বড় শহর ছাড়া,তুরস্কের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সংস্কারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনও সংশ্রব ছিল না। এর ফলে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে নক্সাবন্দী, নূরকুলুক এর মতো নিজস্ব স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।

লক্ষ্য করার বিষয় যে তুরস্কে ১৯৪৬ সালে ( কামাল আতাতুর্কের বিপ্লবের ২৩ বছর পর) বহু দলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পরপরই সেখানে এই ইসলামী সংগঠনগুলোর শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ভোটের মাঠে তারা বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। ১৯৩৮ সালে কামাল পাশার মৃত্যুর পরও তাদের দল ( সিএইচপি) সরকারে একচ্ছত্র অবস্থান ধরে রেখেছিল। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর প্রথম নির্বাচনেই তারা ডেমোক্রেটিক পার্টির কাছে হেরে যায়। ডেমোক্রেটিক পার্টির পেছনে ধর্মীয় এই সংগঠনগুলোর সমর্থন ছিল।

তুরস্কে ভোটের মাঠে তারপর থেকেই ধর্মীয় এসব দল-গোষ্ঠীকে পক্ষে নেওয়ার টানাটানি কমবেশি সব দশকেই লেগে আছে। ১৯৬০ সালে তুরস্কে প্রথম সামরিক অভ্যুত্থানের পর সামরিক শাসকরা নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে থাকে। স্বল্পমেয়াদ শেষে সামরিক সরকার ব্যারাকে ফিরে গেলেও তাদের শুরু করা এই ধারা অব্যাহত ছিল। ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর, বামপন্থীদের ওপর খড়গহস্ত সামরিক শাসকদের একটা শ্লোগানই ছিল, ‘পরিবার-মসজিদ-ব্যারাক’। 

আশির দশকের মধ্যভাগে তখনকার প্রধানমন্ত্রী ওজাল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিনিয়োগ পাওয়ার আশায় সংস্কারের নামে যা করেন তার দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া বুঝতে তিনি অক্ষম ছিলেন। এ জন্য এই সময়ে রাজনৈতিকভাবে ধর্মীয় নেতাদের তোষণ করা বৃদ্ধি পায়।

যাই হোক,তুরস্কের পলিটিক্যাল ইসলামের বিস্তারিত আলোচনার জন্য এই লেখাটি নয়, তাই সংক্ষেপে তুরস্কের রাজনৈতিক বিবর্তনের মূল পয়েন্টগুলোই এখানে তুলে ধরলাম।

এখন প্রিয় পাঠক, আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন যে তুরস্কের সঙ্গে এই পরিবর্তনগুলোতে বাংলাদেশের মিল রয়েছে। এদেশেও সামরিক সরকারগুলো জামায়াত-হেফাজত ও অন্যান্য ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর বিকাশের পথ সুগম করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। এযুগেও রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের ইসলামী গ্রুপগুলোকে তোষণ করা হচ্ছে। জামায়াতকে রক্ষা করতে যে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব সেটি বিএনপির অর্থে শারীরিক বৃদ্ধি পেলেও এখন আওয়ামী লীগের স্নেহছায়া জীবন ধারণ করছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতি প্রবর্তন,পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্যক্রম নির্ধারণ সহ অনেক বিষয়ে এই ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কথা সরকার গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এই সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এই বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি ড্রাইভিং ফোর্সে সরাসরি চলে আসার যতগুলো লক্ষণ ও পরিবেশ, সবই নিশ্চিত করে রাখা আছে।

এখন তাহলে কী?

এখন তাহলে এমএসপি থেকে ওয়েফেয়ার পার্টি:

১৯৭২ সালে তুরস্কে গঠিত হয় মিল্লি সেলামেত পার্টিসি (এমএসপি)। ধর্মীয় শ্লোগান তুলে তারা পার্টি গঠনের পরপরই উল্লেখযোগ্য সমর্থন টানতে সক্ষম হয়। তাদের শ্লোগানগুলো চমৎকার ছিল। তারা ইসলামী কমন মার্কেট, ইসলামী কমন কারেন্সির মতো চমকপ্রদ শ্লোগান দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ছোট ছোট অনেক ইসলামী দল এবং সংগঠনকে তারা তাদের ছত্রছায়ায় নিয়ে আসে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে, পার্টি গঠনের মাত্র এক বছরের মাথায় তারা মোট ভোটের ১২% অর্জন করে এবং সংসদে ১১% আসন নিয়ে তুরস্কে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু তাদের এই অগ্রগতি তারা ধরে রাখতে পারেনি। জোটের মধ্যে নানা টানাপোড়েনের কারণে তাদের বিকাশ সেই সময়ে বৃদ্ধি পায়নি। ১৯৮০ সালে সামরিক শাসকরা এই পার্টি বিলুপ্ত করে দেয়।

বিলুপ্তির পরপর এমএসপির একটা বড় অংশ ‘ওয়েলফেয়ার পার্টি’ হিসেবে নতুন রূপে তুরস্কের রাজনীতিতে নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ওয়েল ফেয়ার পার্টি তাদের পূর্ববর্তী পার্টির সবগুলো ভুলত্রুটি বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে এগুতে থাকে। এমএসপির কোনও কর্মকাণ্ডের দায় তাদের ওপর ছিল না, কিন্তু এমএসপির অভিজ্ঞতা,নেটওয়ার্ক ও সম্পদ ওয়েলফেয়ার পার্টিতে ব্যবহৃত হয়। সেক্যুলারদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে তারা ‘সামাজিক ইস্যুতে ঐক্য’ ধারায় রাজনীতিকে উপস্থাপন করে। ধর্মীয় এজেন্ডাগুলোকে প্রচারের ক্ষেত্রে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। এভাবে একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে ওয়েলফেয়ার পার্টি ১৯৯৪ সালে। আবির্ভাবের মাত্র ১১ বছরের মাথায় তারা ইস্তাম্বুল, আংকারার মতো বড় বড় নগর সহ অনেকগুলো সিটি করপোরেশনে জয়ী হয়। পরের বছর জাতীয় নির্বাচনে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায় এবং অন্য একটি দলের সঙ্গে কোয়ালিশন করে তুরস্কের ক্ষমতায় চলে আসে।

কামাল পাশার বিপ্লবের প্রায় ৭০ বছর পর আবারও একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী তুরস্কের ক্ষমতার মসনদে আসীন হতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে তুরস্কের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ওয়েল ফেয়ার পার্টির অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন ঘটলেও বর্তমান ক্ষমতাসীন একেপি সেই ওয়েল ফেয়ার পার্টিরই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে যাচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর খোলস বদলকাল:

আমার ধারণা বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী সেই এমএসপি থেকে ওয়েল ফেয়ার পার্টিতে রূপান্তরের মডেলটি অনুসরণ শুরু করেছে। তবে এই মুহূর্তেই তারা জামায়াতকে বিলুপ্ত ঘোষণা করবে না। বরং একটি সমান্তরাল প্ল্যাটফর্মে তারা ওয়েল ফেয়ার পার্টির মতো দল তৈরি করবে। ব্যারিস্টার রাজ্জাক এবং এরকম অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নেতারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জামায়াতের ভূমিকা প্রশ্নে দোহাই দিয়ে এই নতুন পার্টি গঠনে জড়িত হবেন। জামায়াতে তুলনামূলক বয়স্করা জামায়াতে রয়ে যাবেন এবং তারা এই দুই দলের মধ্যে দৃশ্যমান একটা সংকট ও বিরোধিতা দেখানো শুরু করবে। বিভিন্ন স্থানে এই দুই দলের মধ্যে সংঘাত ঘটবে, রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হবে– এভাবে নতুন দলটি মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তাদের পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করে একটি জনভিত্তি তৈরি শুরু করবে। প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত দেখালেও মূলত জামায়াতে ইসলামীর সকল রিসোর্স এই নতুন দল তৈরিতে ব্যবহৃত হবে।

ইতিমধ্যে যদি হাইকোর্টের রায়ে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে যায় তাহলে তো ভালো, না হলেও জামায়াত মানবতাবিরোধী দল হিসেবে ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি হবে। কিন্তু যে দলটি জামায়াত নামে এই কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হবে, সেটি আসলে সাপের ফেলে দেওয়া খোলসের মতো,আসল সাপটি আসলে তার নতুন দলের ত্বক পরে আমাদের মধ্যে ঘুরে বেড়াবে।

এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করার মতো শক্তিশালী অবস্থানে বিএনপি নেই। তাঁদের জনপ্রিয়তা আছে, কিন্তু সাংগঠনিক ভাবে এই দলটি বিপর্যস্ত। এই অবস্থা থেকে সহসা উত্তরণেরও কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। 

সেক্ষেত্রে বিরোধী দলের এই শূন্যতায় জামায়াতে ইসলামের সাংগঠনিক দক্ষতা,বিদেশি আর্থিক শক্তি এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ( বিশেষ করে আইএসআই) এর মদদ নিয়ে একটি ‘সামাজিক -রাজনৈতিক শক্তি’র পরিচয়ে জামায়াতের নতুন দলটি জনপ্রিয়তা পাবে বলে জামায়াত হয়তো আশা করছে। একাত্তর সালের গণহত্যার দায় থেকে মুক্ত রাখতে পারলে, সাধারণ হিসাব নিকাশে সেটিকে খুব একটা অসম্ভবও মনে হয় না।

কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বড় কৌঁসুলি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক কিংবা রগ কাটা শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুর মতো লোকেরা নতুন পার্টি নিয়ে এগুলোও তাদের ব্যক্তিগত দায়ভার কি জনগণ এত সহজেই ভুলে যাবে?

বাংলাদেশের জনগণ খুব সচেতন, ইতিহাসের কোনও বাঁকেই তারা ভুল করেনি–এই সহজ সত্যের ওপর আশাবাদী থাকতে তাই দোষ দেখি না।

লেখক: ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

 

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ