বই বিমুখ প্রজন্ম ও নতুন লেখকের খোঁজে

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৩১, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৪, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯

শান্তনু চৌধুরীঅমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রায় প্রতিদিনই যাই। নির্দিষ্ট কোনও জায়গায় বসে থাকি না। হাঁটি ইতি উতি। মাঝে মাঝে ক্লান্তি এসে ভর করলে জিরিয়ে নেই। কফির কাপে চুমুক দেই। পরিচিতজনদের সঙ্গে আড্ডা দেই। এরপর আবার হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে চেষ্টা করি মানুষ পাঠ করতে। কত রকমের মানুষ। কত কত গল্প। প্রেমিক হয়তো ফুল, বই কিনে দেয়নি বলে ঝগড়া। স্বামী বাচ্চাকে সামলাতে না পেরে বউকে বকা দিচ্ছে। কারো বসন-ভূষণে উগ্রতা। কেউবা শান্ত নদীর মতো সর্পিল। বসন্ত, ভালোবাসার দিনে আনন্দে, আহ্লাদে মাখামাখি। বর্ণিল বর্ণমালার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কেউবা সেলফি তুলছে। জনপ্রিয়  লেখক জাফর ইকবাল আক্ষেপ করে বললেন, ‘একটা সেলফি মেলা করা উচিত, সেখানে সবাই সেলফি তুলবে’।  কেউবা বই না কিনেই বই হাতে নিয়ে ছবি তুলছে ফেসবুকে আপলোড করবে বলে। একদিন হাঁটতে হাঁটতে কানে বাজে কে যেন পাশে যেতে যেতে বললেন, ‘এই ফেসবুক টুইটারের যুগে মানুষ বই কেনে, আবার সে বই পড়েও’। বেশ গরম হাওয়া লাগলো কথাটায়। জুয়ার আসরে বা বাণিজ্য মেলায় বসে এই কথাটি বললে হয়তো বুঝতাম। যিনি বা যারা কথাটি বলছেন তারা এসেছেন বইমেলায় এবং সম্ভবত কারণটি এই যে অন্তত একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা, বইমেলায় গিয়ে সমাজে একটু অন্য চোখে নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টা।

আদিপাঠ থেকে যতটুকু জানি, বই জড়বস্তু। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেটি প্রাণহীন নয়। সে হিসেবেই বইয়ের মেলাকেও বলা হয় প্রাণের মেলা। কারণ পাঠক লেখক বা প্রকাশক সবাইকে নিয়ে বইমেলা এখন সামাজিক উৎসব। আর সেখানেই যেন সমাজের জ্ঞানী মানুষদের মিলনমেলা। তাই অনেকেই আছেন প্রতিদিন সেখানে না গেলে যেন ভালোই লাগে না। কারণ বই একদিকে যেমন আনন্দ পাঠ, তেমনি সমাজ বদলানোর হাতিয়ারও। সমাজকে বদলাতে হলে বইপড়ে নিজেকে আগে গড়ে তুলতে হবে। একটি বই-ই মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে এমন গল্প কিন্তু কম নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বই না পড়ে ঘুমাতে যান না। প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ভলতেয়ার, রুশো, কান্ট, হেগেল, মার্ক্সসহ অনেকের বই সমাজ পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেওয়ার মতো কার্যক্রম বা বই পড়াতে নানা তৎপরতা থাকার পরও আমাদের নতুন প্রজন্মের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ শোন যায় তারা বই বিমুখ। তারা পড়ে থাকে প্রযুক্তিতে, ইন্টারনেটে। সর্বনাশা গেমস বা টেলিভিশনে। এই অভিযোগ কতটা সত্যি? প্রতিবছর হাজার হাজার বই বের হয়। বিক্রিও হয় কোটি কোটি টাকার। কিন্তু যেসব কারণে কিশোর-তরুণদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলা হচ্ছে তার জন্য কিন্তু অভিভাবকরাও কম দায়ী নয়। কারণ একটা শিশু যখন বড় হতে থাকে তাকে বইয়ের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব বাবা-মায়ের। সেখানে যদি মুঠোফোন বা ট্যাব জায়গাটা দখল করে নেয় তবে তার মনোজগত সেভাবেই বেড়ে উঠবে। অথচ শিশুকে রঙিন ছবির বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তারপর ছবির সঙ্গে কথা। এভাবেই তার পড়ার প্রতি আগ্রহ জমবে। আবার আরেকটি বিষয়, আগে পাড়া মহল্লায় লাইব্রেরি থাকতো। বিকেলে সবাই মিলে আড্ডা হতো। বই, পত্রিকা পড়া হতো। আর এখন পৃথিবীটা ছোট হতে হতে স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে ড্রয়িংরুমে থাকা বোকা বাক্সে বন্দি হয়ে আছে। ঠাকুরমার ঝুলি, বুড়ো আংলা বা রাক্ষস-খোক্ষসের গল্প বলার মতো ঠাকুরমারাও বোধহয় এখন নেই। কারণ নাতি-ঠাকুরদা বা ঠাকুরমার অবস্থানানগত দূরত্বও রয়েছে। এছাড়া খেলার জায়গা নেই, ছোটাছুটির আনন্দ নেই। সব কেড়ে নিয়েছে ভিড় করা ইমারত। অথচ বই পড়ার অভ্যাসটা গড়া উচিত শৈশব থেকে। আর এখন নিজের ওজনের চেয়ে বেশি ওজনের বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এই শিক্ষক থেকে ওই শিক্ষক দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত শৈশব। কাজেই পাঠ্যবইয়ের বাইরে জগৎটাই ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসে। আর তরুণ বয়সে তাদের মনোযোগ চলে যাচ্ছে ইন্টারনেট ভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া বা বিনোদন মাধ্যমগুলোর প্রতি। পরিচিত অনেককে বলতে শুনেছি, একটা সময় ছিল যখন হাতে কোনও নতুন বই এলে তার পাতার অদ্ভুত গন্ধে শেষ লাইন না পড়া পর্যন্ত নেশা কাটত না। সে মানুষটি এখন টাকা, অর্থ, নাম যশের পেছনে ছুটতে ছুটতে মননশীলতা হারিয়ে ফেলেছেন। হয়ে উঠছেন আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। অথচ বইয়ের আনন্দ যে একবার পেয়েছে সেটা যে কতোটা নির্মল হতে পারে তা অনুভবের বিষয়। অনেক বিখ্যাত লোকজন বিশেষ করে রাজনীতিবিদরা কারাগারেও বইকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন। বঙ্গবন্ধুতো কারাগারে বসেই লিখে ফেললেন, ‘কারাগারের রোজনামচা’। সুভাষচন্দ্র বসু যখন মান্দালয়ের জেলে বন্দি ছিলেন, তখন বই কীভাবে তাঁর নিঃসঙ্গতা কাটিয়েছিল তিনি লিখেছেন ‘তরুণের স্বপ্ন’ গ্রন্থে। কবিগুরুর কথায়, ‘ভালো বই আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়।’ লিও তলস্তয় বলেছেন ‘তিনটি জিনিস মানুষের জীবনে বিশেষ ভাবে প্রয়োজন, বই, বই এবং বই।’

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় হাঁটতে হাঁটতে ক্ষণিকের বিশ্রামে গল্প জমে উঠে প্রকাশকদের সাথে। তরুণ লেখকদের মধ্যে প্রতিশ্রুতিশীল বা আগামীতে সাহিত্যে রাজত্ব করবেন তেমন কাউকে নাকি তারা খুঁজে পান না। বিষয়টি চিন্তার। কেন নতুন কয়েকজন লেখকের নাম বলা যাবে না যিনি বেরিয়ে আসবেন তার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে। ক্রমাগত নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে পৌঁছাবেন বৃহত্তর পাঠকের কাছে। আরজে, ডিজে বা নায়ক নায়িকারা যে বই প্রকাশ করছেন সেগুলোর কথা বাদ দিলে বই প্রকাশ করে হৈচৈ ফেলে দিচ্ছেন এমন কারো নাম সত্যিই বলতে পারছেন না প্রকাশকরা। কিন্তু কেন? তাহলে লেখক কোথায়? প্রকাশকের ভাষায় এখনও জনপ্রিয় লেখকদের বই খুঁজেন পাঠক। এখনও চিয়ারত লেখকের বই খুঁজেন পাঠক। ধারাবাহিকভাবে ভালো করছেন এমন নতুন লেখক খুঁজে পাওয়া ভার।

যতটুকু জানি, মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা যখন বইমেলা শুরু করেন তখন বড় উদ্দেশ্য ছিল আমাদের দেশের লেখক, শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, গবেষকরা যেন নিজেদের মেধা, মনন ও চিন্তাভাবনা পাঠককে জানাতে পারেন। তাঁর বোধের বিস্তার ঘটাতে পারেন অন্যের কাছে। আরেকটি বিষয় ছিল পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের একচেটিয়া আধিপত্য ঠেকানো। কারণ তখন সহজেই সেদেশের বই চলে আসতো। কয়েকবছর আগেও বইমেলার ফুটপাতে সেগুলো দেদারছে বিক্রি হতো। এখন অবশ্য ফুটপাত ঠেকানো গেছে কিন্তু বইমেলায় কোনও কোনও প্রকাশকের হাত ধরে দেদারছে ঢুকে পড়ছে। এটার অবশ্য দুটো ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। বইমেলা যদি সার্বজনীন বা আন্তর্জাতিক মানের হয়, তবে লেখকের কোনও গণ্ডি নেই। আবার শুধু যদি নিজেদের দেশের লেখকদের প্রমোট করা হয় তবে আপত্তি রয়েছে। যাক সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু তখন মুক্তধারার প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা ভেবেছিলেন বিদেশি লেখকদের বই দেদারছে বিক্রি হলে আমাদের দেশে সৃজনশীল লেখক তৈরি হবে না। তাই তিনি বইমেলা শুরু করেছিলেন। দিনকে দিন বইমেলার প্রসার, প্রচার দুটোই বেড়েছে। সাজসজ্জা বেড়েছে, বই বেড়েছে, লেখক বেড়েছে। কিন্তু একবাক্যে মানোত্তীর্ণ তেমন লেখক কই। কারণ লেখকরা এখন সাধারণ মানুষের কাছে যেতে পারছেন না। তারা মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারছেন না। তারা লিখছেন উঁচু উঁচু বিল্ডিং নিয়ে, শহুরে প্রেম নিয়ে। ফলে মহৎ সাহিত্য তেমন একটা সৃষ্টি হচ্ছে না। কারণ তারা মানুষকে পড়তে পারছেন না। আরো একটি বিষয় রয়েছে, একটি সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করার জন্য যে পরিমাণ প্রস্তুতি প্রয়োজন সেটাও তারা নিচ্ছেন না। আবার আবেগের বসে হঠাৎ করেই বই প্রকাশ শুরু করেন কোনও কোনও লেখক বা প্রকাশক। হয়তো জনপ্রিয় আরজে, ডিজে বা নায়ক নায়িকার বই প্রকাশ করেন। এক মেলা, পরের মেলা, ফেসবুকের কল্যাণে বেশ জমজমাট বিক্রি হয়। কিন্তু পরে আর বিক্রি হয় না। ওই প্রকাশনীতে দেখা যায় কোনও মানসম্মত বই-ই নেই। কারণ প্রকৃত অর্থে কোনও লেখকের বই সেখানে নেই। লেখক সৃষ্টির একটা ক্রান্তিকাল কি পার করছি আমরা? কোনও কোনও লেখক একটু জ্বলে উঠেই নিভে যাচ্ছেন। কেউ পুরস্কার পাওয়ার পর হারিয়ে যাচ্ছে। গেলো এক দশকে হারিয়ে যাওয়া এমন কবি, লেখকের সংখ্যা কম নয়। আবার লেখককে তৈরি করবে এমন প্রকাশকও এখন নেই বললেই চলে। প্রকাশকদের বেশিরভাগই এখন স্রেফ ব্যবসায়ী। সে কারণে একজন নবীন লেখকের বই অনেক সময় প্রকাশ করে তারা ব্যবসায় ক্ষতি হোক এমনটি চান না। কিন্তু নতুন লেখক হলেই যে তার বই মানহীন হবে, এমন ধারণাতো ঠিক নয়। অনেক নতুন লেখক এসেই আলো জ্বালিয়ে দেন। দ্য গড অব স্মল থিংস প্রকাশের আগে অরুন্ধতী রায় লেখক হিসেবে অপরিচিত ছিলেন। ঝুম্পা লাহিড়ী তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থেই সাড়া ফেলেন। আর হ্যারি পটার যে কত প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সেটিতো আগ্রহী পাঠকের জানার কথা। যারা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তাদের হয়তো সমস্যা নেই, কিন্তু একজন নবীন লেখকের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া প্রয়োজন। সেটি তারা পাচ্ছেন না। কেউ বিশুদ্ধ সাহিত্যিক হয়ে জন্মান না। তিনি ধীরে ধীরে সাহিত্যিক হয়ে উঠেন। তাকে অবশ্যই অগ্রজদের লেখা পড়তে হবে। জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখতে হবে। ভাষার ওপর দক্ষতা থাকতে হবে। সবচেয়ে বেশি থাকতে হবে আত্মবিশ্বাস। নির্মোহ হতে হবে। একথা ঠিক যে, আমাদের সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শুধুমাত্র লিখে জীবিকা নির্বাহ করার পরিবেশ আসেনি। কাজেই জীবিকা নির্বাহের পর বাকিটা সময় সাহিত্যে মনোনিবেশ করতে পারেন। অগ্রজদের সঙ্গে তার অগ্রসরমান যাত্রা নতুন সাহিত্য সৃষ্টিতে তরুণকে এগিয়ে রাখবে বহুদূর। আমাদের সাহিত্যে এমন একদল তরুণ দেবদূত চাই যাদের দেখে ফেসবুক, টুইটার আর গেমসে সময় কাটানো প্রজন্ম বলবে, এই বইটা পড়েই পাল্টেছে আমার জীবন। এমন হতে না পারলে ইতিহাস তরুণ লেখককে প্রত্যাখ্যান করবে। ১৯১৩ সালের বিশ্বসাহিত্য জগতে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব, ১৯৫২ সালে ঢাকা শহরে একুশে আন্দোলন, ১৯৭১-এ নতুন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম আর ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে সেই একুশে ফেব্রুয়ারির যে বিশ্বজনীন স্বীকৃতি সেটিকে পোক্ত করতে হলে চাই এই ভাষায় এই দেশের লেখকের আরো ভালো ভালো সাহিত্যকর্ম। যেটি হবে সৃষ্টির বিস্ময়। তবেইতো লেখক থাকবেন পাঠকের হৃদয় জুড়ে।

 লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক 

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ