অন্ধকারেই কি থাকবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মাতৃভাষা?

Send
সালেক খোকন
প্রকাশিত : ১১:১৫, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৪, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯

সালেক খোকনআমাদের ভাষা দিবস আজ সারা পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এটি যেমন সম্মানের তেমন গৌরবেরও। কিন্তু রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা বাংলাকে টিকিয়ে রাখার ইতিহাসের এই দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মাতৃভাষাগুলোর অবস্থা আসলে কেমন– তা জানাতেই এই লেখার অবতারণা।

কিছু মতভেদ থাকলেও বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের ভাষার সংখ্যা ২৫ থেকে ৩৮টি। এ ভাষাগুলোকে মূলত চারটি ভাষা পরিবারে ভাগ করা যায়। অস্ট্রো-এশিয়াটিক, তিব্বতি-চীন, দ্রাবিড় ও ইন্দো-ইউরোপীয়। বাংলাদেশে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগুলো আবার দুটি শাখায় বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে মোন-খমের ও মুণ্ডারি শাখা। বর্তমানে প্রায় ১০০টির অধিক ভাষা মোন-খমের শাখার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে এই শাখার ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাসি ভাষা। এ ভাষার কোনও বর্ণমালা নেই। তবে বর্তমানে এ ভাষা রোমান হরফে লেখা হয়।

সাঁওতালি ও মুণ্ডা ভাষা দুটিই মুণ্ডারি শাখার অন্তর্ভুক্ত। উভয় ভাষারই নিজস্ব কোনও হরফ নেই। তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রঘুনাথ মুর্মু ‘অলচিকি’ নামে সাঁওতাল বর্ণমালা তৈরি করেন এবং তা সরকারি স্বীকৃতিও লাভ করে।

চীনা-তিব্বতি ভাষাগুলো আবার কয়েকটি শাখায় বিভক্ত। যেমন-বোডো, কুকি-চীন, সাক-লুইশ ও লোলো-বার্মিজ শাখা। মান্দি বা গারো, ককবোরক (ত্রিপুরা), লিঙ্গাম, পাত্র বা লালং, কোচ, রাজবংশী প্রভৃতি ভাষা বোডো শাখার অন্তর্ভুক্ত। মৈত্রেয় বা মণিপুরি, লুসাই, বম, খেয়াং, খুমি, ম্রো, পাংখো ভাষাগুলো কুকি-চীন শাখাভুক্ত।

রাখাইন, ওরাওঁদের কুড়–খ, পাহাড়িকা ও মাহালি ভাষা দ্রাবিড় ভাষা পরিবারে অন্তর্ভুক্ত। রাখাইন ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ একটি ভাষা। রাখাইন ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। ওরাওঁদের কুড়–খ ভাষাটি আদি ও কথ্য ভাষা। বাংলাদেশে ইন্দো-আর্য পরিবারভুক্ত ভাষার মধ্যে বাংলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এই পরিবারে চাকমা ভাষা এবং সাদরি ভাষাও রয়েছে। মণিপুরিদের বিষ্ণুপ্রিয়া, হাজং প্রভৃতি ভাষাও এই শ্রেণিভুক্ত।

আবার বাংলা ভাষার নৃ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ভাষা থেকে বহু শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলা ভাষায়। সাঁওতালি ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার আন্তরিক সম্পর্কও রয়েছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত দেশি শব্দগুলো প্রধানত সাঁওতালি ও মুণ্ডা ভাষা থেকে আগত। অথচ আজ হারিয়ে যাচ্ছেক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সে ভাষাগুলোই। এরই মধ্যে কোচ ও রাজবংশীদের ভাষা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। প্রায় পুরো বিলুপ্ত হয়ে গেছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কুড়–খ ও নাগরি ভাষা।

ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ভাষা। বিলুপ্তপ্রায় এসব ভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করেছে ইউনেস্কো। সে বিবেচনায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদেরমাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণের বিষয়টি অতি দ্রুত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের ভাষারক্ষা কিংবা শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের বিষয়টি এলেই প্রশ্ন ওঠে বর্ণ নিয়ে। তাদের ভাষায় লিখিত কোনও বর্ণ নেই। কিন্তু বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ইংরেজি ভাষারও নেই নিজস্ব বর্ণ। ইংরেজি বর্ণগুলো রোমান হরফ থেকে নেওয়া। তাছাড়া চাকমা, মারমা, রাখাইন, সাঁওতাল, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, গারো, খাসিয়া, হাজং, মণিপুরি, ওরাওঁ, মুণ্ডাসহ ১৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় লিখিত রচনা এখনও রয়েছে। ভাষা রক্ষা কার্যক্রমে যা সহায়ক।

গারোরা নিজেদের মধ্যে আচিক ভাষায় কথা বলে। ভারতের মেঘালয়ে অনেক আগ থেকেই গারোদের নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। সেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এমনকি কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও গারো ভাষায় লেখাপড়ার ব্যবস্থা আছে। আচিক ভাষার কোনও লিখিত রূপ না থাকলেও সেখানে রোমান হরফগুলোকেই গারো ভাষার বর্ণমালা করা হয়েছে।

চাকমাসহ অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় এখনও লিখিত রচনা রয়েছে। মণিপুরিদের ভাষা মৈথয়ীর ইতিহাস বহু পুরনো। সাঁওতালি ভাষায় সাহিত্য ও অভিধান আছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখা হয় এ ভাষায়। মিয়ানমারে মারমা ভাষায় উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। বান্দরবানে জিরকুন সাহু নামে একজন বম ভাষায় অভিধান করেছেন। যেগুলো ভাষা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।

আবার বাংলা ভাষাভাষির আধিক্যের কারণে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের প্রয়োজনীয়তার চাপে পড়ে নিজ মাতৃভাষা থেকে এখন বাংলাকেই বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে। তবে এ প্রবণতা সমতলেরসম্প্রদায়ের মধ্যে বেশি। সাঁওতালদের ৪৯ শতাংশই মনে করে, নিজ মাতৃভাষার চেয়ে আজ বাংলাই বেশি প্রয়োজনীয়। উত্তরবঙ্গের কোদা ও কোল জাতির কেউই এখন আর নিজ ভাষায় পড়তে বা লিখতে পারে না। একই অবস্থা টাঙ্গাইলের কোচ ও দিনাজপুরের কড়া, ভুনজার, মুসহর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের। মাতৃভাষা রক্ষার ইতিহাসের এ দেশে অন্য জাতির ভাষাগুলোর এমন করুণদশা আমাদের গৌরবকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়।

অথচ ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির খ এর ৩৩নং ক্রমিকের খ(২) নং উপ-অনুচ্ছেদে প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।

তাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের মাতৃভাষা সুরক্ষার জন্য অন্তত দুটি কাজ অবিলম্বে শুরু করা প্রয়োজন। একটি হলো, প্রাথমিক স্তরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা পুরোপুরি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত– প্রতিটি ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরকারিভাবে সংরক্ষণ ও চর্চার উদ্যোগ গ্রহণ।

এরই মধ্যে তাদের শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের কিছু উদ্যোগ সরকারিভাবে বাস্তবায়িত হলেও এখনও তা পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। প্রথম দফায় পাঁচটি মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী শিশুদের পড়াশোনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১২ সালে। প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে পরিকল্পনা হয়-প্রথম দফায় পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এবং সমতলের সাদরি ও গারো এই পাঁচটি ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার। দ্বিতীয় পর্যায়ে ম্রো, মণিপুরি, তঞ্চঙ্গ্যা, খাসি, বমসহ ছয়টি ভাষায় এবং তৃতীয় পর্যায়ে কোচ, ওরাওঁ (কুড়–ক), হাজং, রাখাইন, খুমি ও খ্যাং ভাষার পর অন্যান্য ভাষাতেও প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

সে অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের পাঁচটি ভাষায় ২০১৪ সালের জানুয়ারিতেই প্রাক-প্রাথমিকে শিশুদের হাতে নিজ নিজ মাতৃভাষার বই তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি সম্ভব হয় ২০১৭ সালে। এ বছরও ওই পাঁচটি অর্থাৎ গারো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও সাদরি ভাষায় পাঠদানের বই বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকায় ওই ভাষার শিক্ষক বা প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি কাজে আসছে না। একইভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাকিভাষাভাষিদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজও চলছে ঢিমেতালে। ফলে সরকারি উদ্যোগের গতিহীনতার কারণে সার্বিকভাবে শিশুরা মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

এছাড়া দেশ ও বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় ভাষা সংরক্ষণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন-২০১০ প্রণীত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ক্ষুদ্র জাতিসমূহের ভাষা সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং যেসব জাতিগোষ্ঠীর ভাষা লেখ্যরূপ নেই, সেসব ভাষার লেখ্যরূপ প্রবর্তন করার কথা, সেখানে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার যে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা জরিপ শুরু করেছিল তা এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এদেশে কয়টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জাতি আছে, তাদের ভাষার সংখ্যা কত, এসব ভাষার অবস্থাইবা কেমন- তা নিয়ে সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ কোনওতথ্য এখনও আমরা পাইনি। তাহলে বাংলা ভাষার প্রদীপের নিচে কি অন্ধকারেই থাকবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা?

এদেশে মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশু স্কুলে যায়। যাদের মধ্যে বড় একটি অংশ ঝরে পড়ে মাতৃভাষার কারণে। তাই প্রয়োজন সরকারিভাবে অতিদ্রুত ভাষাগুলোকে রক্ষার পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করা।

প্রদীপের নিচে অন্ধকার থাকুক-এমনটা আমরা চাই না। আমরা চাই– এই দেশে সব শিশুরা পড়–ক তাদের মায়ের ভাষায়। সমানভাবে সুরক্ষিত থাকুক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মাতৃভাষাগুলোও।


লেখক: গবেষক

 

/আইএ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ